গোপীনাথের চোখ জড়িয়ে আসছিল ঘুমে।
বিকেল চারটে নাগাদ টেলিফোন বাজল।
একটা পরিচিত গলা বলে উঠল, এই যে! পৌঁছে গেছেন?
গম্ভীর গোপীনাথ বলল, হ্যাঁ।
কোনও ঘটনা ঘটেনি তো?
ঘটেছে।
কী বলুন তো! ওই যে একটা লোককে আপনি প্লেনে লাথি মেরেছিলেন।
অবাক গোপীনাথ বলল, হ্যাঁ, কিন্তু
আরে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ওরা দু’জন আমার লোক।
গোপীনাথের এক গাল মাছি। সে বলল, আপনার লোক। আপনার লোকেরা আমাকে অ্যাটাক করবে কেন?
আক্রমণ নয়। আসলে ওরা আপনাকে অ্যালার্ট রাখতে চাইছিল। যাতে আপনি অসতর্ক না হয়ে পড়েন।
তা হলে মাফিয়ারা কোথায়?
তারাও আছে।
আপনি কি বলতে চান একগাদা টাকা খরচ করে আপনার দু’জন লোককে আপনি আমাকে পাহারা দেওয়ার জন্য বা অ্যালার্ট রাখার জন্য পাঠিয়েছেন।
না না। ওদের অন্য কাজ আছে। দে আর অন স্পেশাল ডিউটি, ঘাবড়াবেন না, ওরা আপনাকে ডিস্টার্ব করবে না।
গোপীনাথ একটা শ্বাস ছেড়ে বলল, আপনি আসলে কে বলবেন?
আমি হলাম দাতা।
সে তো জানি। কিন্তু আপনার আসল পরিচয়টা আমার জানা দরকার।
সবকিছু জানা কি ভাল? এসব পরিস্থিতিতে যত না জানবেন ততই মঙ্গল।
গোপীনাথ গম্ভীর গলায় বলল, অন্তত এটুকু কি বলবেন যে, হোয়েদার ইউ আর অন দি রাইট সাইড অব দি ল?
রাইট সাইডে থাকলেও রং সাইডেও মাঝে মাঝে যেতে হয়। আই অ্যাম অন বোথ দি সাইডস।
ব্যাপারটা পরিষ্কার হল না। প্লেনে এয়ার হোস্টেস বলেছিল, ইন্টারপোল থেকে আমাকে চাইছে। আপনি কি ইন্টারপোল?
তাও বলতে পারেন। কিন্তু ফরগেট মাই আইডেন্টিটি। এবার কাজের কথা বলি।
বলুন।
আজকের দিনটা আপনি বিশ্রাম নিন। কিন্তু কাল থেকে একটু কাজ শুরু করুন।
কী কাজ?
আদ্রেঁর কাজ। যেখানে আদ্রেঁ শেষ করেছিল সেখান থেকে শুরু করা দরকার। ইটস এ ম্যাটার অফ ভাইটাল ইম্পট্যান্স।
জানি। সলিড ফুয়েল।
হ্যাঁ। এ কাজ আপনি ছাড়া আর কেউ পারবে না।
আপনি কি তেল দিচ্ছেন নাকি মশাই?
আরে না। আপনি তেল দেওয়ার পাত্র নন।
তবে বলছেন কেন? আদ্রেঁর লাইন আমার লাইন এক নয়। আমি ছিলাম প্রোজেক্ট কো অর্ডিনেটর। আদ্রেঁ ছিল স্পেশালিস্ট।
সব জানি।
জানেন না। ইউ আর নট এ সায়েন্টিস্ট।
তাও ঠিক। তবু আমি জানি আদ্রেঁকে এ কাজে লাগিয়েছেন আপনিই।
তাতে কিছু যায়-আসে না।
মানছি। তবু আদ্রেঁর কাজ আর কে শেষ করতে পারে বলুন!
গোপীনাথ একটা শ্বাস ফেলে বলল, হয়তো কেউই পারে না। ঠিক আছে, আগে ঠান্ডা মাথায় ওর পেপারওয়ার্কগুলো দেখি। তারপর ভাবা যাবে।
দয়া করে তাই করুন।
মুশকিল হল, একটা আধুনিক ল্যাবরেটরি তে চাই। এদেশে সেটা কোথায় পাব?
ভেবে দেখছি। কিছু একটা উপায় হবেই। একটা কথা, দরজাটা লক করে শোবেন।
কেন?
বিপদ।
২২.
সন্ধেবেলা টেলিফোনটা এল। খুবই অপ্রত্যাশিতভাবে। রোজমারি জরুরি একটা মিটিং সেরে গুরুতর কিছু কাজ নিয়ে বসেছিল নিজের একটেরে অফিস ঘরে। মৈত্রেয়ী তাকে সাহায্য করছিল।
ঠিক এই সময়ে রিং বাজল। ফোন ধরল মৈত্রেয়ী।
ম্যাডাম, কে একজন আপনাকে চাইছে। বলে মৈত্রেয়ী ফোনটা এগিয়ে দিল রোজমারির দিকে।
রোজমারি এত অবাক হল যে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না। পৃথিবীতে জো ক্লাইন নামের লোক হয়তো আরও আছে। কিন্তু এ লোকটার ফ্যাসফ্যাসে চাপা গলা এবং একটু বিদেশি অ্যাকসেন্টের জার্মান উচ্চারণ রোজমারির ভুল হওয়ার নয়।
রোজমারি গলার বিস্ময় আর বিরক্তিটা চেপে রাখতে পারল না, জো, তুমি কী চাও? তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক তো চুকেবুকে গেছে।
সম্পর্কের জন্য ব্যস্ত হয়ো না। আমরা স্বামী-স্ত্রী আর নই ঠিকই, কিন্তু হয়তো পুরনো বন্ধুত্ব তুমি সবটা ভুলে যাওনি।
কে বলল ভুলে যাইনি? আমি তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্বীকার করি না।
ঠিক আছে রোজমারি, সেটাও মেনে নিলাম। কিন্তু আমি যদি তোমার কাছে একটু সাহায্য চাই, পাব কি?
কী ধরনের সাহায্য?
বলছি। কিন্তু তার আগে তোমার গলার কাঠিন্য একটু কমানো দরকার। মনে হচ্ছে তুমি খুব রেগে কথা বলছ।
হয়তো তাই। আমি ব্যস্ত মানুষ। একদম সময় নেই।
জানি। শুধু ব্যস্ত নও, এখন তুমি বেশ গুরুতর মানুষও।
বাজে কথা রাখো জো, যা বলার চটপট বলে ফেলল।
অত তাড়াহুড়োয় বলার মলোকথায়। একটুসময় লাগবে। তাছাড়া কথাটা টেলিফোনেও বলা যাবে না। আমি তোমার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই। আমি কলকাতাতেই আছি।
অসম্ভব। তোমার সঙ্গে দেখা করার কোনও ইচ্ছেই আমার নেই।
শোনো রোজমারি, দরকারটা জরুরি।
যত জরুরিই হোক, আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
রোজমারি, ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দটা বড় কথা নয়। আমি তোমার অপছন্দের মানুষ হতে পারি, কিন্তু আমি তোমার ক্ষতি করার জন্য আসিনি।
আমাকে ভুলে যাচ্ছ না কেন জো? আমি তো ভুলতে চাই।
ভাবাবেগের দ্বারা চালিত হওয়ার বয়স আমি পেরিয়ে এসেছি রোজমারি। দুনিয়াটা কঠিন জায়গা। আমাকেও কষ্ট করেই বেঁচে থাকতে হয়। তোমারও বয়স বসে নেই। আমরা নিশ্চয়ই আর ছেলেমানুষ নই।
তোমার দরকারটা কী ধরনের?
সেটা দেখা হলে বলা যাবে।
দেখা করতেই হবে তা হলে?
হ্যাঁ, এবং গোপনে।
যদি তা সম্ভব না হয়?
রোজমারি, তুমি আমাকে স্বেচ্ছায় সময় না দিলে আমি যেমন করেই হোক তোমার সঙ্গে দেখা করবই। এ ব্যাপারে কোনও বাধাই মানব না। কিন্তু সেই সাক্ষাৎকারটা তোমার আরও অপছন্দের হতে পারে।
এটা কি হুমকি?
