রোজমারি গলির মুখে গাড়িটা দাঁড় করিয়ে শুনছিল চুপ করে। তার হৃদয় দ্রব হয়েছে, চোখ একটু ছলছলে। বলল, আমার জন্য এখনও কি তোমার একটু আবেগ আছে?
আছে রোজমারি।
তা হলে ভিয়েনার কথা তুললে কেন?
তুললাম তোমাকে ভড়কে দেওয়ার জন্য। যাতে আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে না পারো।
ভিয়েনায় যা ঘটেছিল তা দুর্ভাগ্যজনক। তার বেশি কিছু নয়।
জো একটু হাসল। মৃদুস্বরে বলল, রোজমারি, আমি কিন্তু গোয়েন্দা। গোয়েন্দাদের চোখ একটু বেশি তীক্ষ্ণ।
কী বলতে চাইছ জো?
জো রোজমারির দিকে একটু চেয়ে থেকে মৃদুস্বরে বলল, তোমার বয়স এখন মধ্য তিরিশ, তবু এখনও কী সুন্দরীই যে আছ।
এসব কথা তুলছ কেন?
আমাদের বিয়ের সময়ে তুমি আরও সুন্দরী ছিলে। আগুনে চেহারা। সেই সময়ে পুরুষ পতঙ্গেরা তোমার দিকে কম আকৃষ্ট হত না। রোজমারি, তুমিও সেটা পছন্দ করতে। শক্তসমর্থ পুরুষদের প্রতি তোমার আকর্ষণ ছিল।
রোজমারি একটু রক্তাভ হয়ে গিয়ে বলল, তুমি কি আমার নৈতিক চরিত্রের পাহারাদার নাকি?
না রোজমারি। তা কেন? তুমি তোমার জীবনকে উপভোগ তো করবেই। কিন্তু গডার্ডকে বেশি প্রশ্রয় দিয়ে তুমি একটু ভুল করেছিলে। আমাদের সদ্য বিয়ে হয়েছে, আমরা মধুচন্দ্রিমায় গেছি, সেই সময়ে একটা জরুরি কাজে ডাক পেয়ে আমি তোমাকে হোটেলে রেখে মাদ্রিদে গিয়েছিলাম। তোমাকে ফোন করে জানিয়েছিলাম ফিরতে আমার দু’দিন দেরি হবে। ঠিক তো?
রোজমারি মুখটা নামিয়ে বলল, হ্যাঁ। কিন্তু তখন আমার খুব একা লেগেছিল।
একা লেগেছিল বলেই কি গডার্ডকে একেবারে শোওয়ার ঘর পর্যন্ত আসতে দিলে?
ওসব পুরনো কথা তুলছ কেন?
কারণ গডার্ডকে খুনের দায়টা আমাকে ঘাড়ে নিতে হয়েছিল রোজমারি।
সেজন্য তোমাকে ধন্যবাদ।
আর সেই ঘটনা থেকেই আমাদের পারস্পরিক অবিশ্বাস ও ছাড়াছাড়িরও সূত্রপাত।
তুমি ব্যাপারটা উপেক্ষা করতে পারতে। যৌবন বয়সে সকলেরই ওরকম ঘটনা ঘটতে পারে। খুব বড় অপরাধ তো নয়।
জো হাসল, দেশটা যদি ভারতবর্ষ হত বা তুমি আমি যদি ভারতীয় হতাম তা হলে কিন্তু ওই ঘটনা মস্ত নৈতিক অপরাধ। সেটা আমি বলছি না। তুমি ভুল করেছিলে, কারণ গডার্ড তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে আমার গোপন তথ্যাবলি হাতানোর চেষ্টা করেছিল।
সেটা আমি জানতাম না।
জানতে না, তাও জানি। কিন্তু ক্ষতি তো হয়েই গিয়েছিল।
তুমি আমাকে খুনের দায় থেকে বাঁচিয়েছিলে বলে আমি যথেষ্ট কৃতজ্ঞ জো।
সেই কৃতজ্ঞতার খানিকটা ঋণ আজ শোধ দাও রোজমারি।
কী চাও জো?
পরশু দিন তোমার কারখানায় আমরা যাব। আমাকে অবাধ প্রবেশ ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করে দাও।
রোজমারি একটু ভাবল, মনোজেরও একটা অনুমতি চাই।
তুমিই সব, আমি জানি। মনোজ তো একটা ভেড়া। শোনো রোজমারি, ব্যবস্থা করতে তোমাকে হবেই। নইলে ঘটনাবলি আমার নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।
তুমি কি এখনও আমার শুভাকাঙ্ক্ষী?
শতকরা একশো ভাগ।
কেন জো?
কে জানে কেন। জীবন বড় রহস্যময়, বড় জটিল। মানুষের মন আরও গূঢ়।
২৪.
ক্লান্ত, অন্যমনস্ক, বিষণ্ণ রোজমারি যখন বাড়িতে ফিরল তখন রাত ন’টা। মনোজ ফেরেনি। রোজমারি গরম জলে অনেকক্ষণ গা ডুবিয়ে বসে রইল তার শ্বেতপাথরের বাথটাবে। তারপর ঘরোয়া পোশাকে লিভিং রুমে বসে ওয়াইন খেল অনেকটা। সে সাধারণত উত্তেজক পানীয় খায় না। আজ তার মাথাটা গরম, মনটাও খারাপ।
রাত দশটায় সে খানিকটা সুপ আর এক টুকরো মাংস খেয়ে নিজের শোয়ার ঘরে এসে আধশোয়া হয়ে কিছু কাগজপত্র দেখতে লাগল। অফিসের কিছু জরুরি চিঠিপত্র।
মনোজ ফিরল এগারোটায়। রোজমারি এত রাত অবধি জেগে থাকে না। আজ নিঃশব্দে উঠে বাইরের ঘরে গিয়ে মনোজের ঢোকার মুখে দাঁড়িয়ে বলল, জামাকাপড় ছেড়ে আমার ঘরে এসো। কথা আছে।
মনোজ অবাক হয়ে বলল, কথা!
হ্যাঁ, মাতাল হওনি তো?
আরে না। সামান্য দু’পেগ
তা হলে ঠিক আছে।
মনোজের বেশি সময় লাগল না। মিনিট পনেরোর মাথায় রোজমারির ঘরে ঢুকে একটা চেয়ার টেনে বসল। সামান্য উদ্বেগের সঙ্গে বলল, খারাপ খবর নাকি?
আমি খুব বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছি গোপীনাথ বসু এখন কলকাতায়।
মনোজ প্রচণ্ড অবাক হয়ে বলল, কলকাতায়। মাই গড! তার তো বেঁচে থাকারই কথা নয়!
কিন্তু সে বেঁচে আছে।
দু’দুটো ইন্টারন্যাশনাল গ্যাং তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল যে। আটকেও রেখেছিল কারা যেন। ভুল খবর নয় তো!
না, খবরটা যে দিয়েছে সে ভুল খবর দেওয়ার লোক নয়।
কলকাতায় কোথায় আছে গোপীনাথ?
তা জানি না। খোঁজ করলেই জানা যাবে। এখানে তার আত্মীয়স্বজন আছে।
সোনালি বা সুব্রতকে ট্যাপ করব নাকি?
করতে পারো। কিন্তু তাড়াতাড়ি করতে হবে।
কেন বলো তো?
গোপীনাথের বিপদ এখনও কাটেনি। তাকে মারবার জন্য একজন খুনিও কলকাতায় এসেছে।
সর্বনাশ! এসব খবর তোমাকে দিল কে?
দিয়েছে একজন। এখন আমি জানতে চাই গোপীনাথকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য আমরা কী করতে পারি।
মনোজ একটু ভাবল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, পুলিশ প্রোটেকশন ছাড়া আর কিছুই বোধহয় পারি না।
পুলিশকে মোবিলাইজ করা সহজ কাজ নয়। অন্য কিছু ভাবো।
ভাববার সময় কি আছে রোজমারি?
বুঝতে পারছি না। তবে অনুমান করছি গোপীনাথকে প্রোটেকশন দিচ্ছে সুধাকর দত্ত।
সে কে? সেই ইন্টারপোল এজেন্ট নাকি?
সে আসলে কে জানি না। তবে সেই লোকটাই।
