গোপীনাথ মৃদু হেসে বলল, না, সেটা আপনাদের ডিস্টার্ব করা হবে। পার্টির পরের সকালটা বিশ্রামই নেয় লোকে।
ওঃ, পার্টি আমাদের রোজই হয়। আসুন, ভাল করে শুনি
গোপীনাথ ভিতরে ঢুকল। সব ফ্ল্যাটই প্রায় একরকম। বিশাল হলঘর, মুখোমুখি শোয়ার ঘর, ডান ধারে রান্নাঘর। এদের ফ্ল্যাটটা অবশ্য খুবই মহার্ঘ আসবাবে সাজানো। কালো টাকার গন্ধ আসছে। সামনের ঘরটা ভুক্তাবশেষ বা বোতল-গেলাসে অগোছালো হবে বলে আশঙ্কা ছিল তার। দেখল, সবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং গোছানো। পার্টির রেশ নেই। তবে লম্বা সোফায় একজন উপুড় হয়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে।
ভদ্রমহিলা বললেন, ডোন্ট মাইন্ড হিম। বসুন।
গোপীনাথ একটু অস্বস্তি নিয়ে বসল।
একটু কফি খাবেন?
না, ঝামেলার দরকার নেই।
ঝামেলা হবে কেন? আমাদের কাজের লোক আছে। এক মিনিট লাগবে। জাস্ট রিল্যাক্স।
ভদ্রমহিলা কফির কথা বলতে গেলেন। এসেই মুখোমুখি বসে বললেন, এবার একটু বলুন তো, কী হয়েছে।
গোপীনাথ সবটা বলল না। রেখেঢেকে বলল। কাল রাতে তার ফ্ল্যাটে ঢোকার চেষ্টা করেছিল দুটো লোক। শেষ অবধি পারেনি, ইত্যাদি।
ভদ্রমহিলা বিস্ফারিত চোখে সব শুনে বললেন, আজকাল কলকাতার ফ্ল্যাটবাড়িগুলোতে এসব খুব হচ্ছে। আমি তো সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকি।
কফির ট্রে ঠেলে নিয়ে এল উর্দিপরা একটা লোক। ঠাটবাট এদের ভালই।
গোপীনাথ কালো কফি পছন্দ করে। এক কাপ ঢেলে নিয়ে চুমুক দিয়ে বলল, ডিস্টার্ব করলাম বলে দুঃখিত।
কিছু ডিস্টার্ব করেননি। আমাকে সকালে উঠতেই হয়। ন’টায় আমার অফিস। আপনি কোথায় কাজ করেন?
গোপীনাথ আনমনে বলল, সাক্কি ইনকরপোরেটেডে।
ভদ্রমহিলা একটু অবাক হয়ে বললেন, সাক্কি? সেই বিখ্যাত সাক্কি কি? কিন্তু তার তো কোনও অফিস এখানে নেই।
না। আমি কাজ করি রোমে।
রোম! ওঃ, আপনি তা হলে এনআরআই?
হ্যাঁ। অনেকদিন।
ভদ্রমহিলা গুছিয়ে বসে বললেন, রোম চমৎকার শহর, না?
হ্যাঁ। ভালই।
আমি দু’বার গেছি।
তাই বুঝি।
আমিও এনআরআই। আমেরিকায় ছিলাম। বছর পাঁচেক চলে এসেছি। ডিভোর্সও হয়ে গেল।
গোপীনাথ বলল, স্যাড।
না আমার কোনও দুঃখ নেই। বেশ আছি। ফ্রি।
তাও বটে। আমি এবার উঠি? আপনি তো অফিসে যাবেন।
হ্যাঁ। এনি ওয়ে, মাঝে মাঝে আসবেন। আমি মানুষ ভালবাসি। এই ফ্ল্যাটে সপ্তাহে দু’দিন পার্টি থাকেই।
গোপীনাথ হাসে, আর বাকি পাঁচ দিন?
পাঁচ দিন আমরা অন্যদের পার্টিতে যাই।
ভদ্রমহিলাও হাসলেন। তারপর ফের বললেন, পার্টিই বাঁচিয়ে রেখেছে, জানেন! একা হলে হাঁফ ধরে যায়।
পার্টির নেশা যে সাংঘাতিক তা গোপীনাথ জানে। বিশেষ করে একা মানুষদের কাছে পার্টি একটা পালানোর জায়গা। একটা আশ্রয়। নিঃসঙ্গতাকে ভুলে থাকবার উপায়।
মাঝে মাঝে আসবেন। কাম নেক্সট স্যাটার ডে।
পার্টি?
হ্যাঁ। প্লিজ।
চেষ্টা করব।
কাম উইথ ইয়োর ওয়াইফ।
সেটা সম্ভব নয়।
ও মা, কেন? উনি বুঝি কনজারভেটিভ?
না। আমরা ডিভোর্স করেছি।
ওঃ, সরি। তা হলে একাই আসবেন।
গোপীনাথ বিদায় নিয়ে চলে এল। এসেই ফোন করল সুব্রতকে।
ঘুম ভেঙেছে?
হ্যাঁ গোপীদা। কী খবর?
খবর ভাল নয়।
কী হয়েছে?
বডিগার্ড দরকার হবে কি না বুঝতে পারছি না।
কেন, কী হল আবার?
আজ একবার আসতে পারবি?
আরে, আজ তো আপনার ওখানে যাওয়ারই প্রোগ্রাম আমার, ভুলে গেছেন?
ওঃ, হ্যাঁ, আজ শনিবার, না?
হ্যাঁ। আজ আমার ছুটি।
তা হলে চলে আয়।
যাচ্ছি। একটু তৈরি হয়ে নিই।
গোপীনাথ ফোন রেখে দিল। ঘণ্টাখানেক বাদে হঠাৎ আবার সুব্রতর ফোন, গোপীদা, আমাদের বস রোজমারি আমাকে ফোন করে আপনার ঠিকানা চাইছে।
কেন?
তা জানি না। বলছে জরুরি দরকার। দেব? না। কিছুতেই না।
২৬-৩০. সুব্রতকে টেলিফোন করার পর
সুব্রতকে টেলিফোন করার পর গোপীনাথ সারা ফ্ল্যাটটা ঘুরে বেড়াল আর ভাবল। এই ফ্ল্যাট বা আর কোথাও সে নিরাপদ নয়। তবু রোমে সে যে বিপদের মধ্যে ছিল এখানে সে ততটা বিপদে হয়তো নেই। কারণ, মাফিয়ারা কলকাতায় এসে তেমন কিছু সুবিধে করতে পারবে না। এটা অচেনা শহর। তাদের ভাড়া করতে হবে কলকাতার খুনিয়াদের। সেইটেই হয়তো তার ভরসা। কলকাতার খুনেরা মাফিয়াদের মতো সংগঠিত নয় এবং হয়তো ততটা বুদ্ধিমানও নয়। কাল রাতে যারা হানা দিয়েছিল তারা তো রীতিমতো বোকা। তবে বারবার বোকা বানানো সহজ হবে না। তবু তার ততটা ভয় করছে না, যতটা রোমে হয়েছিল।
ফ্ল্যাটটা তার নিরাপদ মনে হচ্ছে না একটাই কারণে। তার ঠিকানাটা কোনও ভাবে প্রতিপক্ষের জানা হয়ে গেছে। তার কি পালানো উচিত?
গোপীনাথ ফ্রিজ খুলে দেখল, খাবারদাবার বিশেষ কিছু নেই। ব্রেকফাস্টের জন্য পাঁউরুটি, মাখন এবং কিছু ফলটল জাতীয় জিনিস দরকার। কফি এবং চাও কিনতে হবে।
গোপীনাথ পোশাক পরে বেরিয়ে পড়ল। আগে সে রাস্তায় হাঁটত ভাবতে ভাবতে। বরাবরই সে একটু চিন্তাশীল এবং অন্যমনস্ক লোক। কিন্তু জীবনে বিপদ শুরু হওয়ার পর তার অন্যমনস্কতা পালিয়েছে, চিন্তাশীলতায় এসেছে নিয়ন্ত্রণ। সে এখন চারপাশকে লক্ষ করে।
দোকান অবশ্য বেশি দূরে নয়। ফ্ল্যাট ছাড়িয়ে বড় রাস্তার দিকে গেলে পর পর কয়েকটা ভাল দোকান। দু’মিনিটের হাঁটাপথ। এই পথটুকু পেরোনোই আজ কত শক্ত আর সন্দেহজনক হয়ে উঠেছে। একটা লাল জামা আর কালো প্যান্ট পরা ছোকরা একটা রোগা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে তার দিকে বার দুই তাকাল। গোপীনাথ উলটে ছেলেটির দিকে এমন কঠিন চোখে তাকাল যে, সত্যযুগ হলে ছোকরা ভস্মীভূত হয়ে যেত। দু’জন কৃষ্ণভক্ত গেরুয়াধারী সাহেব তাকে পেরিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল দ্রুত পায়ে। গোপীনাথ খুব ঠাহর করে দেখল তাদের, পিছন থেকে যতটা দেখা যায়।
