মাখন পাঁউরুটির দোকান পর্যন্ত আর কিছু ঘটল না বটে, কিন্তু সহজ কাজগুলো যে কত কঠিন হয়ে উঠেছে তা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারল সে।
ঘণ্টা দুয়েক বাদে সুব্রত যখন এল তখনও সে সেই কথাটাই বলল।
সুব্রত বলল, কাজ কি আপনার এখানে থাকার? আমার বাড়িতে চলুন।
না রে, আমি এখন বিপজ্জনক মানুষ।
কী যে বলেন। চলুন তো, এমনি লুকিয়ে রাখব যে, কেউ টের পাবে না।
ওরা সব টের পায়।
যাক গে, আমি ভয় খাই না। আপনি চলুন।
ও কথা থাক রে সুব্রত, এখন কাজের কথা বল। রোজমারি আমার ঠিকানা চায় কেন?
স্বার্থেই চায়। তবে মুখে বলছে, আপনাকে সিকিউরিটি দেবে।
কীরকম সিকিউরিটি?
তা জিজ্ঞেস করিনি।
ওর কি কোনও সিকিউরিটি এজেন্সি আছে চেনাজানা?
থাকতেই পারে। ঘ্যামা লোকদের কত কী থাকে।
আমি যে কলকাতায় এসেছি এ খবর রোজমারি পেল কোথায়?
তা তো জানি না।
খোঁজ নে।
নেব। তবে সোমবারের আগে হবে না।
আর একটা কথা। রোজমারির প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হলে আমি ভেবে দেখব।
কেন গোপীদা?
ওর ল্যাবরেটরিটা আমার দরকার।
আপনার বডিগার্ড লাগবে বলছিলেন, সত্যি নাকি?
গোপীনাথ একটু ভেবে বলল, বডিগার্ড ব্যাপারটাই হাস্যকর।
অস্বস্তিকরও। কিন্তু দরকার হলে ব্যবস্থা করতে হবে।
গোপীনাথ মাথা নেড়ে বলল, আফটার এ সেকেন্ড থট, বডিগার্ডের প্রস্তাব বাতিল করছি।
কেন গোপীদা?
বাঙালি বা ভারতীয় বডিগার্ডের ওপর আমার ভরসা নেই। দ্বিতীয় কথা, বডিগার্ড রাখলে লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে।
কিন্তু আপনার তো বিপদ।
গোপীনাথ চিন্তিত মুখে বলল, বিপদটাও ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে। চিন্তা করিস না। মনে হচ্ছে ক্রাইসিসটা সামলে নিতে পারব।
আপনি রিস্ক নিচ্ছেন গোপীদা।
গোপীনাথ একটু হেসে বলল, একটা নিরাপদ নিশ্চিত জীবন যাপন করার পর এই বিপদের জীবনটা খারাপ লাগছে না কিন্তু। জীবনের একঘেয়ে সাকসেস স্টোরিতে একটা নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে। নট ব্যাড।
আপনি খুব অদ্ভুত মানুষ গোপীদা।
গোপীনাথ শুধু একটু হাসল।
সুব্রত বলল, আপনি সোনালিদির কথা কিছু জানতে চাইলেন না তো!
গোপীনাথের মুখখানা উদাস হয়ে গেল, কী-ই বা জানার আছে! আর জেনে হবেটাই বা কী?
সুব্রত একটু রাগের গলায় বলল, অথচ এই তো কিছুদিন আগে আপনি সোনালিদিকে নিজের বিষয়সম্পত্তি দিয়ে দিতে চাইছিলেন।
তখন উপায় ছিল না। আমার তো উত্তরাধিকারী কেউ নেই। সোনালি একসময়ে তো আমার স্ত্রী ছিল, সেই সুবাদে যা একটু সম্পর্কের ছায়া আছে। তা সে তো রিফিউজই করেছে।
সুব্রত মৃদু স্বরে বলল, সোনালিদি রিফিউজ না করলে তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা থাকত না। ভদ্রমহিলার আত্মমর্যাদার বোধ খুব টনটনে।
তা হবে। ওসব আলোচনায় আর লাভ কী? ও আমার অফার রিফিউজ করায় আই ফেল্ট ইনসাল্টেড।
কেন গোপীদা, আপনাকে অপমান করার জন্য তো করেননি। ওঁর আত্মমর্যাদায় লেগেছিল বলে নেননি।
হঠাৎ তুই সোনালির সাউকার হয়ে উঠলি কেন? তোকে কি ও উকিল রেখেছে?
সুব্রত হাসল না। গম্ভীর হয়ে বলল, আপনাদের দুজনের মধ্যে কী ঘটেছিল জানি না, কিন্তু আপনাকে বা সোনালিদিকে কাউকেই আমার খারাপ মনে হয় না।
আমিই খারাপ।
কথা এড়িয়ে যাবেন না গোপীদা। কী হয়েছিল বলুন।
গোপীনাথ সামান্য বিরক্ত হল। বলল, এটা কি সেসব কথা বলার সময়? দেখছিস তো কী অবস্থায় আমি আছি।
সুব্রত একটু চুপ করে থেকে বলল, আমার কী মনে হচ্ছে জানেন? আমার মনে হচ্ছে আপনার এই বিপদের দিনে আপনার একজন বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান সঙ্গী দরকার।
গোপীনাথ একটু ব্যঙ্গের সুরে বলল, সেই সঙ্গী কি সোনালি?
নয় কেন?
নয় এই কারণে যে, আমার সবচেয়ে প্রয়োজনের সময়ে, ব্যস্ততার সময়ে সোনালি আমাকে অপমান করে ছেড়ে চলে এসেছিল। অ্যান্ড শি নেভার লুকড ব্যাক।
কিন্তু কেন এসেছিল গোপীদা?
বোধহয় সে নারীবাদী বা আর কিছু।
আপনি সোনালিদিকে ভাল করে জেনেছেন কি?
চেষ্টা করেছি। স্ত্রীয়াশ্চরিত্রম বোঝার মতো এলেম আমার নেই।
এটা একটা ক্লিশে।
সোনালি তোকে কত করে ফি দিচ্ছে বল তো।
সোনালিদি ফি দেবেন কেন? তিনি কি আপনার সঙ্গে কমপ্রোমাইজ করার জন্য লালায়িত?
গোপীনাথ হেসে বলল, লালায়িত কথাটা বেশ বলেছিস। না হয় মানলাম সে লালায়িত নয়। কিন্তু তুই হামলা মাচাচ্ছিস কেন?
আপনার কথা ভেবে।
আমার কথা বেশি ভাবিস না। দুঃখ পাবি। আমাকে খরচের খাতায় ধরে রাখ।
সেটা পেরে উঠছি না। ছেলেবেলা থেকে আপনাকে দেখে আসছি। আপনি আমার আইডল ছিলেন।
গোপীনাথ একটু গম্ভীর হয়ে বলল, তুই আমার ভাল চাস জানি। কিন্তু সোনালির সঙ্গে আমাকে আর জুড়বার চেষ্টা করিস না, কারণ, স্বামী হিসেবে আমি কোনও মেয়েরই যোগ্য নই। মেয়েদের একটা পারিবারিক জীবন চাই, তাদের কিছু সেন্টিমেন্টাল চাহিদাও থাকে, যেটা একেবারেই অন্যায্য নয়। কিন্তু আমি ভেবে দেখেছি, ওসব আমার দ্বারা হওয়ার নয়। কিছু মানুষ থাকে যাদের ঘরে সেট করা যায় না, তারা অ্যাডজাস্টমেন্টে আসতে জানেই না।
সুব্রত মৃদু হেসে বলল, যার নিজের সম্পর্কে অ্যাসেসমেন্ট এত ক্লিয়ারকাট সে তো ইচ্ছে করলেই এই অসুবিধেটা টপকে ফেলতে পারে।
গোপীনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, পারলাম কই?
একটু চেষ্টা করলে পারতেন না?
গোপীনাথ ম্লান হেসে বলল, তুই হয়তো জানিস না সোনালির সন্দেহবাতিক ছিল সাংঘাতিক। তার ধারণা হয়েছিল আমার সঙ্গে বিভিন্ন মেয়েমানুষের সম্পর্ক আছে।
