আনা কেমন মেয়ে?
ভাল। খুবই ভাল। জন্মসূত্রে রাশিয়ান।
তারপর বলো।
চিরকাল সমান যায় না। আমি নানাভাবে জড়িয়ে পড়ি অপরাধ জগতের সঙ্গে।
কীভাবে?
অত বলবার সময় নেই।
তা হলে বলে যাও।
নানা সূত্রে আমার আয় হত। মোটা আয়। আনা দোকান নিয়ে পড়ে আছে।
আর তুমি?
আমাকে যে কাজটা করতে হয় তা ভাড়াটে সৈন্যের মতো।
খুনখারাপি কি?
ঠিক তা নয়। তবে অবশ্যই আমি যা করে বেড়াই তার অনেক পরিণতি ঘটে মৃত্যুতে। এসব ঠিক বোঝানো যাবে না।
এখন কারা তোমার বস?
অত্যন্ত শক্তিশালী একটি সংগঠন।
তারা কী চায় জো?
তারা জানতে চায় তোমার কারখানায় আসলে সত্যিই কী জিনিস তৈরি হয়।
আজকাল অনেকেই বোধহয় তা জানতে চাইছে। কিন্তু আমি নিজেই তো জানি না। পৃথিবীতে এই অ্যালয় তৈরির আর কিছু কারখানা আছে। আমি তো একা নই।
তাও জানি। সেসব কারখানাতেও ঘটনা ঘটছে।
জো, আমি কি অজান্তে বিজ্ঞানের বিস্ময় কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছি?
জো গম্ভীর হয়ে বলল, সেটা বলতে পারত আদ্রেঁ।
আদ্রেঁ।
হ্যাঁ। যাকে কলকাতায় খুন করা হয়।
আদ্রেঁর কথাও তুমি জানো?
জানি। আদ্রেঁ প্রায় ব্যাপারটা ধরে ফেলেছিল। কিন্তু নিজেই বাঁচল না। কিন্তু সেখানে থেমে গেলেই তো চলবে না।
বুঝেছি।
আমাকে বন্ধুর মতো সাহায্য করো রোজমারি। আমি তোমার শত্রু নই।
কিন্তু এটা তো শত্রুতাই।
হয়তো তাই। তুমি সাহায্য করলে কোনওভাবে আমি তোমাকে রক্ষা করতে পারব। না করলে আমারও কিছুই করার থাকবে না।
অর্থাৎ খুন?
হয়তো তাই।
তুমি আমাকে খুন করবে জো?
আমি করব না। ওসব করার লোক আছে।
রোজমারি মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ, তুমি তো খুনি সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছ।
জো একটা সিগারেট ধরাল। কিছুক্ষণ নিবিড়ভাবে সিগারেট টেনে সে নিজেকে একটু সংযত করে নিল হয়তো। তারপর বলল, আমাদের সঙ্গে পাল্লা দিতে আরও একজন এসে গেছে।
সে কে?
গোপীনাথ বসু নামে একজন ইন্ডিয়ান। বিশেষজ্ঞ।
গোপীনাথ বসু। সাক্কির?
হ্যাঁ। চেনো?
নামটা শুনেছি।
আদ্রেঁ তার অধীনে কাজ করত।
সে কী চায়?
আমরা যা চাই সেও তাই চায়।
রোজমারি ভ্রু কুঁচকে চুপ করে রইল। মনোজ কিছুদিন যাবৎ খুব গোপীনাথ বসুর কথা বলছে। এমন কথাও বলছে গোপীনাথ বসুকে সে মাসে পাঁচ লক্ষ টাকা বেতন দিয়েও রাখবে। কথাটা রোজমারি বলল না।
জো বলল, গোপীনাথের কপাল খারাপ।
কেন?
তাকে মরতেই হচ্ছে।
তোমরা মারবে?
আমরা নিমিত্ত মাত্র। ভাড়াটে খুনি পয়সা নিয়ে লাশ নামিয়ে দেয়, ভ্রুক্ষেপও করে না। কিন্তু খুনটা কি সে করে? না রোজমারি। আপাতদৃষ্টিতে খুনিই খুন করে বটে, কিন্তু পিছনে অন্য ছায়া থাকে।
গোপীনাথ বসু এখন কলকাতায় আছে, তুমি ঠিক জানো?
জানি। কালই এসেছে।
ও। কিন্তু তাকে মারবে কেন, আমাদের কারখানার রহস্য সে তো জানে না।
তার কাছে আদ্রেঁর সব কাগজপত্র আছে। গোপীনাথ মস্তিষ্কবান লোক। সে ঠিক ব্যাপারটা ধরে ফেলবে।
তবে তাকেই কেন তোমরা ভাড়া করছ না?
উপায় নেই। সুধাকর দত্ত তার পিছনে আছে।
তার মতলব কী?
সেও আমাদের মতো অ্যালয়ের রহস্য ভেদ করতে চায়।
আমার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে জো।
গাড়িটা ডানদিকে ঘোরাও রোজমারি।
কোথায় যাচ্ছ জো?
কোথাও না। আমি গলির মধ্যে নেমে যাব।
আর আমি?
তুমি ফিরে যাও। আমার কথা শেষ হয়েছে।
তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে তুমি খুব স্বস্তিতে নেই। ঠিক বলছি জো?
হ্যাঁ। ঠিকই বলছ।
যারা তোমার মতো বিপজ্জনক জীবনযাপন করে তারা স্বস্তিতে থাকে না জো।
তা তো বটেই। কিন্তু আমি যখন সরকারি চাকরি করতাম তখনও বিপজ্জনক ভাবেই বেঁচে ছিলাম রোজমারি। তবে তখন কোনও গ্লানি ছিল না।
এখন আছে?
হ্যাঁ। এখন মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে, একটা পিছল পথ দিয়ে হড়হড় করে একটা অন্ধকার গুহায় নেমে যাচ্ছি। ফেরার উপায় নেই।
কেন নেই জো?
এ হচ্ছে এমন একটা সিস্টেম যেখানে একবার ঢুকে পড়লে আর বেরোনো যায় না। অপরাধ সংগঠনগুলি ভাল টাকা দেয় নোজমারি, কিন্তু তার বদলে তারা চায় শতকরা একশোভাগ আনুগত্য এবং মন্ত্রগুপ্তি। তোমার কাছে আজ যে এসব কথা বলে ফেললাম এর শাস্তি কী জানো?
অনুমান করতে পারছি। কিন্তু বললে কেন জো? না বললেই পারতে।
ওইটেই তো বুড়োবয়সের লক্ষণ। আনাকে তো কিছুই বলি না। বললে ওকে বিপদে ফেলা হবে। বড্ড সরল সোজা স্নেহপ্রবণ মেয়ে। কিন্তু তোমার মতো বুদ্ধিমতী এবং স্বনির্ভর নয়। আজও যদি তুমি আমার বউ থাকতে রোজমারি তা হলে হয়তো জীবনে কয়েকটা ভুল সিদ্ধান্ত আমাকে নিতে হত না। পুরুষের জীবনে বউ একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। আজ তোমাকে যে এসব কথা বললাম তার আর একটা কারণ, তুমি আমার সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলে।
রোজমারি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কিন্তু এতে বিপদ আছে জানলে জানতে চাইতাম না।
বিপদ আর বিপদ। সারা জীবন তো বিপদের মধ্যেই কাটিয়ে দিলাম। জীবন যে কত ক্ষণস্থায়ী তা সংসারী সুখী মানুষরা জানে না। মরতে মরতে বেঁচে গিয়ে, বারবার মৃত্যুর সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে ভয়ডর কেটে গেছে। কিন্তু নিজের জন্য ভয় না পেলেও অন্যদের জন্য ভয় হয়।
সেটা কেমন?
আনার জন্য, বাচ্চাদের জন্য, এই এখন তোমার জন্যও একটা অশান্তি ভোগ করছি। ভাগ্যক্রমে তোমার বিপদ ডেকে এনেছি আমিই। কিন্তু কিছু করার ছিল না। ওদের পরিকল্পনা ছিল, তোমার কারখানা সাবোটাজ করবে। সেটা আমি আটকেছি। এমনকী নিজেই এসেছি, যাতে তোমাকে অন্তত প্রাণে বাঁচানো যায়।
