সোনালি মাথা ঠান্ডা রেখে বলল, গোপীনাথ বসুকে সিকিউরিটি দেওয়ার ব্যাপারে কিছু কথা আছে।
কী কথা?
আপনাদের দেওয়া সিকিউরিটি আমাদের পছন্দ নয়।
মনোজ হঠাৎ এ কথায় ঝুঁকে পড়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, কেন বলুন তো!
লুলু সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কার ধারণা নেই।
মনোজ অবাক হয়ে বলল, লুলু! লুলু আবার কে?
ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যালয়ের সিকিউরিটি ইনচার্জ।
মনোজ ভ্রু কুঁচকে কয়েক সেকেন্ড কিছু মনে করার চেষ্টা করল। তারপর হঠাৎ সোজা হয়ে বসে বলল, লুলু! মাই গড! লুলু মানে তো নওলকিশোর লালা। সে-ই কি আমাদের সিকিউরিটি ইনচার্জ?
ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যালয়ের সিকিউরিটি ইনচার্জ কে সেটাও মনোজ জানে না দেখে বিস্মিত সোনালি বলল, হ্যাঁ। কেন, আপনি জানতেন না?
মনোজ একটা অদ্ভুত চোখে সোনালির দিকে চেয়ে ধীরে ধীরে ওপর নীচে কয়েকবার মাথা নেড়ে বলল, আঁ! হ্যাঁ-হ্যাঁ। অবশ্যই।
সোনালির স্পষ্ট মনে হল, মনোজ সত্যিই জানত না। এবং জেনে মোটেই খুশি হল না। তার মুখে আচমকা একটা রক্তাভা দেখা গেল।
একটু সময় নিয়ে এই আকস্মিক অপ্রতিভতাকে একটু সামলে নিয়ে মনোজ হেসে বলল, আসলে সবসময়ে সব জিনিস খেয়াল থাকে না। আমি একটু অ্যাকাডেমিক টাইপের। বাস্তববোধ কম। ওসব রোজমারিই দেখে কিনা। হ্যাঁ, কী যেন বলছিলেন।
সোনালি খুব শান্ত, দৃঢ় গলায় বলল, আমরা লুলুর কথাই বলছিলাম। সিকিউরিটির ব্যাপারে লুলুকে আমাদের পছন্দ নয়।
মনোজ একটু চুপ করে থেকে বলল, কেন নয় বলবেন?
ওর সম্পর্কে আমাদের কিছু সন্দেহ আছে।
মনোজ ভ্রু কুঁচকে আরও একটু ভেবে বলল, লুলুর কনসার্নের নাম গ্লোবাল সিকিউরিটি, না?
না তো! ইউনিভার্সাল আই।
ওঃ, তা হবে। নওলকিশোরের অনেক কোম্পানি, অনেক ব্যাবসা। সবকিছুর খবর রাখা অসম্ভব। তা হলে আপনারা কী চান?
গোপীনাথের সিকিউরিটির ভার অন্য কেউ নিক।
মনোজ প্রস্তাবটা অগ্রাহ্য করল না। বলল, বেশ। কিন্তু চাকরির অফারটা?
সেটা উনি রাজি হলে আপনাকে জানাব।
চিন্তিত মনোজ হঠাৎ যেন সবকিছু থেকে খানিকটা দূরে সরে গেল। নিস্পৃহ হয়ে গেল। লুলুর প্রসঙ্গটা কি এতই অরুচিকর ওর কাছে? কেনই বা? সুব্রত বলেছিল, লুলু রোজমারির পেয়ারের লোক। কথাটা কতটা সত্যি! আর সবচেয়ে বড় কথা, লুলু কে? আসলে কে?
মনোজের কাছ থেকে খুব নিচু স্বরে বিদায় নিয়ে চলে এল সোনালি। টেবিলটা চটপট গুছিয়ে নিয়ে সে বেরোবার মুখে আর একবার টেলিফোন করল গোপীনাথকে। রিং বেজে গেল। ফোন কেউ ধরল না।
অন্য দিনের চেয়ে আজ অনেক দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এল সোনালি। গোপীনাথের ফোন কেন নো-রিপ্লাই হচ্ছে সেটা তার জানা দরকার। ট্যাক্সি পাওয়া যাবে কি না ভাবতে ভাবতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যখন সে ঊর্ধ্বশ্বাসে বাইরের দিকে ছুটছিল তখন বাইরে চমৎকার লনের দু’পাশে যে গাড়ি পার্ক করার জায়গা আছে, সেখান থেকে কে যেন অনুচ্চ স্বরে ডাকল, সোনালিদি।
হেলমেট পরা, সুব্রতকে সে প্রথমটায় চিনতে পারেনি। সুব্রত তার মোটর বাইকটাকে পার্কিং লট থেকে বের করে সামনে এনে দাঁড় করাল, উঠুন।
সোনালি এই প্রথম টের পেল তার হাত-পা বশে নেই। সে রীতিমতো কাঁপছে। বলল, আমি পারব না। পড়ে যাব।
উঠুন সোনালিদি। উই মাস্ট রিচ হিম কুইকলি। গত তিন ঘণ্টা ধরে গোপীদার ফোনে নো-রিপ্লাই।
সোনালি সুব্রতর পিছনে উঠে পড়ল। তারপর কীভাবে যে রাস্তাটা পার হল তা সে জানেও না। সম্পূর্ণ হতচেতনা বা আচ্ছন্নতার মধ্যে ছিল সে। একজন চেনা মানুষ এখন আর স্বামী নয়–তবু তো চেনা। তার মৃত্যুটা কীভাবে নেবে সোনালি।
সুব্রত বাইকটাকে লক করে তার হাত ধরে প্রায় হিঁচড়ে টেনে এনে লিফটে উঠে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল।
কী হয়েছে সুব্রতবাবু? আপনি এত তাড়াহুড়ো করছেন কেন?
সোনালিদি, প্রে টু গড।
ওর কি কিছু হয়েছে?
হোক তা আমরা কেউ-ই চাইছি না।
লিফট থামতেই দরজা খুলে লাফিয়ে নেমে গেল সুব্রত। পিছনে সোনালি।
দরজাটা আধখোলা ছিল। সুব্রত সপাটে সেটাকে খুলে ভিতরে ঢুকেই থমকে দাঁড়াল। বাইরের ঘরের দৃশ্যটাই বীভৎস। দেওয়াল, দরজা, ডিভান, কম্পিউটার, সোফাসেট সর্বত্র এলোপাথাড়ি গুলি চালানোর চিহ্ন। মেঝেয় অবধি কোথাও কোথাও চলটা উঠে গেছে। না হোক গোটা ত্রিশ-চল্লিশবার গুলি চালানো হয়েছে এই ঘরে।
সুব্রত শোয়ার ঘরটায় উঁকি দিল। এ ঘরেও কয়েকবার গুলি চলেছে বটে, কিন্তু বেশি নয়। সুব্রত বাথরুম, বারান্দা, আর একখানা ঘর সর্বত্র ঘুরে দেখল। কোথাও লাশ নেই।
সোনালি সুব্রতর সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে আছে। আতঙ্কিত গলায় বলল, এসব কী হয়েছে সুব্রতবাবু?
গুলি চলেছে। কিন্তু কেউ মরেনি। গোপীদা হয় পালিয়েছে, নয় কেউ বা কারা তুলে নিয়ে গেছে।
অ্যাবডাকশন?
হতেও পারে। গোপীদাকে কতবার বললাম আমার বাড়িতে চলে যেতে, কেন যে গেল। সাহস ভাল, কিন্তু অতি-সাহস তো ভাল নয়।
সোনালি ঘাবড়ে গেছে। মুখ শুকনো, ঠোঁট সাদা। তবু যেন ভিতর থেকে কিছু কঠিন হয়েছে সে। চারদিকে চেয়ে বলল, এত গুলি চালাল কেন বলুন তো? মারতে হলে তো একটা-দুটো গুলিই যথেষ্ট।
সেটাই ভাবছি।
সদর দরজার কাছে গিয়ে ঘরটা একবার দেখল সোনালি। তারপর হঠাৎ ডান ধারে কাঁচের শার্সিওলা জানালার দিকটায় গিয়ে বলল, সুব্রতবাবু, এদিকে আসুন।
