মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা করার পর দরজার পাল্লাটা খুব ধীরে ধীরে ফাঁক হতে লাগল।
প্রায় মিলিমিটারের মাপে। একটা জোরালো টর্চের আলো ঘরটাকে যেন চমকে দিল হঠাৎ। তলোয়ারের মতো এদিক আর ওদিকে দু’-তিনবার চালিত হয়ে অন্ধকারকে যেন ফালা ফালা করে ফেলল।
ঘরে ঢুকল দু’জন। সামনে একজন, দু’পা পিছনে আর-একজন। একটু কুঁজো হয়ে, সতর্ক পায়ে।
গোপীনাথের মনে হল, এবার একটু ডাইভারশন দরকার। সে ছোরাটা তুলল। ভাবল ঘরের অন্য প্রান্তে ছুঁড়ে মারবে, যাতে শব্দ শুনে খুনিরা ওই দিকে যায়। ছোরাটা তুলেও হঠাৎ থেমে গেল সে। বোধহয় ভুল করবে সে এ কাজ করলে। বরং অপেক্ষা করা যাক।
দু’জনের একজন টর্চটা চারদিকে নিক্ষেপ করল। কিন্তু গোপীনাথ আলমারির আড়ালে থাকায় তাকে দেখতে পেল না।
ঘরটা পেরিয়ে শোয়ার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ফের টর্চ জ্বালল লোকটা। তারপর চাপা গলায় বলল, ব্যাপারটা কী?
অন্য জন বলল, কী?
মালটি তো নেই দেখছি।
বাথরুমটা দেখ।
আরে দূর, সদর দরজা খোলা ছিল না?
তা ছিল।
শালা ভেগেছে।
তবু খুঁজে দেখা যাক।
দু’জনে ঘরে ঢুকে গেল।
কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে গোপীনাথ নিঃশব্দে দ্রুতগতিতে ফ্ল্যাটের বাইরে বেরিয়ে এল। সিঁড়িতে ওপরের দিকে মাঝামাঝি উঠে ল্যান্ডিং-এ দাঁড়িয়ে নীচে চেয়ে রইল।
পাঁচ-দশ মিনিট বাদে লোকদুটো বেরিয়ে এল। চারদিকে টর্চটা বারকয়েক ঘুরিয়ে দেখল। তারপর লিফটে উঠে চলে গেল।
দরজাটা খোলাই রেখে গেছে ওরা। গোপীনাথ এসে ফ্ল্যাটে ঢুকে দরজাটা ফের লক করে আলো জ্বালল। শোয়ার ঘরে এসে দেখল তার সুটকেস হাতড়ানো, মানিব্যাগটা টেবিলের ওপর থেকে হাওয়া, একটা ক্যালকুলেটর, একটা ওয়াকম্যান ইত্যাদি রাখা ছিল বিছানার পাশের টেবিলে। সেগুলো নেই। প্রাণের চেয়ে অবশ্যই এগুলোর দাম বেশি নয়।
কিন্তু সে কতটা নিরাপদ তা গোপীনাথ বুঝতে পারছে না। ওরা কি ফিরে আসবে? এলে কখন, বা কবে? ওদের উদ্দেশ্যই বা কী?
কিছু জিনিস চুরি করলেও ওরা কম্পিউটারটা স্পর্শও করেনি। তাতেই বোঝা যায় ওরা গোপীনাথের গবেষণায় আগ্রহী নয়। সুতরাং খুন ছাড়া আর কী-ই বা হতে পারে।
গোপীনাথ ফ্রিজের ঠান্ডা জল খেল খানিকটা। তারপর ঘরের বাতি নিভিয়ে দরজার মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসে রইল। ডান হাতে ছুরিটা, যেটা কোনও কাজে লাগেনি। লাগবেও না বোধহয়। তবে গোপীনাথকে হয়তো এক চিমটি আত্মবিশ্বাস ছুরিটা দিচ্ছে।
বাকি রাতটা কোনও উৎপাত হল না। ভোরের দিকে গোপীনাথ একটু তন্দ্রাচ্ছন্নও হয়ে পড়েছিল। তবু সূর্যোদয়ের আগেই সে উঠল এবং নীচে নামল। ফ্ল্যাটবাড়ির দারোয়ানদের সঙ্গে কথা বলা দরকার।
রাত-ডিউটি যার ছিল সে ফটক খুলে একটা টুলের ওপর বসে হাই তুলছিল।
গোপীনাথ তাকে জিজ্ঞেস করল, রাতে আপনার ডিউটি ছিল?
লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে সসম্ভ্রমে বলল, জি।
কাল অনেক রাতে দুটো নাগাদ দু’জন লোক এ বাড়িতে ঢুকেছিল কি?
লোকটা একটু ভেবে বলল, বাবুলোগ তো অনেকেই বেশি রাতে ফেরেন।
এ দু’জন বাইরের লোক।
লোকটা আরও একটু ভেবে বলল, হ্যাঁ, এসেছিল।
কার কাছে যেতে চেয়েছিল।
চারতলার থ্রি ডি ফ্ল্যাটে।
আপনারা কি না জেনেই ছেড়ে দেন?
না, ফোন করতে হয়।
ফোন করেছিলেন?
করেছিলাম।
থ্রি ডি ফ্ল্যাট থেকে কেউ কিছু বলেছিল?
দারোয়ান লোকটা এই জেরায় ভয় পেয়ে গিয়ে বলল, কিছু গড়বড় হয়েছে কি সাহেব?
সেটা পরে বলছি। আগে আমার কথার জবাব দিন। থ্রি
ডি ফ্ল্যাটে মল্লিকজি থাকেন। খুব ড্রিঙ্ক করেন। ওঁর ঘরে বহোৎ আড্ডা হয়। খানাপিনা হয়। কাল রাতেও পার্টি ছিল। আমি ফোন করতেই মল্লিকজির ঘর থেকে কে একজন বলল, পাঠিয়ে দাও। আরও দুটো পাপী এসেছে।
আপনি তাই ছেড়ে দিলেন?
জি।
লোক দুটোকে চলে যেতে দেখেছেন?
হ্যাঁ। এক ঘণ্টা পরে তারা চলে যায়।
ঠিক আছে। মল্লিকবাবুর ফ্ল্যাটে কে কে থাকে?
মল্লিকবাবু একাই থাকতেন। আজকাল একজন লেডিও থাকেন।
ওঁর কে হন উনি?
তা জানি না।
ওঁর স্ত্রী নেই?
ডিভোর্স করেছেন।
ও
গোপীনাথ আর কথা বাড়াল। লিফটে চারতলায় উঠে এল। থ্রি ডি ফ্ল্যাটের ডোরবেলটা বেশ কয়েকবার বাজাতে হল তাকে।
দরজা খুললেন একজন মহিলা। নাইটি পরা, চোখে ঘুম, মুখে বিরক্তি।
কী চাই? বেশ ঝাঝালো গলা।
গোপীনাথ ভদ্রমহিলাকে কয়েক সেকেন্ডে জরিপ করে নিল। বয়স মধ্য ত্রিশ। একসময়ে বেশ সুন্দরী ছিলেন। রং টকটকে ফরসা, মুখশ্রী চমৎকার। শুধু অনভিপ্রেত কিছু চর্বি শরীরকে অনেকটাই বেঢপ করে দিয়েছে।
আমি এই ফ্ল্যাটবাড়িতেই থাকি। ওপরে। আমি একটা কথা জানতে এলাম।
ভদ্রমহিলা চোখ কুঁচকে বললেন, কী কথা?
রাত দুটোর সময় আপনাদের ফ্ল্যাটে কোনও গেস্ট এসেছিল কি?
মনে নেই।
প্লিজ, একটু ভেবে বলুন। দেয়ার কুড হ্যাভ বিন এ মার্ডার।
ভদ্রমহিলা হঠাৎ বিস্ফারিত চোখে বললেন, মার্ডার! কে মার্ডার হল?
হয়নি। হতে পারত। রাত দুটো নাগাদ দু’জন লোক এসে এ বাড়িতে ঢুকেছিল। তারা আপনাদের ফ্ল্যাটে আসতে চেয়েছিল। আপনাদের ঘর থেকে কেউ তাদের ওপরে পাঠিয়ে দিতে বলে।
ভদ্রমহিলা বড় বড় চোখে চেয়েই ছিলেন। বললেন, তারা দু’জন তো আসেনি।
সেটাই স্বাভাবিক। তারা আমার ফ্ল্যাটে হানা দিয়েছিল।
সর্বনাশ! কেন?
বোধহয় উদ্দেশ্য ছিল আমাকে খুন করা।
ভদ্রমহিলা ঘরের দরজাটা আরও খুলে দিয়ে দু’পা পিছিয়ে গিয়ে বললেন, আপনি ভিতরে আসুন, প্লিজ।
