না তাজু। আজ কিছু নয়।
একটু স্যুপ?
না। বরং একটা ড্রিঙ্ক দাও। পোর্ট।
ঠিক আছে।
রোজমারি পোর্টটা খুব উপভোগ করল। আবার নিল। এবং আবার। তারপর ঘুমিয়ে পড়ল।
.
পরের দিনটা গেল একটু মন্থর গতিতে। সন্ধে ঠিক ছ’টার সময় ফোন এল।
রোজমারি, আমি জো।
হা জো, আর এক ঘণ্টা পর তুমি আমার দেখা পাবে।
কোথায়?
জায়গাটা তুমি ঠিক করো।
আমি?
হ্যাঁ তুমি।
রোজমারি, তুমি আমাকে ক্রমশ বেশি অবাক করে দিচ্ছ।
এতে অবাক হওয়ার কী আছে?
তা হলে এক কাজ করো। তুমি একটা গাড়ি নিয়ে চলে এসো ভিক্টোরিয়ার সামনে। আমি দাঁড়িয়ে থাকব।
তারপর?
কোথাও যাওয়া যাবে।
আমার গাড়ি চালায় ড্রাইভার। সে থাকলে আপত্তি নেই তো?
আছে। তুমি নিজে ড্রাইভ করলে ভাল।
তাই হবে।
তা হলে এক ঘণ্টা পরে?
হ্যাঁ।
এক ঘণ্টার একটু আগেই সময় হিসেব করে উঠে পড়ল রোজমারি। ড্রাইভার ছেড়ে দিয়ে নিজেই গাড়ি চালাতে লাগল। আজ কলকাতায় মিছিল নেই। জ্যামও তেমন নয়।
ভিক্টোরিয়ার বড় ফটকের সামনে জো দাঁড়িয়ে ছিল। গায়ে একটা জিনসের জ্যাকেট, পরনেও জিম্স। কাঁধে একটা ঝোলা।
দরজাটা খুলে দিয়ে রোজমারি বলল, উঠে পড়ো।
জো উঠল।
এবার কোথায় যাব জো?
খিদিরপুর চেনো?
চিনি। কিন্তু সেটা তো ঘিঞ্জি জায়গা।
তা হোক। চলো।
রোজমারি গাড়ি চালাতে চালাতে বলল, তোমার দিক থেকে আমার সত্যিই কোনও ভয় নেই তো?
জো একটু হাসল, বলা যায় না রোজমারি। তোমার চেহারা এখন এত সুন্দর হয়েছে যে, আমার মতো বুড়োরও লোভ হতে পারে।
তেল দিয়ো না। তুমি কি বুড়ো হয়েছ নাকি?
চল্লিশের ওপর তো বুড়োই।
তোমাকে অন্তত সেরকম দেখাচ্ছে না। এখনও গুন্ডাদের মতোই চেহারা আছে তোমার।
বাইরেটাই সব নয়। ভিতরে অনেক ভাঙন।
কীরকম ভাঙন?
বলে লাভ নেই। শুনতে চেয়ো না।
তোমার কথা কি লম্বা?
না না। সেরকম কিছু নয়।
এত ঢাকঢাক গুড়গুড় কেন বলো তো। কী এমন গোপন কথা?
কথার আগে তোমাকে আরও একটু তেল দিয়ে নিই। তুমি একা আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছ বলে খুব খুশি হয়েছি। আমাকে বিশ্বাস করেছ বলে ধন্যবাদ।
কেন তোমাকে কি আজকাল কেউ বিশ্বাস করে না?
না।
কেন করে না?
হয়তো বিশ্বাসযোগ্য নই বলেই।
জো, তুমি কী কাজ করো?
শুনবে?
হ্যাঁ।
আমি সেলসম্যান।
সেটা তো মিথ্যে কথা।
জো দু’পাশে মাথা নেড়ে বলল, না, মিথ্যে নয়। আমি ফিরি করি। তবে কী ফিরি করি তা জানতে চেয়ো না।
কলকাতায় কেন এসেছ?
কাজে।
কী কাজ সেটাই জানতে চাই।
কাজটা তোমার কাছে।
আমার কাছে? আমি কী করব?
তোমার কারখানায় একটা অ্যালয় তৈরি হয়।
হয়।
তোমার কারখানায় তৈরি অ্যালয়ের হঠাৎ চাহিদা খুব বেড়ে গেছে।
হ্যাঁ।
কেন বেড়েছে রোজমারি?
তা জানি না।
আমাকে তোমাদের কারখানা একটু দেখতে দেবে?
কেন? এটাই কাজ। খুব জরুরি।
২৩.
জো-কে বিশ্বাস হয় না রোজমারির। কিন্তু কয়েক বছর আগে মিউনিখে এই জোসেফ তাকে পাগল করে দিয়েছিল। এমন আকর্ষক দুরন্ত পুরুষ সে তার আগে আর দেখেনি। জোসেফ আমেরিকান, পয়সাওয়ালা মানুষ শুধু নয়, চমৎকার ভদ্র ও নম্র ছিল তার স্বভাব। তারপর সামান্য কোর্টশিপের পরই তাদের বিয়ে। এবং সামান্য বিবাহিত জীবনের পরেই ছাড়াছাড়ি। তবু আজও জো ক্লাইন যেন সমান আকর্ষক। জোর ভিতরে একটা চুম্বক আছে হয়তো।
জো তার কারখানা দেখতে চায়। এটা নিশ্চয়ই কোনও গুরুতর গোপন কথা হতে পারে না যার জন্য রোজমারিকে এভাবে টেনে আনতে হবে। রোজমারি মৃদুস্বরে বলল, জো ক্লাইন, আমার কারখানা রোজই বাইরের লোক এসে দেখে যায়। গোপন কিছু নেই। তোমার এই নাটকের তো দরকার ছিল না।
জো সামনের দিকে চেয়ে থেকে বলল, আমি পর্যটকের মতো দেখব না। আমি দেখব বিশেষজ্ঞের মতো।
তার মানে কি স্ক্রুটিনি?
হ্যাঁ রোজমারি। রোজমারি মাথা নেড়ে বলল, সেটা সম্ভব নয়।
কেন নয়?
তুমি নিশ্চয়ই জানো সেরকমভাবে পরীক্ষা করতে গেলে আমাদের কারখানার প্রোডাকশন মার খাবে, পাঁচটা কথা উঠবে। তা ছাড়া হঠাৎ তোমার এরকমই ইচ্ছেই বা হচ্ছে কেন?
জো কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তুমি যতটা নিরাপদ জীবনযাপন করছ বলে ভাবো, তোমার জীবন হয়তো ততটা নিরাপদ নয়।
তার মানে?
রোজমারি, তুমি হয়তো অজান্তে কোনও বিপুল ঐশ্বর্যের ওপর বসে আছ। আর সেই কারণেই তোমার নিরাপত্তা সুতোয় ঝুলছে।
রোজমারি একটা শ্বাস ফেলে বলল, জো, কিছুদিন আগে আমাকে কে যেন ভুল জন্মদিনে একগোছা রক্তগোলাপ পাঠায়। তার ট্যাগে লেখা ছিল, আর আই পি। তোমার কথা তাই আমার বাজে কথা বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু কী সে ঐশ্বর্য জো? বলবে আমাকে?
জো নেতিবাচক মাথা নেড়ে বলল, জানি না। তোমার আশ্চর্য অ্যালয় সম্পর্কেও কিছু জানা নেই আমার। তোমার কারখানা খুঁটিয়ে দেখার জন্য আমার সঙ্গে দু’জন লোক এসেছে। একজন বিশেষজ্ঞ, অন্যজন খুনি।
তার মানে?
জো সামান্য ধরাগলায় বলল, আমি স্বাধীন নই রোজমারি। আমাকে কাজ করতে হচ্ছে ভয় ও হুমকির মধ্যে।
তোমাকে কেউ বাধ্য করছে বলতে চাও?
হ্যাঁ।
কে বাধ্য করছে জো?
একটা করপোরেট বডি।
তারা কারা?
জো আবার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তোমাকে কিছু কথা বলার দরকার। শুনবে?
বলো।
যখন তোমাকে বিয়ে করি তখন আমি ছিলাম গুপ্তচর।
রোজমারি চমকে ওঠে, গুপ্তচর!
আমেরিকান সরকারের ফেডারেল ব্যুরোর।
আশ্চর্য!
কিন্তু পরে আমাকে চাকরি ছাড়তে হয়। ব্রুকলিনে আমি একটা দোকান চালাতে শুরু করি। আনা নামে একটি মেয়েকে বিয়ে করি। আনার দুটো বাচ্চা। নিরাপদ জীবন।
