তা হলে আমরা তাকে অতিরিক্ত কী সিকিউরিটি দিতে পারি? ইন্টারপোলই তো তাকে পাহারা দিচ্ছে।
রোজমারি বিরক্ত হয়ে ভ্রু কোঁচকাল, বলল, তুমি তো বোকা নও।
এ কথায় অপ্রস্তুত হয়ে মনোজ বলল, কী বলতে চাইছ?
গোপীনাথ বসুকে আমাদের দরকার, ঠিক তো?
হ্যাঁ, ভীষণ দরকার।
তাকে সকলেরই দরকার। সাক্কি তাকে খুঁজছে, ভিকিজ মব তাকে খুঁজছে, আরও লোক তাকে মারার জন্য বা ধরার জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমাদের এখন তার পাশে দাঁড়াতে হবে বন্ধুর মতো। ইন্টরপোল তার বন্ধু হলেও তাকে দিয়ে কাজ করাতে পারবে না। আমরা পারব।
কিন্তু সিকিউরিটির ব্যবস্থা করা যাবে কী করে? আমাদের তো ওসব অভিজ্ঞতা নেই। তাকে রাখব কোথায়? পাহারা দেব কীভাবে? সবচেয়ে বড় কথা গোপীনাথ আমাদের বিশ্বাস করবে কেন?
রোজমারি মুখখানা কঠিন করে বলল, মনোজ, তোমাকে নিয়ে মুশকিল কী জানো? তুমি ঠান্ডা মাথায় যুক্তিনির্ভর পরম্পরায় কিছু ভাবতে পারো না।
ওকথা কেন বলছ?
তুমি সুব্রতর কথা ভুলে যাচ্ছ কেন?
সুব্রত! ও হ্যাঁ, সুব্রত গোপীনাথের বন্ধু বটে।
খুব রিলায়েবল বন্ধু। তুমি সুব্রতকে ম্যানুপুলেট করতে না পারলে আমি করব।
লজ্জিত মনোজ বলল, সুব্রতর কথা আমার মনে ছিল না।
আরও একজনকে ভুলে যাচ্ছ।
কে বলল তো!
সোনালি।
সোনালি! সে তো গোপীনাথের প্রসঙ্গই সহ্য করতে পারে না।
হতে পারে। কিন্তু গোপীনাথের বিপদ শুনলে সে হয়তো তাকে রক্ষা করার ব্যাপারে আমাদের সাহায্য করবে।
সবই তো বুঝলাম, কিন্তু গোপীনাথের পিছনে যেরকম ষণ্ডাগুন্ডা লেগেছে তাতে তাকে বাঁচানোর দায়িত্ব নিতে পারি না।
আমি পারি।
কীভাবে পারো?
সেটা তোমাকে এখন বলতে পারছি না। তবে ব্যবস্থা করা যাবে। শু
নেছি মাফিয়ারা ভয়ংকর লোক। সহজে রেহাই দেয় না।
তুমি এখন ঘুমোও গে। কাল সকালে আমাদের এ ব্যাপারে কাজে লাগতে হবে।
মনোজ চলে গেলে রোজমারি ফোন তুলে নিল।
ফোন চারবার বাজবার পর একট ভারী গলা বলল, লুলু হিয়ার।
রোজমারি জার্মান ভাষায় বলল, আমি রোজমারি।
বলো রোজমারি।
একটা কাজ আছে।
কাজ ছাড়া এত রাতে আমাকে তোমার মনে পড়ার কথা নয়।
কাজ ছাড়াও আমি তোমাকে প্রশ্রয় দিই। দিই না?
রোজমারি, আজ রাতে তোমাকে একটা প্রস্তাব দেব?
কী প্রস্তাব।
কাজ ছাড়ো, ব্যাবসায় গুলি মারো, স্বামীটাকে ভুলে যাও, তারপর চলো হাওয়াই দ্বীপে পাকাপাকি বাস করি দু’জনে। সেখানে আমার বাড়ি আছে।
সব জানি লুলু, তোমার মতো ফুর্তির জীবন কাটাতে আমার রুচি হয় না।
কাজ আর কাজের টেনশনে তুমি শুকিয়ে যাচ্ছ রোজমারি।
তাই কী? মাঝে মাঝে সিঙ্গাপুরেও তো যাচ্ছি তোমার সঙ্গে।
সিঙ্গাপুরটা কোনও জায়গা নয়। হাওয়াই হল সেই জায়গা যাকে মর্তের স্বর্গ বললে ভুল হয় না। ঠিক কি না?
নিষ্কর্মাদের স্বর্গ। কাজের লোকের স্বর্গ অন্যরকম।
তা অবশ্য ঠিক। কাজের লোকদের প্রিয় হল তেলকালির গন্ধ, মেশিনের শব্দ, শ্রমিক আন্দোলন আর টেনশন, ওটাই কি স্বর্গ?
ঠিক তাই।
জীবনটা এভাবে নষ্ট করবে রোজমারি?
নষ্ট হচ্ছে না।
হচ্ছে। ওই মনোজ ক্যাবলাকেই বা তুমি কীভাবে সহ্য করো?
মনোজ ভাল লোক। সৎ, পরিশ্রমী, মস্তিষ্কবান।
শেষ কথাটা কী বললে? মস্তিষ্কবান! হাঃ হাঃ
মনোজ প্রতিভাবান। নিজের কাজটা ভালই বোঝে।
সেটা হতে পারে। মেটালার্জি বুঝলেই কি আর মস্তিষ্কবান হওয়া যায়? তুমি তো ওকে ভালওবাসো না রোজমারি!
নাই বা বাসলাম। আমরা ক’টা মানুষ এ জীবনে সত্যিকারের কাউকে ভালবাসতে পারি বলো তো! হয়তো একজনকেও নয়। কিন্তু তবু কিছু লোকের সঙ্গে পার্টনারশিপে আসতেই হয়। বিবাহিত জীবনও তো একটা করপোরেশন। একটা কোম্পানি পার্টনারশিপ।
ব্যাবসা ছাড়া তুমি কিছু বোঝো না?
তুমি যেমন ফুর্তি ছাড়া কিছু বুঝতে চাও না।
ডার্লিং রোজমারি, আমার বাবা ব্যাবসা করত জানোত।
জানিই তো।
আমার বাবা কত কোটি টাকা করে গেছে তাও তো জানো।
জানি।
আমি মন দিয়ে ব্যাবসা করলে টাকাটা দ্বিগুণ বা দশগুণ হবে।
এবং তুমি সেটা চাও না তাও জানি।
কেন চাই না তাও তোমাকে বলেছি। ওই টাকা ডবল করতে গিয়ে একদিন দেখব আয়ুটাই ফুড়ুত হয়ে গেছে, দুনিয়া হয়ে গেছে ফ্যাকাশে, মন গেছে মরে।
তাও বলেছ, তোমার জীবনদর্শন আমি মানিনি।
মানলে ভাল করতে। আমার বাবা শেষ জীবনে বুড়ো শকুনের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। বড়বাজারের গদিতে হাঁটু উঁচু করে বসে দুই হাঁটুর ফাঁক দিয়ে মুন্ডু বের করে জুলজুল করে চেয়ে থাকতেন। আমার এত হাসি পেত।
এতে হাসি পাওয়ার কী আছে?
দৃশ্যটা দেখলে তোমারও পেত। মানুষের শকুনাকৃতি কতটা নিখুঁত হতে পারে তা দৃশ্যটা দেখলে তুমি আন্দাজও করতে পারবে না। সেই দৃশ্যটাই আমাকে শিখিয়ে দিল, ও জীবন আমার হবে না কখনও।
লুলু, এবার কাজের কথায় এসো।
এগুলো কাজের কথা, রোজমারি। এদেশ আমার ভাল লাগে না, তোমারও ভাল লাগার কথা নয়।
লাগে না।
তা হলে পড়ে আছ কেন?
আমার কারখানা?
বেচে দাও। আমি খদ্দের ঠিক করে দিচ্ছি। না হলে ওই ভেড়া মনোজকে গছিয়ে দিয়ে চলো কেটে পড়ি। হাওয়াই।
লুলু, তোমার অনেক মেয়ে-বন্ধু, আমি জানি।
রোজমারি, নিষ্ঠুর হয়ো না। মেয়ে-বন্ধু থাকা কি দোষের?
তা বলি না। কিন্তু এত সুন্দরী থাকতে আমাকেই বা কেন দরকার হয় তোমার বলো তো!
এর কি কোনও জবাব হয়? আমার বাবা বিয়ে করেছিল একজন সুইডিশ মহিলাকে। তিনি আমার জন্ম দেওয়ার এক বছরের মধ্যে কেটে পড়েন। বাবা আমাকে গভর্নেসের হাতে ফেলে দিয়ে ব্যাবসায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন, যেন ওটাই তাঁর স্ত্রীর ওপর প্রতিশোধ। স্কুলে পড়াতে তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন লন্ডন। তারপর ব্যাবসা শিখতে আমেরিকা। আমি শিখলাম অনেক, কিন্তু কোনওটারই স্বাদ পেলাম না। আমার মা চলে যাওয়ার পর আমার বাবা নারী-হীন একটা জীবন কাটিয়েছিলেন। বোধহয় প্রকৃতি সেই প্রতিশোধটা আমার ওপর দিয়ে তুলছে। আমার জীবনে অনেক নারী। তবু তুমি আলাদা রোজমারি। তুমি অন্যরকম।
