সুব্রত গেল।
যতদুর মনে হচ্ছে কেউ বাইরে থেকে এই জানালা দিয়ে ভিতরে গুলি করেছে।
সুব্রত অবাক হয়ে বলল, বাইরে থেকে?
হ্যাঁ। ওই দেখুন, বাইরে ভারা বাঁধা আছে।
কথাটা মিথ্যে নয়। বাড়ির এ পাশটায় বাস্তবিক ভারা বাঁধা আছে। সম্ভবত রাজমিস্ত্রি বা রঙের মিস্ত্রিদের কাজ চলছে। তবে আজ কোনও মিস্ত্রি নেই। জানালার কাচগুলি ভাইব্রেশনে ফেটে গেছে। শব্দ হয় এমন আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি। হলে লোক জমে যেত। কাজ হয়েছে নিঃশব্দে।
সুব্রত বলল, কিন্তু গোপীদা কোথায়?
সোনালি চারদিক ঘুরে ঘুরে দেখছিল। কোথাও রক্তের চিহ্ন দেখতে পেল না সে।
সুব্রত জানালা দিয়ে নীচে ঝুঁকে কিছু দেখছিল। হঠাৎ চাপা গলায় বলল, সোনালিদি! এদিকে আসুন।
সোনালি প্রায় ছুটে এল।
কী সুব্রতবাবু?
সুব্রত নীচের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, কিছু দেখতে পাচ্ছেন?
কী?
নীচে কিছু ঝোঁপঝাড় রয়েছে। বোধহয় এ বাড়ির কিচেন গার্ডেন। দেখতে পাচ্ছেন?
সোনালি ঝুঁকে দেখে বলল, পাচ্ছি।
ভাল করে দেখুন, ঠিক জানালার সোজাসুজি নীচে একটা ঝোঁপের ভিতর থেকে একজোড়া পা বেরিয়ে আছে।
সোনালি মাথা ঘুরে বোধহয় পড়েই যেত। সুব্রত ধরে ফেলে বলল, নার্ভাস হবেন না। মাথা ঠান্ডা রাখুন।
কার পা? আপনার গোপীদা?
আসুন আমার সঙ্গে। ব্যাপারটা দেখা দরকার।
কিন্তু যাবে কী করে সোনালি? তার হাত-পা কাঁপছে, বুকে প্রচণ্ড ধড়ফড়, শ্বাসকষ্ট। বলল, সেই দৃশ্য আমাকে দেখতে হবে?
ভাল করে না দেখে কিছু ধরে নেওয়া কি ভাল? মনে হচ্ছে যার পা দেখা যাচ্ছে সে এই আটতলা থেকেই নীচে পড়ে গেছে।
সোনালি বিবশ গলায় বলল, আটতলা থেকে? তা হলে কি বেঁচে থাকার কথা।
হু নোজ? লেট আস সি। চলুন।
নীচে নেমে গোপীনাথের মৃতদেহ পর্যবেক্ষণের মতো অবস্থা সোনালির নয়। তার শরীর যেন নেই হয়ে গেছে, মাথা সম্পূর্ণ বোধশূন্য। এত বিকল তার কোনওদিন লাগেনি। ভয় নয়, মনটা যেন দুর্ভেদ্য অন্ধকার।
অবস্থাটা বুঝে সুব্রত একরকম তাকে ধরে ধরেই লিফট পর্যন্ত আনল। লিফটাকে ওপরে আনতে একটু সময় লাগল। সুব্রত চাপা স্বরে বলল, স্বাভাবিক আচরণ করুন। নইলে লোকে সন্দেহ করবে।
নীচে নেমে তারা একজন ছোকরা দারোয়ানকে দেখতে পেল। একটা বাচ্চা চা-ওয়ালার সঙ্গে কথা বলছে।
সুব্রত গিয়ে বলল, পিছনদিকে বাগানের মধ্যে কেউ পড়ে আছে।
লোকটা হাঁ করে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, কে পড়ে আছে?
সেটাই দেখা দরকার। আমাদের সঙ্গে এসো।
আপনারা কোন ফ্ল্যাটের মেহেমান?
গোপীনাথ বসু। আটতলা। এসো, সময় নেই।
লোকটা একটা বেঁটে লাঠি হাতে নিয়ে উঠল। পিছনে বাস্তবিকই বিস্তর ঝোঁপঝাড়। ঘনবদ্ধ বাগান। আটতলা থেকে একটা প্রমাণ সাইজের মানুষ পড়ে যাওয়াতেও যে তেমন শব্দ হয়নি তা দারোয়ানের আচরণেই বোঝা যাচ্ছে। শব্দটা সে শুনতে পায়নি।
মস্ত একটা কামিনী ঝোঁপ ভেদ করে লোকটা পড়েছে। ঝোঁপের মধ্যেই আটকে আছে তার দেহ। শুধু পা দুটো বাইরে। পায়ে বিদেশি দামি জুতো, পরনে ফেডেড জিনসের প্যান্ট, গায়ে একটা জিন্সেরই শার্ট।
না, লোকটা গোপীনাথ নয়। এ লোকটা ছোটখাটো, রোগার দিকেই। হাত থেকে একটা স্টেনগান গোছের জিনিস ছিটকে ঝোপেই আটকে আছে।
দারোয়ান চেঁচাল, কে লোকটা?
সুব্রত তাকে ধমক দিয়ে বলল, চেঁচাচ্ছ কেন? পুলিশে খবর দাও।
দারোয়ান বলল, উনি তো ফ্ল্যাটের লোক নন! লোকটার মুখ ভাল করে দেখে নিল সুব্রত। না, এ ফ্ল্যাটের লোক তো নয়ই, এ দেশের লোকও নয়। স্পেন বা দক্ষিণ আমেরিঙ্গর মানুষ। গায়ের রং বাদামি। মোটা গোঁফ আছে।
সোনালি প্রস্তরমূর্তির মতো দাঁড়িয়ে স্থির চোখে লোকটাকে দেখছিল।
সোনালিদি, এবার স্বাভাবিক হোন।
সোনালি মাথা নেড়ে বলল, স্বাভাবিক হব! কী করে বলুন তো! এসব কী হচ্ছে। আপনার গোপীদাই বা কোথায়?
তা জানি না। তবে মনে হচ্ছে এ লোকটাই ভারা বেয়ে উঠে গোপীদাকে গুলি করার চেষ্টা করেছিল।
কিন্তু তারপর কী হয়েছিল?
সেটাই তো বুঝতে পারছি না।
দারোয়ানটা হঠাৎ লোকটার পা ধরে টানাহ্যাঁচড়া করতে যাচ্ছিল। সুব্রত ধমক দিয়ে বলল, ওরকম করবে না, পুলিশ খেপে যাবে।
তা হলে কী করব স্যার?
থানায় খবর দাও। বাড়িতে কারও টেলিফোন নেই? যাও তাড়াতাড়ি।
লোকটা চলে গেল।
আমরা কী করব সুব্রতবাবু?
চলুন, গোপীদার ফ্ল্যাটে গিয়ে একটু কফি খাওয়া যাক।
কী যে বলেন!
সোনালিদি, আমাদের যে অপেক্ষা করতেই হবে। চলুন।
তারা আবার ওপরে এল। ফ্ল্যাটে ঢুকল। সোনালি বলল, কফিটা আমি করে আনছি।
সুব্রত চারদিকটা ঘুরে দেখছিল। জবাব দিল না।
হঠাৎ টেলিফোন বেজে উঠতেই সুব্রত একরকম দৌড়ে গিয়ে সেটা ধরল।
হ্যালো।
একটা সতর্ক সরু গলা বলল, কে?
কাকে চাই?
গোপীনাথ বসু আছেন?
না, নেই।
একটু চুপ থেকে গলাটা হঠাৎ মোটা হয়ে গেল, কে রে, সুব্রত নাকি?
হ্যাঁ, গোপীদা! আপনি বেঁচে আছেন?
আছি। আজকাল বেঁচে থাকাটাই কেমন অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে।
ফ্ল্যাটে এ কী কাণ্ড হয়ে আছে?
সেইজন্যই একটু গা-ঢাকা দিতে হয়েছে।
কী হয়েছিল বলবেন?
খুব সাংঘাতিক ব্যাপার। দুপুরে কম্পিউটার নিয়ে বসেছিলাম। কিছু কাজ ছিল। হঠাৎ কী হল জানিস, ঘরের স্বাভাবিক আলোর প্যাটার্নে একটা সূক্ষ্ম চেঞ্জ ঘটল। খুব সূক্ষ্ম। বাঁদিকে চেয়েই দেখলাম, শার্সির বাইরে একটা মাথা উঠে আসছে, একটা নলও যেন দেখতে পেলাম।
