আমি কি এখনও আকর্ষণীয়া?
বটেই তো।
আজ আরও একজন একথা বলেছে।
সে কে? আমার প্রতিদ্বন্দ্বী?
না, তার নাম জো। জোসেফ ক্লাইন।
ঈশ্বর! সে তোমার প্রাক্তন স্বামী!
হ্যাঁ, তার সঙ্গে আজ দেখা হয়েছিল।
কী চায় সে?
আমাকে চায় না। তবে অন্য কিছু চায়। আর সেজন্যই তোমাকে এত রাতে বিরক্ত করা।
বিরক্ত নই। বলো।
ঘরে কেউ আছে?
লুলু একটু হাসল, আছেও বটে, নেইও বটে।
তার মানে আছে।
আছে। তবে মেয়েটা বুরবক। কোনও ভয় নেই, বলল। জার্মান সে জন্মেও শোনেনি। হ করে আমার দিকে চেয়ে আছে।
শোনো লুলু। আমার একজন অতিথি আসছে। তাকে একটু ভালরকম প্রোটেকশন দিতে হবে।
কে অতিথি।
আছে একজন।
বিশেষ কেউ?
খুব বিশেষ।
কী ধরনের প্রোটেকশন?
ফুল প্রুফ।
তার কি জীবন সংশয়?
হ্যাঁ। তার পিছনে তিনটে ইন্টারন্যাশনাল গুন্ডার দল লেগে আছে।
ঈশ্বর! সে এখন কোথায়?
কলকাতায়।
নাম-ঠিকানা বলল।
নাম গোপীনাথ বসু। ঠিকানাটা কাল দেব।
লুলু হঠাৎ একটু চুপ করে গেল। তারপর বলল, ঠিক আছে।
পারবে?
পারতেই হবে। তোমার হুকুম।
আমরা তোমার ফি দেব। কিন্তু তোমাকে গ্যারান্টি দিতে হবে।
মানুষ কোনও গ্যারান্টি দিতে পারে না, রোজমারি। তবে আমি যথাসাধ্য করব।
তা হলেই হবে। তোমার ওপর আমার অনেক নির্ভরতা।
ধন্যবাদ রোজমারি। ঠিকানাটা কখন পাব?
কাল বেলা বারোটা নাগাদ। ঠিকানাটা ট্রেস করতে হবে।
ঠিক আছে। আমি অপেক্ষা করব।
ফোনটা রেখে রোজমারি বাতি নেভাল। কিন্তু অনেকক্ষণ তার ঘুম এল না। গোপীনাথকে কাল থেকে হয়তো নিরাপত্তা দেওয়া যাবে, কিন্তু আজ রাতে সে কতটা নিরাপদ? তার চেয়েও বড় কথা, গোপীনাথকে শুধু নিরাপত্তা দিলেই হবে না, সুধাকর দত্তর থাবা থেকে ওকে বের করতে আনতে হবে। সুধাকর দত্ত নামটা মনে হলেই রোজমারি শক্ত হয়ে যায়। ওরকম ঠান্ডা মাথার রোবট-মানুষ সে আগে কখনও দেখেনি।
রোজমারি দুটো ট্রাঙ্কুলাইজার খেয়ে আবার শুল। ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ল।
.
রাত দুটো অবধি জেগে গোপীনাথ তার কম্পিউটারের হার্ড ডিস্কে যাবতীয় তথ্যাবলি ভরে ফেলছিল। গত তিনদিন ধরে একটানা কাজ। এ সবই পেপার ওয়ার্ক। এতে কাজ ততটা হবে যতক্ষণ না হাতেকলমে করা যায়।
আদ্রেঁর কাগজপত্রের মধ্যে সে বারবার একটা ব্যক্তিগত ডায়েরির উল্লেখ পাচ্ছে। আদ্রেঁ হয়তো ডায়েরি রাখত। কিন্তু ডায়েরিটা কোথায় তা জানে না সে। সেই ডায়েরিতে কি আদ্রেঁ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস লিখে রেখে গেছে? চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা সমাধান?
রাত দুটোয় হেলানো চেয়ারে বসে গোপীনাথ চোখ বুজে ভাবতে লাগল। যতদূর মনে পড়ে, আরে ডায়েরি লেখার অভ্যাস ছিল না, অবকাশও পেত না। উদয়াস্ত পড়ে থাকত সাক্কির অফিসে নিজের ঘরখানায়। কাজ আর কাজ। তবু ডায়েরির উল্লেখ যখন আছে তখন সেখানে কিছু থাকবেই। কিন্তু সে ডায়েরি কোথায় কে বলবে?
গোপীনাথ চুপ করে বসে ভাবছিল। ভাবতে ভাবতে তার একটু ঝিমুনি এল।
ঝিমোতে ঝিমোতে যখন বড় ঘুম এসে যাচ্ছিল প্রায়, তখনই সে হঠাৎ চমকে উঠল। মৃদু, খুব মৃদু একটা শব্দ হল না? কেউ যেন সন্তর্পণে লিফটের দরজা খুলল এবং বন্ধ করল?
সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা গোপীনাথকে অনেক সতর্ক ও তৎপর করেছে। সে টপ করে উঠল পড়ল এবং দ্রুত পায়ে দরজার স্পাই হোলে গিয়ে চোখ লাগাল।
বাইরের ল্যান্ডিং-এ আলো জ্বলছে না। কেন জ্বলছে না? কেউ কি আলো নিভিয়ে দিল?
গোপীনাথও নিজের ঘরের আলো নিভিয়ে দিল। দরজা লক করা আছে। বিপদ এলেও সময় পাবে গোপীনাথ।
সে রান্নাঘরে গিয়ে একটা বড় মাংস-কাটা ছুরি তুলে নিয়ে এল। আগ্নেয়াস্ত্রের সামনে এটা কোনও প্রতিরোধ নয়, সে জানে। তবু মরার আগে একটা চেষ্টা করা যাবে। ঘটনাটা একতরফা ঘটতে দেওয়া যায় না।
স্পাই হোলে চোখ রাখল গোপীনাথ। ল্যান্ডিং অন্ধকার। কিন্তু সেই অন্ধকার যেন অনেক ঘটনার সম্ভাবনায় ভরা।
২৫.
গোপীনাথ বিপজ্জনক জীবন কখনও যাপন করেনি। তার জীবন গবেষণা আর লেখাপড়া নিয়ে। সেখানে মারদাঙ্গা, বিপদআপদ ইত্যাদির উকিঝুঁকি নেই। অন্তত এতকাল ছিল না। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে একটু নতুন অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রয়োজন। গোপীনাথ ভীত নয় তেমন, কিন্তু উদ্বিগ্ন। কারণ রণকৌশল তার জানা নেই।
স্পাই হোল-এ চোখ রেখে ল্যান্ডিং-এর অন্ধকারে কিছুই দেখতে না পেয়ে সে একটু ভাবল। পৃথিবীর যে-কোনও দরজাই ভঙ্গুর। অভেদ্য দরজা বলে কিছু নেই। সেই দরজাই সবচেয়ে মজবুত যা ভাঙতে বা খুলতে সবচেয়ে বেশি সময় লাগে। ফ্ল্যাটের দরজাটা সাধারণ। এর লক-ও কিছু ভল্টের মতো নয়। কোনও আততায়ী এসে থাকলে এবং সেই আততায়ী প্রশিক্ষিত হয়ে থাকলে দরজাটা ভেদ করতে দশ মিনিটের বেশি লাগবে না। আজকাল প্লাস্টিক চার্জও পাওয়া যায়। প্রায় নীরব বিস্ফোরণে যে-কোনও তালা উড়িয়ে দেওয়া যায় চোখের পলকে।
গোপীনাথ একটু ভেবে একটা অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিল। সে খুব সন্তর্পণে দরজার লকটা খুলে ল্যাচ ঘুরিয়ে একটু ফাঁক করে দিল পাল্লাটা। তারপর নিঃশব্দে ঘরের অন্যপ্রান্তে গিয়ে স্টিলের আলমারিটার পাশে দাঁড়াল। যে-ই এসে থাকুক দরজাটা খোলা দেখে খুবই অবাক হবে এবং একটু ঘাবড়েও যেতে পারে। গোপীনাথের ডান হাতে ধরা ছুরি। চোখ ঈগলের মতো দরজায় নিবদ্ধ।
প্রথমটায় অনেকক্ষণ কিছুই ঘটল না। ঘরের বাতি নেভানো থাকলেও কাঁচের শার্সি দিয়ে নাগরিক আলোর আভা আসছে। তাতে ঘরটা ভালই দেখা যাচ্ছে, একটু আবছা এই যা।
