লোক নয়, নিতান্তই অল্পবয়সি ছেলে একটা। সতেরো-আঠারোর বেশি বয়স হবে না। পরনে মালকোঁচা মারা ধুতি, গায়ে হাফ শার্ট। রং বেশ ফরসা। সদ্য দাড়ি গোঁফ গজিয়েছে। ছেলেটা পিছনের মস্ত আমরাগানের দিক থেকেই দেয়ালে উঠেছে বলে আন্দাজ করলেন হেমকান্ত। তবে ছেলেটার হাবভাব একটু কেমনতরো। মুখ শুকনো। চুল এলোমেলো। চোখের চাউনিটা যেন লক্ষ্যহীন। চারদিকে টালুমালু করে চেয়ে দেখছে।
হেমকান্ত দূরবীনটা নামিয়ে রাখলেন। বরকন্দাজরা দেয়ালের নীচে পৌঁছে গেছে। ছেলেটার পালানোর পথ নেই।
হেমকান্ত সিঁড়ি বেয়ে আস্তে ধীরে নেমে এলেন নীচে। সামনের বৈঠকখানায় বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই পিছমোড়ায় করে বরকন্দাজরা নিয়ে এল ছেলেটিকে। হেমকান্ত লক্ষ করলেন, ছেলেটা ল্যাংচাচ্ছে।
হেমকান্ত নিষ্ঠুরতা পছন্দ করেন না। কিন্তু এই ছেলেটার বেয়াদবিও সহ্য করার মতো নয়। অন্দরমহলের দেয়ালে উঠবে বাইরের লোক, এ কেমন কথা? ওখানে মেয়েরা স্নান করে, বেড়ায়।
হেমকান্ত গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে?
ছেলেটি খুবই ঘাবড়ে গেছে। শুকনো ঠোঁট জিভ দিয়ে চেটে বলল, আমার অন্যায় হয়ে গেছে। ওটা যে ভিতরের মহল তা বুঝতে পারিনি।
কথাটা সত্যি হতেও পারে। হেমকান্ত বললেন, তোমার নাম কী? কোথা থেকে আসছ?
আমার নাম শশিভূষণ গঙ্গোপাধ্যায়। বাড়ি বরিশাল জেলা।
এখানে কী করতে এসেছ?
চাকরি খুঁজতে?
দেয়ালে উঠে কী করছিলে?
ছেলেটা ঠোঁট কামড়ে একটু যেন ভেবে নিয়ে বলল, আমি গত দুদিন ওই আমরাগানটায় আছি। হেমকান্ত অবাক হয়ে বলেন, আমরাগানে আছ মানে?
কোথাও থাকার জায়গা পাচ্ছিলাম না, তাই আমরাগানে ছিলাম।
এই শীতে?
আজ্ঞে হ্যাঁ। খুব কষ্ট হচ্ছিল।
তা হলে সরাসরি এসে কাছারিবাড়িতে বলেনি কেন? এ বাড়িতে বা যে-কোনও বাড়িতে গেলে একটা আশ্রয় জুটে যেত।
আমার উপায় ছিল না। কেন?
শশিভূষণ ঘাবড়ে গেছে বটে, কিন্তু ভেঙে পড়েনি। হেমকান্তর চোখের দিকে চেয়ে বলল, সেটা খুব নিরাপদ হত না। আপনার লোকেরা একটু তফাত হলে সব কথা বলতে পারি।
হেমকান্ত বিরক্ত হলেন। তবু চোখের ইশারায় সবাইকে সরে যেতে বললে সবাই সরে গেল।
এবার বলো।
আমি দুদিন ধরে কিছু খাইনি। পুলিশের তাড়া খেয়ে এখানে এসে পড়েছি।
কেন, পুলিশ তোমাকে তাড়া করেছে কেন?
তাদের সন্দেহ আমি স্বদেশি করি।
কুঞ্চিত ভ্রু সটান হল হেমকান্তর। একটু হাসলেন। আগেই তার অনুমান করা উচিত ছিল ব্যাপারটা।
হেমকান্ত বললেন, তাই বলো।
শশিভূষণ ক্ষীণ একটু হেসে বলল, আমরাগানে বড্ড মশা। আমি ওখানে আর থাকতে পারছি না।
হেমকান্তর হঠাৎ সচ্চিদানন্দের চিঠিটার কথা মনে হল। দেশ কাল পরিস্থিতি নিয়ে ভাবিত হতে তাঁকে বলেছে সচ্চিদানন্দ। তা দেশকালের তো এই অবস্থা। এইটুকু ছেলে লেখাপড়া ছেড়ে, বাড়িঘর ফেলে স্বদেশি করে বেড়াচ্ছে। হয় গুলিটুলি খেয়ে মরবে, নয় তো জেলে পচবে।
হেমকান্ত বললেন, দেয়ালে উঠে কী দেখছিলে?
দেখছিলাম এদিকে কোনও পোড়ো ঘর-টর আছে কি না।
অন্য কোনও মতলব ছিল না তো?
শশিভূষণ মাথা নেড়ে বলল, না। অন্য মতলব কী থাকবে? চুরি?
ধরো তাই।
খাবার পেলে চুরি করতাম। তা ছাড়া আর কিছু চুরির মতলব ছিল না।
তোমার বাবা কী করেন?
মাস্টারি। সামান্য মাইনে।
সে জানি। মাস্টারির মাইনে আর আমাকে শেখাতে হবে না। তুমি কতদূর লেখাপড়া করেছ?
বি এ পড়ছিলাম। এখন পড়ছ না?
না। কলেজ ছেড়ে দিয়েছি।
মা-বাপের প্রতি কর্তব্য নেই?
আছে।
সেটা আগে না করেই দেশসেবায় বেরিয়ে পড়েছ?
দেশসেবা তো নয়। পুলিশের সন্দেহ যে, আমি স্বদেশি। বরিশালে একজন পাদ্রি খুন নিয়ে আমাদের বাড়িতে সার্চ হয়। বাবাই আমাকে পালিয়ে যেতে বলেন।
পাদ্রিকে কারা খুন করেছে?
জানি না। তবে লোকটা পাদ্রি নয়। পুলিশের স্পাই।
সে যাই হোক, তোমাকে আশ্রয় দেওয়া বিপজ্জনক।
তা আমি জানি। আমি দুদিন কিছুই খাইনি।
দুদিন?–বলে হেমকান্ত অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন।
খাওয়ার পয়সাও নেই। বেরোতেও ভয় করছিল। আমাকে যদি কিছু খাবার দেন তা হলে আবার রওনা হয়ে যেতে পারি।
কোথায় যাবে?
ঢাকা। সেখানে আমার পিসির বাড়ি।
গাড়িভাড়া আছে?
না। তবে এতটা আসতে পেরেছি, বাকিটাও চলে যেতে পারব।
আর যদি ধরা পড়ো?
পড়ব না।
সচ্চিদানন্দের দেশ কাল পরিস্থিতিই কি শশিভূষণের রূপ ধরে এসে হাজির হল?
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হরিকে ডেকে বললেন, একে কিছু খেতে দে। তারপর বারবাড়ির নলিনীর ঘরটায় নিয়ে যা।
শশিভূষণ হঠাৎ আতঙ্কিত হয়ে বলে, আমি ঘরে-টরে যাব না।
হেমকান্ত মৃদুস্বরে বললেন, ভয় নেই, ধরিয়ে দেব না। একটু বিশ্রাম নাও। তারপর চলে যেয়ো।
০০৮. হানিমুন
ফার্স্ট ক্লাস কূপে কামরায় হানিমুনটা শুরু থেকেই জমে যাওয়ার কথা। একদিকে তরতাজা একটা ছেলে, অন্যদিকে টগবগে একটা মেয়ে। কিন্তু জমল না। গাড়ি শেয়ালদা ছাড়তে না ছাড়তেই ধ্রুব তার সুটকেসে জামাকাপড়ের তলায় সযত্নে শোয়ানো বোতলটি বের করে বসে গেল এবং খুব নিবিষ্টমনে প্রায় একনাগাড়ে মদ খেয়ে যেতে লাগল। ফলে খাওয়ার জলের বোতলটা বর্ধমান যেতে
যেতেই শেষ।
রেমি ধ্রুবর দিকে তাকাচ্ছিল না। জানালার ধারে আড়ষ্টভাবে বসে বাইরের চলন্ত প্রকৃতি দেখার চেষ্টা করছিল। এ কার সঙ্গে বিয়ে হল তার? একজন নেতা এবং বড়লোকের ছেলে, এই পরিচয় দেখেই কি বাবা ধ্রুবর সঙ্গে বিয়ে দিল তার? আর কোনও খোঁজখবর করল না? ধ্রুব সুপুরুষ সন্দেহ নেই। রেমি এও জানে, খাওয়া-পরা বা বিলাস ব্যসনের কোনও অভাব তার হবে না। কিন্তু সেইটেই তো সব নয়। এ লোকটা বিয়ের দিন থেকেই গণ্ডগোেল করে যাচ্ছে যে! বিয়ের দিন যখন সাজগোজ করানো হচ্ছে রেমিকে, সেই সময় একবার খবর এল ধ্রুবকে বাড়িতে পাওয়া যাচ্ছে না। দুটো মিনিবাস ভর্তি রুক্ষ ও উগ্র চেহারার বরযাত্রীরা এসে বাড়ি গরম করে ফেলেছে তখন। তাদের অনেকেই ভারী ভারী সোনার গয়না দিয়ে আশীর্বাদও করে গেল তাকে। অন্তত বিশ-ত্রিশ ভরি সোনা রোজগার করে ফেলল রেমি। কিন্তু বরের গাড়ি আসেনি, বর আনতে গিয়েছিল দাদা। সে-ই টেলিফোন করে জানাল, ধ্রুব বাড়িতে নেই। কৃষ্ণকান্তবাবু খুব রাগারাগি করছেন। এমনকী পুলিশকে পর্যন্ত কাজে লাগানো হয়েছে।
