সোনালি ভ্রু একটু কুঁচকে বলল, কী ব্যাপারে?
আমাদের কারখানার ব্যাপারে।
সোনালির ভ্রু কেঁচকানোই রইল, অফিসের ব্যাপারে! কিন্তু সেটা আমাকে কেন? আমি তো সামান্য একজন কর্মচারী।
রোজমারি তবু হাসিমুখেই বলল, আপনার এই কারখানা সম্পর্কে অনেক কথাই জানা আছে। সুতরাং আপনি আমাদের ঘনিষ্ঠ কর্মচারীদের একজন। আমরা সম্প্রতি কিছু সমস্যায় পড়েছি। আপনি কি শুনবেন?
ঠান্ডা গলায় সোনালি বলল, ইচ্ছে করলে বলুন।
রোজমারি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গা এলিয়ে বসল। তারপর খুব ধীর গলায় বলল, আমরা যে অ্যালয়টা তৈরি করি সেটা সম্পর্কে আমাদের একটা ধারণা ছিল। বিভিন্ন অত্যাধুনিক ইন্ডাস্ট্রিতে অ্যালয়টা দরকার হয়।
জানি ম্যাডাম।
খুব সম্প্রতি এই অ্যালয়টা কোনও কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমার কারখানাটা অনেকেই কিনে নিতে চেয়েছিল, আমরা দিইনি। এখন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও আমাদের ওপর নজর পড়েছে। আমরা বুঝতে পারছি না কী করব। আপনি তো জানেন, আঁদ্রে মারা গেছে এবং ইন্টারপোলের একজন এজেন্ট সুধাকর দত্ত এসে আমাদের যথেষ্ট বিভ্রান্ত করে দিয়ে যায়।
এ সবই আমি জানি ম্যাডাম।
এর একটা রি-অ্যাকশন হয়েছে সাক্কি ইনকরপোরেটেডেও। আপনি হয়তো জানেন না, সেখানকার একটা প্রোজেক্টের চিফ গোপীনাথ বসুকে অপহরণ করা হয় এবং খুন করারও চেষ্টা হয়েছে।
সোনালি চুপ করে রইল। তার বুক কাঁপছিল।
রোজমারি অত্যন্ত নরম গলায় বলল, আমি আপনাদের সম্পর্কের কথা জানি। গোপীনাথ আপনার প্রাক্তন স্বামী।
সোনালি হঠাৎ মুখটা তুলল। তার দুটো চোখ ছলছল করছে এবং নিজেকে সংযত রাখতে পারছে না সে।
সোনালি বলল, গোপীনাথের কী হয়েছে?
রোজমারি মাথা নেড়ে বলল, যতদূর জানি, এখনও কিছু হয়নি।
সোনালি একটা শ্বাস ছেড়ে চুপ করে রইল।
রোজমারি গলাটা আরও নরম করে বলল, সোনালি, আপনি কি জানেন যে, গোপীনাথের বিপদ এখনও কাটেনি?
আমি কিছুই জানি না। ও কোথায় আছে?
রোজমারি মৃদু স্বরে বলল, বিশ্বস্ত সূত্রে জেনেছি গোপীনাথ বসু এখন কলকাতায় রয়েছেন।
ভীষণ চমকে উঠল সোনালি। গত মাসখানেক যাবৎ সে প্রতি মুহূর্তে গোপীনাথের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার আশঙ্কা করছে। ঠিক বটে গোপীনাথ এখন তার কেউ নয়। কিন্তু গোপীনাথ ছাড়া দ্বিতীয় কোনও পুরুষ সোনালির জীবনে কখনও আসেনি। হয়তো গোপীনাথই পুরুষ সম্পর্কে তার যাবতীয় আগ্রহকে নষ্ট করে দিয়েছিল। একজন কঠিন, আত্মসর্বস্ব, কাজপাগল মানুষ ছিল গোপীনাথ। স্ত্রী সম্পর্কে যার না ছিল ভাবাবেগ, না ভালবাসা, না কোনও আগ্রহ। নিষ্ঠুর ঔদাসীন্যে সে বরাবর এড়িয়ে গেছে সোনালিকে। বিদেশে একা সোনালির কীভাবে যে দিন কাটত সে-ই জানে। গোপীনাথ সারা পৃথিবী চষে বেড়াত নিজের কাজে। গোপীনাথ সম্পর্কে আজ সোনালির কোনও ভাবাবেগ নেই ঠিক কথা, কিন্তু একটু স্মৃতি আছে। সুখস্মৃতি না হলেও স্মৃতি। গোপীনাথের করুণ পরিণতি ঘটলে সে দুঃখ পাবে।
সোনালি বলল, কলকাতায়! কবে এল?
খুব সম্প্রতি।
ও। বলে চুপ করে গেল সোনালি।
রোজমারি নরম গলায় বলল, কলকাতায় এলেও যে তিনি রেহাই পাবেন, এমন নয়। আপনি হয়তো জানেন না, বেশ কয়েকটা আন্তর্জাতিক মাফিয়া গোষ্ঠী তাকে খুঁজছে।
কেন খুঁজছে?
গোপীনাথ একজন মন্ত বিশেষজ্ঞ। হয়তো আমাদের অ্যালয় সম্পর্কে সত্যিকারের বিজ্ঞানসম্মত সত্যভাষণটা তিনিই করতে পারবেন। কিন্তু কেউ কেউ চায় না যে গোপীনাথ সেটা করুন।
তা হলে কী হবে?
রোজমারি অত্যন্ত সমবেদনার গলায় বলল, গোপীনাথকে বাঁচানো দরকার।
সোনালি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। কিন্তু কিছু বলল না।
রোজমারি বলল, আমাদেরও একটু স্বার্থ আছে। আমরাও তার কাছ থেকে সত্যটা জানতে চাই। জানলে আমাদের অ্যালয় অনেক বেশি মূল্যবান হয়ে উঠবে।
ও। সোনালির নিস্পৃহ জবাব।
শুনুন সোনালি, স্বার্থ থাকলেও আমরা গোপীনাথের মতো একজন কাজের লোককে হারাতে এমনিতেই চাই না। তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমাদের কিছু করা উচিত। আপনিও কি তা চান না?
সোনালি অভিভূতের মতো চেয়ে থেকে বলল, আপনি কী বলতে চাইছেন স্পষ্ট করে বলুন।
আমরা গোপীনাথের ফ্ল্যাটের ঠিকানাটা জানি না।
জেনে কী করবেন?
তার সিকিউরিটির ব্যবস্থা করব।
সোনালি হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, এ ব্যাপারে আমি এখনই কিছু বলতে পারি না।
ভেবে বলবেন?
হ্যাঁ, তার আগে ঠিকানাটা উনি দিতে রাজি কি না সেটাও আমার জানা দরকার।
তবে তাই হোক। যদি গোপীনাথের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তা হলে তাকে বলবেন রোজমারি এই প্রস্তাব দিয়েছে যে, তার সিকিউরিটি এবং মাসে এক লক্ষ টাকা বেতন দিতে আমরা প্রস্তুত। তিনি যদি আমার কনসার্নে কাজ করেন তা হলে আমরা কৃতজ্ঞ বোধ করব।
চেষ্টা করব বলতে।
হ্যাঁ, এক লক্ষ টাকা মাইনে ছাড়াও তার যাবতীয় খরচও আমরা দেব, ধরুন মাসে আরও পঞ্চাশ হাজার টাকার মতো। দয়া করে একথাও বলবেন, বেতন নিয়ে তিনিও তার মতামত দিতে পারেন, আমরা বিবেচনা করতে রাজি আছি।
বলব।
আপনি আজ একটু টেনশনে আছেন। ঠিক আছে আসুন। কাল কথা হবে।
সোনালি সম্পূর্ণ একটা ঘোরের মধ্যে নিজের ঘরে এল। এমনকী যে-লোকটা তার টেবিলের মুখোমুখি বসে তার জন্য অপেক্ষা করছিল, প্রথমে তাকে লক্ষই করল না।
সুব্রত বলল, কোথায় গিয়েছিলেন দিদি?
