তারপর?
বিশ্বাস করবি না সেই ঘটনা। কোথায় দৌড়ে পালাব, তা নয়। আমি সটান মেঝেতে শুয়ে ড্রাই সাঁতার দিয়ে ওই জানালার দিকেই এগিয়ে গেলাম। লোকটা শার্সি দিয়ে ভিতরে এলোপাথাড়ি গুলি চালাচ্ছিল।
সর্বনাশ!
আমাকে যখন দেখতে পায় তখন আমি জানালার কাছে পৌঁছে গেছি।
আপনি কি পাগল?
না, আমি বুদ্ধিমান। লোকটা শেষ চেষ্টা করেছিল আমাকে ঝাঁঝরা করে দিতে। আমি শুধু হাত বাড়িয়ে ওকে একটা ধাক্কা দিয়েছি।
এত সাহস ভাল নয় গোপীদা।
লোকটা কি মরে গেছে?
হ্যাঁ। না মরলেও মরবে।
দিস ইজ মাই ফাস্ট মার্ডার।
এটা মার্ডার নয় গোপীদা। সেলফ ডিফেন্স।
২৯.
যে-কোনও ঘটনারই একটা ধাক্কা আছে। গোপীনাথ ধাক্কাটা এখনও সামলে উঠতে পারেনি। একটা লোক–তা সে হোক না আততায়ী–তার হাতেই খুন হয়েছে, এই নগ্ন সত্যটা সে ভোলেই বা কী করে? আত্মরক্ষার্থে খুন যে খুন নয় তাও সে জানে, তবু কি মন তা মানছে?
টেলিফোনে সুব্রতর মোলায়েম গলা বলে যাচ্ছিল, আপনি মোটেই এটাকে হোমিসাইড হিসেবে নেবেন না। আপনি লোকটাকে ধাক্কা না দিলে লোকটা আপনাকে অবশ্যই খুন করত। বুঝেছেন ব্যাপারটা?
বুঝেছি। তবু আমার খুব নার্ভাস লাগছে।
আপনি এখন কোথায় গোপীদা?
একটা পাবলিক কল বুথ থেকে কথা বলছি। গড়িয়াহাটে।
শুনুন, আপনার এখন আর এই ফ্ল্যাটে আসার দরকার নেই। আমার মনে হয়, এখন কিছুদিন অন্যত্র যাওয়াই আপনার পক্ষে ভাল।
দূর বোকা।
কেন, বোকা বলছেন কেন?
লোকটা কোন তলা থেকে পড়েছে, কেন পড়েছে এসব পুলিশের জানা নেই। কিন্তু তদন্তের সময়ে পুলিশ যদি দেখে যে আমি সন্দেহজনকভাবে অনুপস্থিত তা হলে দোষটা আমার ঘাড়ে চাপাতে সুবিধে হবে।
সুব্রত একটু ভেবে বলল, বাঃ বেশ বলেছেন তো! কিন্তু সন্দেহ করার কারণ তো থেকেই যাচ্ছে। আপনার ঘরের দেওয়াল মেঝে সর্বত্র গুলির দাগ, পুলিশ এলে তো জলের মতো বুঝতে পারবে যে, লোকটা কোন ফ্ল্যাটে ঘটনা ঘটাতে এসেছিল। তখন তো আপনাকেই সন্দেহ করবে।
নাও করতে পারে। আমি যদি বলি যে, ঘটনার সময় আমি ঘরে ছিলাম না এবং লোকটা অ্যাক্সিডেন্টলি ভারা থেকে পড়ে গেছে?
পুলিশ বিশ্বাস করবে কি?
করবে। কারণ লোকটা বিদেশি, বাঁশের ভারায় ওঠার অভিজ্ঞতা নেই। তার ওপর লোকটা একটা হাই ইমপ্যাক্ট অটোমেটিক অস্ত্র চালাচ্ছিল। খুবই রিস্ক ছিল কাজটায়।
সুব্রত ফের একটু চুপ করে থেকে হঠাৎ বলল, আপনি না একটু আগেই বলছিলেন যে, আপনি নার্ভাস বোধ করছেন?
করছিই তো।
যে নার্ভাস তার ব্রেন এত চমৎকার কাজ করে কীভাবে?
গোপীনাথ একটু হেসে বলল, মাথা বেচেই তো খাই। আমাদের বুদ্ধিজীবী বলা হয়, সেটা ভুললে চলবে কেন?
যাকগে, তা হলে আপনি ফ্ল্যাটটা ছাড়বেন না?
ফ্ল্যাটটা ছাড়লে এবং গা-ঢাকা দিলে আমি বাঁচব বটে; কিন্তু ঘটনাগুলো আমাদের হাতের বাইরে চলে যাবে। আর বাঁচলেও সেটা হবে সাময়িক। আমার পিছনে যারা লেগেছে তারা খুনের ফেরিওয়ালা। এক-একটা খুনের জন্য যদি বিশেষ ব্যক্তিকে খুনের চুক্তি থাকে–তা হলে বিরাট টাকার লেনদেন হয়, বুঝলি?
বুঝলাম।
তাই ওরা সহজে হাল ছাড়বে না। যেখানেই পালাই, খুঁজে বের করে মারবে। ডেডবডিটা কি ওখানেই পড়ে আছে?
হ্যাঁ। কেউ বুঝতেই পারেনি যে, একটা লোক পড়ে গেছে নীচে। এমনকী দারোয়ানও নয়। সুতরাং আইউইটনেস নেই। না, গোপীদা, আপনি বোধহয় নিরাপদ।
মোটই নয়।
কেন বলুন তো!
আশপাশে মেলা হাইরাইজ বাড়ি আছে। যেসব বাড়ি থেকে কেউ যে ঘটনাটা দেখেনি তার কী বিশ্বাস আছে? এখনই হয়তো মুখ খুলবে না, কিন্তু সময়মতো হয়তো বলে দেবে।
ওঃ, আপনি তো ভীষণ সমস্যায় ফেললেন গোপীদা? যা-ই বলছি তাই উড়িয়ে দিচ্ছেন?
ওরে, বিপদে পড়ে এখন যে আমার বাস্তববুদ্ধি আর কাণ্ডজ্ঞান হয়েছে একটু।
তা হলে কী করবেন?
রিস্ক নিয়ে ওই ফ্ল্যাটেই থাকব। তবে অজুহাতগুলো ভাবতে হবে।
একা থাকবেন?
দোকা থাকার বিপদ আছে। দু’নম্বর লোকটিকে প্রথমত বিশ্বাস করা যাবে না। দ্বিতীয়ত দু’নম্বর লোকটিকে খামোখা বিপদে ফেলা হবে।
কেউ যদি স্বেচ্ছায় বিপদের ঝুঁকি নেয়?
তুই নিবি আমি জানি। কিন্তু তোর বউ বাচ্চা আছে, তোকে এই বিপদে টেনে আনার চেয়ে আমার গলায় দড়ি দেওয়া ভাল।
আমি নই। তবে আমি ছাড়াও কেউ থাকতে পারে।
গোপীনাথ একটু চুপ করে থেকে বলল, আমার কেউ নেই, তুই তো জানিস। এই যে একা হয়ে গেছি, এই একাই এখন আমার অভ্যাস। না রে, তুই আমাকে নিয়ে ভাবিস না।
আমি না ভাবলেও কেউ কেউ ভাবছে।
তুই কি সোনালিকে মিন করছিস? কেন রে? ও মেয়েটার সেন্টুতে খোঁচা দিয়ে কেন এই বিপদের মধ্যে ঠেলে দিবি? ও মতলব ছাড়। সোনালির আমার প্রতি কোনও দুর্বলতা নেই, আমি জানি। আমার দুঃখের আর বিপদের কথা ওকে শুনিয়ে তুই প্রায় ওকে ফোর্স করছিস বলে আমার বিশ্বাস। এ কাজটা ঠিক হচ্ছে না। লিভ সোনালি অ্যালোন।
আপনাকে নিয়ে পারা যায় না। আপনি এত স্টাবার্ন।
শোন না পাগলা, রোজমারি আর মনোজ কী বলছে?
তারা আপনাকে এক লাখ টাকা বেতন এবং ইনসিডেন্টাল এক্সপেন্সের জন্য মাসে আরও পঞ্চাশ হাজার টাকা দিতে চায়। অবশ্য অফার নেগোশিয়েবল।
গোপীনাথ নাক সিঁটকে বলল, দেড় লাখ মাত্র?
আরে না। আরও উঠবে। প্লাস আপনার সিকিউরিটি।
সিকিউরিটি তো তুই অ্যাকসেপ্ট করতে চাইছিস না। লুলু না কী যেন নাম লোকটার!
