ধ্রুব একবার বলল, তুমি খুব ঘাবড়ে গেছ। একটু ব্রান্ডি খাবে? খেয়ে শুয়ে পড়ো। গা-ও গরম হবে, ঘুমও চলে আসবে।
রেমি মাথা নেড়ে জানাল, খাবে না।
ধ্রুব আর সাধল না। পাজামা চড়িয়ে, শাল চাপিয়ে ঘর থেকে বেরোনোর মুখে বলল, সমীর বোধহয় এখনও আছে। ওকে তোমার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি। একটু কমপ্যানি দিতে পারবে।
রেমি হঠাৎ উত্তেজিত গলায় জিজ্ঞেস করে, তুমি কোথায় যাচ্ছ?
লাউঞ্জে। পুলিশ থেকে আমার একটা স্টেটমেন্ট নিতে এসেছে।
আমিও যাব।–বলে উঠতে গেল রেমি। কিন্তু পায়ে একরত্তি জোর পেল না সে। শরীরে ঠকাঠক কাঁপুনি। পা দুটো অবশ। আবার বসে পড়ল।
ধ্রুব উদাস গলায় বলল, গিয়ে কী লাভ? আমি আবার মদ খাই কি না দেখতে চাও? খেলেও তো ঠেকাতে পারবে না।
ধ্রুব বেরিয়ে যাওয়ার পর রেমি টেলিফোনে কলকাতার লাইন চাইল। লাইটনিং কল। মিনিট পনেরো সময় যেন অন্তহীনতায় প্রসারিত হতে লাগল। পনেরো মিনিটের মধ্যেই সে পি বি এক্স অপারেটরকে বার দুই তাগাদা দিল এবং কৃষ্ণকান্তর ফোন নম্বর মনে করিয়ে দিল।
অবশেষে কৃষ্ণকান্ত লাইনে এলেন, বউমা, তোমরা ভাল আছ তো?
বাবা, আমাদের ভীষণ বিপদ। চারদিক ঘিরে ফেলেছে গুন্ডারা, ঢিল মারছে। আমরা বোধহয় দার্জিলিং থেকে আর ফিরতে পারব না।
কৃষ্ণকান্ত একটু চিন্তিত গলায় বলেন, কেন, এখনও পুলিশ পিকেট দেয়নি?
দিয়েছে, কিন্তু তবু আমরা বোধহয় ফিরতে পারব না।
দরকার হলে পুলিশ গুলি চালাবে। তুমি চিন্তা কোরো না।
গুলি!–বলে আর্তনাদ করে ওঠে রেমি, গুলি চালাবে কেন?
কৃষ্ণকান্ত একটু হাসলেন, গুলি চালাতে হয়তো হবে না, কিন্তু ছেলেগুলো যদি বাড়াবাড়ি করে তাহলে তো একটা কিছু করতে হবে। কী বলো?
তা বলে গুলি? আমি তা হলে ভয়েই মরে যাব।
কৃষ্ণকান্ত শান্ত স্বরেই বললেন, লামা নামে একজন লোক তোমার সঙ্গে দেখা করবে। তোমার কাছে বোধহয় হাজার তিন-চারেক টাকা এখনও আছে, না?
আছে, বাবা। আপনি যা দিয়েছিলেন তার কিছুই খরচ হয়নি। পুরো পাঁচ হাজারই আছে।
ঠিক আছে। ওটা থেকে লামাকে দুহাজার টাকা দিয়ো।
দেব, কিন্তু এই বিপদ থেকে কী করে বেরোব বাবা?
ওটা নিয়ে তো আমি ভাবছি। কিন্তু কিছু খেয়েছ এখনও?
না, খিদে নেই।
খিদে নেই তো ভয়ে। ভাল করে মুরগির ঝোল দিয়ে ভাত খাও, তারপর শুয়ে পড়। আমি লামার সঙ্গে কনট্যাক্ট করেছি, তোমাকেও ফোন করতাম ওকে টাকাটা দেওয়ার জন্য।
টাকা নিয়ে লামা কী করবে বাবা?
ওই ছেলেগুলোকে দেবে। ওরা বেকার ছেলে, কাজকর্ম নেই, হুজুগ পেলেই একটা কিছু করে বসতে চায়। টাকাটা হাতে পেলেই ফুর্তি করতে চলে যাবে। কিন্তু খবরদার, নিজে গিয়ে আবার ওদের টাকা সেধো না। যা করবার লামা করবে। ও হচ্ছে আমার পলিটিক্যাল এজেন্ট।
রেমি উদ্বেগের সঙ্গে বলল, আপনার ছেলেকে পুলিশ কী সব জিজ্ঞেস করছে। ওর সঙ্গে কথা বলবেন?
কৃষ্ণকান্ত বললেন, না। কথা বলে লাভ নেই। ও কেন ওকাজ করেছে জানো? ইলেকশনের মুখে আমাকে একটা স্ক্যান্ডালে জড়ানোর জন্য। ওকে কিছু বলা বৃথা। তবে তুমি যদি পারো ওকে ইমিউন রেখো।
কিন্তু আমি যে পারছি না বাবা!
চট করে তো পারবে না। সময় লাগবে। যদি মাথা ঠান্ডা রেখে চলো তাহলে হয়তো একদিন ওকে কনট্রোল করতে পারবে। তোমার ওপর আমার অনেক ভরসা।
এমন সময়ে একটা ঢিল এসে ঝনঝন করে উত্তর দিককার শার্শি ভাঙল। চমকে উঠল রেমি। টেলিফোনে কৃষ্ণকান্তকে শুনিয়েই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল, আমি যে ভীষণ ভয় পাচ্ছি। আমার মাথা কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। আমি কী করব?
এক্সচেঞ্জের তিন মিনিটের ওয়ার্নিং পার হয়েও কান্নাটা গড়াল।কৃষ্ণকান্ত বাধা দিলেন না। রেমির রুদ্ধ আবেগটা একটু কমে এলে বললেন, শোনো বউমা, ধ্রুব খুব বেশিদিন বেঁচে থাকবে বলে আমার মনে হয় না। হয় খুন হয়ে যাবে, নয় তো লিভার পচাবে, না হয় তো মাতাল অবস্থায় গাড়ি টাড়ি চাপা পড়বে। ওর আয়ু বেশিদিন নয়।
রেমি শিউরে উঠে বলল, কী বলছেন?
কথাটা শুনতে খারাপ, তবু যুক্তিসঙ্গত। কে ওকে সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখবে বলো? সব পরিস্থিতিতে তো আর আমি বাঁচাতে পারব না। বিয়ের সময় সুপাত্রের হাতে কন্যা সম্প্রদান করা হয়। আমি কিন্তু মা, ধ্রুবকেই তোমার হাতে সম্প্রদান করেছি। এখন তুমি যা বুঝবে করবে। অপাত্রে পড়েছ বলে যদি সারাজীবন মনে মনে আমাকে গালমন্দ করো তো কোরো, তবু আমার ছেলেটাকে দেখো। ওর কেউ নেই। বাস্তবিকই কেউ নেই।
শেষ দিকে কৃষ্ণকান্তর গলাটা ভারী শোনাল কি না তা ভাল বুঝতে পারছিল না রেমি। পাথুরে কৃষ্ণকান্ত সহজে গলেন না। তবু যদি গলাটা ভারী শুনিয়ে থাকে তবে সেটা কৃষ্ণকান্তর অভিনয়ও হতে পারে। রেমিকে একটা পতিত উদ্ধারের সকাজে উদ্বুদ্ধ করার জন্যই হয়ত্রে অভিনয়টুকুর দরকার ছিল।
টেলিফোন রেখে রেমি হাঁটুতে মুখ গুঁজে কান্না চাপবার বৃথা চেষ্টা করতে করতে ফেঁপাচ্ছিল। এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল। বাইরে থেকে সমীর ডাকল, বউদি।
সেই সময়ে রেমির মাথাটা হঠাৎ খারাপও হয়ে গিয়ে থাকবে। বিয়ের পর থেকে কাণ্ডজ্ঞানহীন, হিতাহিতজ্ঞানশূন্য একটা লোকের সঙ্গ তাকে তিলে তিলে পাগল করে তুলেছে। তার ওপর আছে দেহ ও মনের যৌবনোচিত চাহিদায় দিনের পর দিন বঞ্চনা। কৃষ্ণকান্ত সুকৌশলে যে গুরুভার তার ওপরে চাপাতে চাইছেন তাতেও তার মন বিদ্রোহী হয়ে থাকবে। ঠিক কী হয়েছিল তা বলা মুশকিল। তবে এই সময়ে আর-একটা মস্ত পাথর এসে উত্তর দিককার আর-একটা শার্শি ভাঙল।
