বিশাল ফ্ল্যাটবাড়িটার সামনে নেমে খুব একটা নিরাপদ বোধ করল না গোপীনাথ। কারণ, দাতা তাকে বলেছে, তার ফ্ল্যাটে তারা একটা কম্পিউটার বসিয়ে দিয়েছে। এটা যদি সম্ভব, তা হলে ফ্ল্যাটের মধ্যে গোপীনাথের নিরাপত্তা বলতে আর কী থাকল?
লিফটে ছ’তলায় উঠে সে নিজের ফ্ল্যাটের দরজা খুলল। বিশাল তিন হাজার স্কোয়ার ফুটের ফ্ল্যাট। দক্ষিণ আর পুবে চমৎকার ব্যালকনি। বিশাল হলঘর এবং তিনটে শোয়ার ঘর। সবগুলিই বড়। এ ছাড়া আলাদা সারভেন্টস রুম আছে।
ফ্ল্যাটে গোপীনাথ বড় একটা থাকে না। কচিৎ কখনও কলকাতায় এলে হোটেলেই থাকে। এমনকী সুব্ৰতর বাড়িতেও থাকে না। তবে বিবাহিত জীবনে বার দুই শ্বশুরবাড়িতে থেকেছিল। এতদিনকার বন্ধ ফ্ল্যাটে আশ্চর্যের বিষয়–ধুলোময়লা তেমন জমেনি। বেশ চকচক ঝকঝক করছে সবকিছু। যেন কেউ সদ্য ঝটপাট দিয়ে ডাস্টিং করে গেছে।
হলঘরটা সোফাসেটে সাজিয়েছিল তার প্রাক্তন স্ত্রী। ফ্ল্যাটের সব আসবাবই তার পছন্দ করে কেনা বা বানিয়ে নেওয়া।
গোপীনাথ কিছুক্ষণ গা এলিয়ে একটা নরম সোফায় বসে রইল। জিরিয়ে নিয়ে সে হলঘরের এক কোণে রাখা টেলিফোনটা গিয়ে তুলল। হ্যাঁ, ডায়ালটোন আছে। টেলিফোনের রেন্টাল চার্জ থেকে শুরু করে ফ্ল্যাটের মেনটেনেন্স বা ট্যাক্স সবই সুব্রতই দেয়। তাকে টাকা পাঠিয়ে দেয় গোপীনাথ।
সুব্ৰতর বাড়ির নম্বরে ডায়াল করে তাকে পাওয়া গেল না। অফিসে পাওয়া গেল।
তার গলা পেয়ে সুব্রত গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, গোপীদা! আপনি বেঁচে আছেন। কোথা থেকে কথা বলছেন?
গোপীনাথ মৃদু স্বরে বলল, ওরে চেঁচাসনি, বেঁচে আছি বটে, কিন্তু কত দিন বেঁচে থাকব বলা যায় না। তবে এখনও বেঁচে আছি বটে। শোন, আমি এখন কলকাতায়।
কলকাতায়! মাই গড! সত্যি কলকাতায়?
হ্যাঁ রে, সত্যিই। নিজের ফ্ল্যাটে।
বলেন কী? রোম থেকে বেরোলেন কী করে? শুনলাম সেখানে নাকি গুন্ডারা আপনাকে ঘিরে রেখেছিল।
এত খবর তোকে কে দিল?
আমাদের বসের এক ইতালিয়ান বন্ধু আছে সাক্কিতে। সে-ই নাকি বলেছে।
তোর বস আমাকে চেনে?
খুব চেনে, আপনাকে তার ভীষণ দরকার। খুব চেষ্টা করছিল যোগাযোগ করতে।
খবরদার, আমার খবর কাউকে দিবি না। কাকপক্ষীও যেন জানতে না পারে।
কেন গোপীদা, এখন তো আপনি কলকাতায়। আর ভয় কীসের?
গোপীনাথ একটু হেসে বলল, তুই নিতান্ত ছেলেমানুষ। আন্তর্জাতিক গুন্ডাদের চিনিস না তো!
তার মানে কি এখানেও আপনার কিছু হতে পারে।
খুব পারে। ইন ফ্যাক্ট আমার পিছু পিছু দুটি গুন্ডা রোম থেকে কলকাতায় এসেছে। তাদের গতিবিধি এখনও বুঝতে পারছি না।
তা হলে আপনি আমার বাড়িতে চলে আসুন। ফ্যামিলির মধ্যে থাকলে কিছু করতে পারবে না।
না, তা হয় না। আমার বিপদের চেয়েও তখন তোদের ফ্যামিলির বিপদ বেশি।
কিছু হবে না গোপীদা।
কথা বাড়াস না সুব্রত। শোন, আমার এখন খিদে পেয়েছে। ধারেকাছে কোনও এমন দোকান আছে কি, যেখান থেকে বাড়িতে খাবার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা আছে?
ওসব নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। আমি এখনই ব্যবস্থা করছি। আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আপনার ফ্ল্যাটে খাবার পৌঁছে যাবে। কী খাবেন বলুন।
ভাত খাব, ডাল খাব। আর যা হয়।
আর কিছু?
না, আপাতত আর কিছু নয়। অফিসের পর চলে আয়, একটু আড্ডা মারা যাবে।
বউদির সঙ্গে কথা বলবেন? লাইন ট্রান্সফার করতে পারি।
উঃ, তোকে নিয়ে আর পারি না। ওরে গবেট, আমি যে কলকাতায় আছি এ খবরটা তোর বউদিকেও দেওয়া বারণ।
আচ্ছা, ঠিক আছে।
শুধুই তুই জানলি, আর যেন কেউ না জানে। এমনকী তোর বাড়ির লোকও নয়। বুঝেছিস?
বুঝেছি। নিশ্চিন্ত থাকুন।
ঘরগুলো ঘুরে দেখতে গিয়ে স্টাডিতে কম্পিউটারটা আবিষ্কার করল গোপীনাথ। একটা স্টিলের টেবিলের ওপর বসানো। দামি জিনিস। বেশ কয়েক বাক্স ফ্লপি রয়েছে।
অ্যাটাচি কেসটা শোয়ার ঘরের স্টিলের আলমারিতে রেখে চাবি দিল সে। তারপর বাথরুমে গিয়ে গিজার অন করল। ভাল করে স্নান করা দরকার।
সারা ফ্ল্যাটটা ঘুরে ঘুরে লক্ষ করল সে। এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই যে, কেউ এটা খুব সম্প্রতি ঝাড়পোঁছ করেছে। শোয়ার ঘরের প্রত্যেকটা খাটের পাশে ছোট্ট কাশ্মীরি টুলের ওপর ফ্লাওয়ার ভাসে টাটকা ফুল। এরকমটা তো স্বাভাবিকভাবে হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এসব করল কে? ভিকিজ মব-এর লোকেরা?
বাথটাবে জল ভরতি করে বেশ কিছুক্ষণ ঈষদুষ্ণ জলে বসে রইল গোপীনাথ। কলকাতায় এখনও বেশ শীত আছে। আবহাওয়া চমৎকার।
স্নান করে উঠে গোপীনাথ গিয়ে ওয়ার্ডরোব খুলে দেখল। অনেক দিন আগে ব্যবহৃত জামাকাপড় এখনও রয়েছে কিছু। গোপীনাথ মোটা হয়নি। সুতরাং মাপেও হয়ে গেল। পাজামার ওপর একটা খদ্দরের পাঞ্জাবি চাপিয়ে একটা শাল জড়িয়ে নিল গায়ে।
সুব্রতকে ফোন করার ঠিক পঁয়তাল্লিশ মিনিট বাদে ডোরবেল বাজল। গোপীনাথ দরজা খুলে দেখল দু’জন লোক ঢাকা ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে।
গোপীনাথের সত্যিই খিদে পেয়েছে। লোক দুটো সযত্নে তার ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজিয়ে দিল। অন্তত দশ রকমের আইটেম। দই-মিষ্টি অবধি।
খাওয়ার পর বাসনপত্র গুছিয়ে নিয়ে রাতে ক’টার সময় কী কী খাবার দিয়ে যাবে তা জিজ্ঞেস করে নোট করে নিয়ে গেল। চমৎকার ব্যবস্থা। দাম নিল না। বলল, ওসব পরে হবে।
গোপীনাথ দরজা লক করে একটু শুয়ে রইল। শরীর ক্লান্ত, মন অবসন্ন। রোমে যেরকম বিপদ আর অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল এখন পরিস্থিতি তেমন নয়। কিন্তু উদ্বেগ রয়েই গেল।
