আপনি কখন এলেন?
মিনিট পাঁচেক হবে।
সোনালি নিজের চেয়ারে বসে কিছুক্ষণ নিজেকে সংযত করল। গোপীনাথকে সে ভালবাসে না ঠিকই, কিন্তু উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা তাকে বড্ড কাহিল করে ফেলেছে।
সোনালি বিনা ভূমিকায় বলল, সুব্রতবাবু, আপনার গোপীদা এখন কোথায়?
সুব্রত ভ্রু তুলে বলল, কেন বলুন তো!
আমি জানতে চাই গোপীনাথ এখন কলকাতায় কি না। আপনি জানেন?
সুব্রত একটু চুপ করে থেকে বলল, খবরটা চাপা নেই। অনেকেই জানে। আমিও বলব বলেই আপনার কাছে এসেছি।
তা হলে বলুন।
গোপীদা এখন কলকাতায়।
কেন?
গোপীদাকে রোম থেকে পালিয়ে আসতে হয়েছে। অনেক বিপদের ভিতর দিয়ে।
কীরকম বিপদ?
তাকে মারবার জন্য অনেক চেষ্টা হয়েছে। বরাতজোরে বেঁচে গেছেন। কিন্তু কলকাতাও তার পক্ষে হট হয়ে উঠছে।
তা হলে কী হবে?
শুধু ভাগ্যের ওপর আর নির্ভর করা যাচ্ছে না।
আমরা কী করতে পারি?
গোপীদা যদি পালিয়ে বা লুকিয়ে থাকতে রাজি হতেন তা হলে একটা কথা ছিল। কিন্তু হি ইজ এনজয়িং দি ডেনজারস।
সে কী!
সেটাই তো কথা। পরশু দিন ওঁর ফ্ল্যাটে দুটো নোক ঢুকেছিল, উইথ আর্মস।
সোনালি সভয়ে বলল, তারপর?
গোপীদা অ্যালার্ট ছিলেন বলে বেঁচে যান। কিন্তু বারবার এরকম হবে না। সত্যিকারের প্রফেশনাল খুনির পাল্লায় পড়লে মুশকিল আছে।
সোনালি একটু চুপ করে থেকে বলল, রোজমারি ওর সিকিউরিটির ব্যবস্থা করতে চায়। চাকরিও দিতে চাইছে। মাসে দেড় লাখ টাকা মাইনে এবং সেটাও নেগোশিয়েবল।
সুব্রত একটু হাসল, জানি।
জানেন?
হ্যাঁ। রোজমারি প্রস্তাবটা আমাকেই প্রথম দেয়।
গোপীনাথ কী বলছে?
গোপীদা রাজি।
রাজি?
হ্যাঁ। তবে রোজমারির সিকিউরিটি সম্পর্কে আমার সন্দেহ আছে। লুলু লোকটা ভাল নয়।
লুলু কে?
ম্যাডামের পেয়ারের লোক। ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যালয়ের সিকিউরিটি ইনচার্জ।
ও। লোকটা ভাল নয় কেন?
লুলু মে বি এ ডাবল এজেন্ট। ডাবল এজেন্টদের তো বিশ্বাস করা যায় না। হয়তো উলটো পার্টির টাকা খেয়ে গোপীদাকে সেই খুন করে বসল।
সোনালি শিহরিত হয়ে বলে উঠল, না না, তা হলে কিছুতেই লুলু নয়।
আমিও তাই ভাবছি। কিন্তু ম্যাডামের লুলুর প্রতি খুব দুর্বলতা। উনি হয়তো লুলু সম্পর্কে কোনও বিরুদ্ধ কথা বিশ্বাসই করতে চাইবেন না।
আমি সেকথা রোজমারিকে জানিয়ে দিতে চাই।
কী বলবেন?
বলব, গোপীনাথের সিকিউরিটির ভার আমরা নেব। লুলুকে এর মধ্যে আনা চলবে।
বলে দেখুন তা হলে।
তার আগে গোপীনাথের সঙ্গে আমি কথা বলতে চাই।
টেলিফোন তুলে নিন না, হাতের কাছেই রয়েছে।
সোনালি মাথা নেড়ে বলল, এখন নয়।
কেন এখন নয়?
আই অ্যাম ফিলিং নার্ভাস।
কেন সোনালিদি? নার্ভাস হওয়ার মতো কী আছে?
বহুকাল সম্পর্ক নেই। হয়তো রি-অ্যাক্ট করবে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুব্রত বলল, কেন যে আপনাদের সম্পর্কটা এমন বিষিয়ে গেল কে জানে। অথচ দু’জনেই তো ভাল।
আমি ভাল নই।
কে বলল ভাল নন? আপনি খুব ভাল।
তাই বুঝি?
গোপীদাও ভাল।
সোনালি চুপ করে রইল।
সুব্রত একটু পরে বলল, গোপীদা এখন ফ্ল্যাটেই আছেন। আপনি ফোনটা করুন সোনালিদি।
রোজমারির প্রস্তাবটা ওকে দেব তো!
হ্যাঁ, কিন্তু আমার আর একটা জরুরি কথা আছে।
কী কথা?
আপনি কিছু মনে করবেন না তো?
তেমন কিছু কথা কি?
হয়তো পছন্দসই হবে না। প্লিজ, রাগ করবেন না।
ঠিক আছে, বলুন।
গোপীদা কীরকম বিপদের মধ্যে আছেন তা তো বুঝতেই পারছেন।
পারছি। হি ইজ বিয়িং হাউন্ডেড।
হ্যাঁ। হাউন্ডেড বাই হার্ডেন্ড ক্রিমিন্যালস।
বুঝলাম।
গোপীদা তবু একা থাকছেন। এই একা থাকাটা আমার পছন্দ হচ্ছে না। লোনলি ম্যান ইজ ইজি টারগেট।
তা হলে কী করতে হবে?
আমি চাই, গোপীদার একজন সর্বক্ষণের সঙ্গী থাকুক। তাতে দু’জোড়া চোখ দু’জোড়া কান এবং দু’জোড়া হাত থাকবে।
সোনালি অবাক হয়ে বলল, একজন গার্ড রাখলেই তো হয়।
গার্ড! গার্ড কি ততটা অ্যালার্ট হবে? বেতনভুক কর্মচারী কি পারে বুক দিয়ে বাঁচাতে?
তা হলে কে পারবে?
গোপীদার কোনও আপনজন। গোপীদাকে ভালবাসে এমন কেউ। সেটা আপনি।
আমি! বলে হাঁ করে চেয়ে থাকে সোনালি।
আপনিই সোনালিদি। আপনি ছাড়া কারও কথা ভাবাই যায় না। আমি যাচ্ছি। আপনি ফোনটা করুন।
সুব্রত চলে গেল। সোনালি বিস্মিত সর্বস্বান্তের মতো বসে রইল। কী অনায়াসে বলে চলে গেল সুব্রত। কিন্তু কী সাংঘাতিক একটা ঝড় তুলে গেল তার বুকে।
সোনালি আরও কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল অভিভূতের মত। তারপর দুর্বল হাতে টেলিফোনটা তুলে ডায়াল করল।
টেলিফোনটা কানে দিয়ে শুনল ওপাশে রিং হচ্ছে।
রিং হয়ে যেতে লাগল, ফোন কেউ ধরল না।
২৮.
ফোনে নো-রিপ্লাই হলে ধরে নিতে হয় যে, লোকটা ফ্ল্যাটে নেই। অথবা ফোনটা খারাপ। ফোন খারাপ থাকার কথা নয়, থাকলে সুব্রত জানত। বাড়ি নেই এটাই ধরে নেওয়া ভাল।
সোনালি তবু একটু উদ্বেগের মধ্যে রইল। লোকটা বিপদের মধ্যে আছে। মারাত্মক বিপদ। একটা কিছু যখন তখন হয়েও যেতে পারে তো! চিন্তাটা সোনালি মাথা থেকে তাড়াতে পারল না। অথচ গোপীনাথের সঙ্গে তার জাগতিক সম্পর্ক শেষ হয়েছে। তাকে নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলে।
সোনালির ডাক এল মনোজের ঘর থেকে, আধ ঘণ্টা বাদে।
মিস সোম, বসুন।
সোনালি বসল।
আপনার সঙ্গে রোজমারি আজ একটা অপ্রিয় প্রসঙ্গে কথা বলেছে।
হ্যাঁ।
মনোজের মুখটা খুবই ভারাক্রান্ত এবং উদ্বিগ্ন। সে গলা খাঁকারি দিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল, আমিও এর আগে একদিন প্রসঙ্গটা তুলে আপনাকে অস্বস্তিতে ফেলেছিলাম। তবু কথাটা যে উঠছে তার কারণ দুটো। আমাদের অ্যালয়ের কেমিক্যাল রি-অ্যাকশন থেকে আমরা কিছু বুঝতে পারছি না। দ্বিতীয় কথা, গোপীনাথ বসুর মতো ট্যালেন্টেড লোককে যে-কোনও মূল্যেই বাঁচানো উচিত।
