বিভাবরী একটু হাসবার চেষ্টা করল, পারল না।
খাওয়ার ঘরের পিছন দিককার দেয়াল জুড়ে বিশাল চওড়া চওড়া জানালা দিয়ে পিছনের সবুজ বাগান আর গাছপালার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। শুধুই সবুজ যেন ছেয়ে আছে চারদিক ঘরে বাইরের প্রাকৃতিক আলো আসছে। আজও একটু মেঘলা বলে ঘরের আলোটার তীব্ৰতা নেই।
বিভাবরী বারবার ঘড়ি দেখছে। এক একটা মিনিট যেন এক একটা যুগ বলে মনে হচ্ছে। বিভাবরী টোক গিলছে বারবার। একটু করে জল খাচ্ছে। ভাবছে লোকটাকে যে কী বলবে। মাথাটা এত তালগোল পাকিয়ে আছে যে, সে কথা বলতে পারবে কি না সেটাই সন্দেহের ব্যাপার হয়ে দাড়াচ্ছে।
ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায় বৈঠকখানার দিককার ফ্লাশ ডোর খুলে দু’জন পুলিশ ঢুকল। ঢুকে দরজার দু’দিকে দাঁড়িয়ে রইল। কয়েক সেকেন্ড বাদে ক্রাচে ভর দিয়ে যে লোকটা অতি কষ্টে ঘরে ঢুকাল তাকে দেখে চেনার উপায় নেই যে, এ লোকটা সেই ভজন আচাৰ্য। মাথায় ব্যান্ডেজ, হাতে ব্যান্ডেজ, গালে স্টিকিং প্লাস্টার, পায়ে প্লাস্টার, ঠোঁট দুটো নীল হয়ে ফুলে আছে, একটা চোখ ও ব্যান্ডেজে ঢাকা। এত অবাক হল বিভাবরী যে বলার নয়।
ভজন ঘরে ঢুকতেই পুলিশ দু’জন বাইরে বেরিয়ে গিয়ে দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল।
ভজন দরজার কাছেই খানিকক্ষণ দাড়িয়ে রইল। হাফাচ্ছে। তার পর দুটো ক্ৰাচে ভর দিয়ে অতি কষ্টে এগিয়ে এল।
বিভাবরীর হয়তো উচিত ছিল উঠে গিয়ে একটা চেয়ার টেনে ওকে বসতে সাহায্য করা। কিন্তু ভজনের অবস্থা দেখে এমনই ঘাবড়ে গেছে বিভাবরী যে, সে নড়তেও পারল না।
ভজন খুব শব্দ করে শ্বাস নিচ্ছে। হাঁফাচ্ছে। এগিয়ে এসে একটা চেয়ার টেনে বসবার চেষ্টা করতে গিয়ে অ্যালুমিনিয়ামের একটা ক্ৰচ পড়ে গেল ঠনঠন করে। সেটা কুড়িয়ে নেওয়ার জন্য নিচু হওয়ার ক্ষমতাও নেই লোকটার। ভারসাম্যহীন শরীরে কোনওরকমে চেয়ারের পিছনটা ধরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল সে। চেয়ার নিয়ে উলটেই পড়ে যেত, কিন্তু সেটা বুকে কোনওরকমে আটকাল। তারপর অতি কষ্টে চেয়ারে বসে কিছুক্ষণ মাথাটা নুইয়ে শুধু শ্বাস নিতে লাগল। বড় বড় শ্বাস। কথা বলার মতো অবস্থাই নয়। লোকটার যে এ দশা হয়েছে তা একবারও বলেনি। শবর। কে এই অবস্থা করল? পুলিশ?
কিছুক্ষণ স্তব্ধ বিস্ময়ে লোকটার দিকে চেয়ে রইল বিভাবরী। গত তেরো-চোঁদ দিন দাড়ি কামায়নি বলে মুখটা দাড়িতে ঢাকা। গোঁফ নেমে ওপরের ঠোঁট আড়াল করেছে।
বিভাবরী খুব ধীরে উঠে গিয়ে মেঝে থেকে ক্রাচটা তুলে অন্য ক্ৰাচটার পাশে টেবিলের গায়ে হেলিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখল। তারপর নিজের চেয়ারে ফিরে এসে বসে ক্ষীণ গলায় বলল, জল খাবে?
লোকটা মৃদু মাথা নেড়ে জানাল, খাবে না।
এ দশা করল কে? পুলিশ।
ভজন একবার তার ক্লান্ত মুখখানা তুলে বিভাবরীর দিকে তাকাল। হী করা মুখে এখনও শ্বাস নিচ্ছে প্রবলভাবে। ফের মাথাটা যেন ঝুলে পড়ল আপনা থেকেই। কথা বলার মতো অবস্থায় এখনও আসেনি।
বিভাবরীর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল। এ লোকটাকে সে ঘেন্না করে এসেছে এতদিন, আজ বড্ড দুঃখ হচ্ছে। মানুষের এরকম দুৰ্দশা দেখলে কারই বা না হবে। শবর কি তাকে ইচ্ছে করেই এই ঘটনার কথা বলেনি?
প্রায় দশ মিনিট নিস্তব্ধ ঘরে ভজনের শ্বাসযন্ত্রের শব্দ হল। তারপর একটু কমে এল হঁহাফধরা ভাবটা। মাথা নিচু করেই বসে রইল। ভজন।।
একটু জল খাও এবার।
ভজন ফের মাথা নাড়ল, খাবে না।
এ দশা কে করেছে তোমার?
ভজন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ভাঙা গলায় বলল, সবাই।
সবাই বলতে?
ভজন ফের চুপ করে থেকে আরও মৃদু গলায় বলল, সবাই।
এরপর ভজনের শরীরটা হঠাৎ একটু কেঁপে কেঁপে উঠল। কাঁদছে নাকি? কান্নার মানুষ তো নয়। বিস্মিত বিভাবরী পলকহীন চেয়ে রইল।
কাঁপুনিটা কমে গেল। ভজন মুখ তুলল না।
তোমাকে কি পাবলিকও মেরেছে?
ভজন মাথা নেড়ে জানাল, হ্যাঁ।
পুলিশও?
ভজন মাথা নাড়া দিয়ে জানাল, হ্যাঁ।
রিঙ্কুকে কি তুমি খুন করেছ?
ভজন অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মাত্র। জবাব দিল না।
বললেন না?
কিছুক্ষণ ঝুম হয়ে থেকে ভজন ভাঙা ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, বলে কী লাভ?
লাভ নেই?
ভজন মাথা নেড়ে না জানাল। তারপর অনেকক্ষণ বাদে মাথা নিচু অবস্থাতেই বিড়বিড় করে আপনমনে বলল, কতবার তো বলেছি। কেউ বিশ্বাস করে না।
বিভাবরী কী বলবে ভেবে পেল না। অনেকক্ষণ বাদে সে বলল, রিঙ্কু তোমার কাছে সেই রাতে এসেছিল কেন? বিয়ের প্রস্তাব দিতে?
ভজনের রি-অ্যাকশন হচ্ছে অনেক দেরিতে হয়তো মাথায় বেশ জোরালো চোট পেয়েছে, রিফ্লেক্স কাজ করছে না। সময় নিচ্ছে। অনেকক্ষণ বাদে শুধু মাথা নেড়ে জানাল, না।
রিঙ্কু নয়?
না।
তা হলে কে?
ভজন একটা হিঙ্কার মতো শব্দ করল। টেবিলের ওপর মাথাটা নামিয়ে যেন একটু ঘুমিয়ে নিতে লাগল। এই অবস্থায় কেন যে লোকটাকে এতদূর টেনে আনল শবর, কেন যে তাকে বসােল ওর মুখোমুখি। বিভাবরী উঠে। ভজনের কাছে গিয়ে পিঠে হাত রেখে বলল, তোমার কি শরীর খুব খারাপ লাগছে?
ভজন একটু কেঁপে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে মাথাটা তুলল। রক্তজবার মতো লাল ডানচোখটা দিয়ে বিভাবরীকে এক ঝলক দেখে নিয়ে বলল, না, ঠিক আছে।
একে কি ঠিক থাকা বলে?
ভজন চুপ করে কিছুক্ষণ বসে থেকে অতি মৃদু স্বরে বলল, আরও হবে। আরও কত হবে। এ তো কিছু নয়।
আর কী হবে তোমার?
ভজন ধীরে ধীরে চোখের জল আর লালায় মাখামাখি বীভৎস মুখটা তুলল। লাল চোখে চেয়ে সেই ভাঙা ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, এখনও মরিনি যে! মারবে না?
