গোপীনাথের বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। একটা দীর্ঘকায় লোক দরজা দিয়ে ঢুকেই সামনে একজিকিউটিভ ক্লাসের দিকে চলে গেল না! লোকটা তো কালোই মনে হল!
আরও কিছুক্ষণ দরজাটা খোলা রইল। একেবারে শেষ সময়ে গোপীনাথকে শিহরিত করে ঢুকল লাথি-খাওয়া লোকটা। গতি ধীর। একবার প্লেনের পিছন দিকে তাকাল। তারপর সামনের একজিকিউটিভ ক্লাসের দিকে এগিয়ে গেল।
গোপীনাথ একটু ঘাবড়ে গেল। ফের নিজেকে সংযত করে নিল। একটা লাথি তত দিতে পেরেছে। ভয় কী?
২১-২৫. কলকাতা অবধি সময় লাগে
কলকাতা অবধি সময় লাগে পৌনে দু’ঘণ্টার মতো। এই পৌনে দু’ঘণ্টায় কী কী ঘটতে পারে তার সম্ভাবনা নিয়ে গম্ভীরভাবে চিন্তা করার চেষ্টা করছিল গোপীনাথ। কিন্তু মানসিক চঞ্চলতা তাকে নিবিষ্ট হতে দিচ্ছে কই?
প্লেন আকাশে উঠল বেশ কিছুক্ষণ পর। গোপীনাথ তার অ্যাটাচি আঁকড়ে বসে রইল সিটে। কিন্তু শক্ত হয়ে। প্রতিটি মিনিট কাটছে যেন ঘণ্টার লয়ে।
শীতের মেঘমুক্ত আকাশে প্লেনের গতি অতি মসৃণ। কোনও ঝাঁকুনি নেই, হেলদোল নেই। ছোট একটা পরদায় দেখানো হচ্ছে একটা ডকুমেন্টারি। গোপীনাথ সেদিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকেও বুঝতে পারল না, ডকুমেন্টারিটা কী বিষয়ে। বাইরে উজ্জ্বল রোদ, নীল আকাশ, নীচে সবুজের বিস্তার। কিন্তু গোপীনাথ কিছুই উপভোগ করছে না। তার শ্যেনদৃষ্টি সামনের দিকে। একজিকিউটিভ এনক্লোজারে দু’জন সম্ভাব্য আততায়ী ওত পেতে আছে। তার একদা প্রভু কর্মকর্তারা ওদের নিয়োগ করেছে তাকে সস্নেহে দুনিয়া থেকে মুছে দিতে।
কিন্তু কী লাভ তাতে সাক্কির? কয়েক কোটি টাকার অত বড় প্রোজেক্টের সর্বময় কর্তা গোপীনাথকে সরিয়ে দিলে যে প্রোজেক্টটাই অনেক পিছিয়ে যাবে। গোপীনাথ এও জানে, তার বিকল্প বিশেষজ্ঞ চট করে খুঁজে পাওয়া খুব শক্ত। সাক্কি তা হলে তার বিরুদ্ধতা করছে কেন? সত্য বটে, কোম্পানিগুলোর কোনও নীতিবোধ থাকে না। সামান্য স্বার্থে ঘা লাগলেই তারা যে-কোনও মানুষকে সরিয়ে দেয়। কিন্তু গোপীনাথ তো তাদের স্বার্থই দেখছিল। আদ্রেঁর কাগজপত্র সরিয়ে ফেলে সে কোম্পানির উপকারই করতে চেয়েছে। কিন্তু কথাটা বোর্ডকর্তাদের বোঝাতে পারেনি সে। তারা গম্ভীর মুখে শুনেছে, কিন্তু বিশ্বাস করেনি। তাই এতদিন বিশ্বস্ততার সঙ্গে চাকরি করার পর তার বরাতে জুটল এই শত্রুতা। কিন্তু গোপীনাথ কোম্পানির এই বিশ্বাসঘাতকতা হজম করতে পারছে না। রাগে তার ভিতরটা জ্বলছে।
রাগের একটা উপকারী দিকও আছে। রাগটা গনগনে হয়ে তার ভয়ডর কিছু কমিয়ে দিচ্ছে। রাগ তার ভিতরে কিছু শক্তিরও সঞ্চার ঘটাচ্ছে কি? হয়তো তাই।
আবার নতুন করে ব্রেকফাস্ট দেওয়া হচ্ছে এই বিমানেও। সবিনয়ে ট্রে-টা প্রত্যাখ্যান করল গোপীনাথ। শুধু কফি খেল এক কাপ। বারবার ঘড়ি দেখছিল সে। সময় কাটছে না কিছুতেই। দিল্লি থেকে খবরের কাগজ বোঝাই হয় প্লেনে। যাত্রীরা খবরের কাগজ খুলে মন দিয়ে পড়ছে। গোপীনাথের সে ইচ্ছেটা অবধি হল না। দাতা বলেছে, এই দু’জন অনুসরণকারীর চোখে ধুলো দিতে হবে। সেটা কীভাবে সম্ভব তাই ভাবছিল সে। এসব কাজে তার কোনও অভিজ্ঞতা নেই। ভরসা এই যে, মাফিয়া গুন্ডারা কলকাতায় নতুন। সুতরাং গোপীনাথ হয়তো পারবে।
ক্রমে ক্রমে কলকাতা কাছে আসছে। বড্ড ধীর গতিতে অবশ্য। কিন্তু অমোঘভাবেই আসছে।
গৌরাঙ্গ গাঙ্গুলি সামনের সিট থেকে উঁকি দিয়ে বলল, কী মশাই, সব ঠিক আছে তো! গোপীনাথ একটু হেসে বলল, ঠিক আছে।
গৌরাঙ্গ একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, এটা রাখুন। দরকার হলে যোগাযোগ করবেন কলকাতায়।
গোপীনাথ কার্ডটা পকেটে রাখল।
ভাল কথা, এয়ারপোর্টে আমার গাড়ি থাকবে, যদি চান তো আপনাকে গ্র্যান্ড হোটেলে নামিয়ে দিয়ে যেতে পারি। আমি গলফ ক্লাব রোডে থাকি। ওদিক দিয়েই যাব।
গোপীনাথ অম্লানবদনে মিথ্যে কথা বলল, আমাকে রিসিভ করতে আমার এক বন্ধু গাড়ি নিয়ে আসবে। তবু আপনাকে ধন্যবাদ।
ঠিক আছে। তবে যোগাযোগ করলে খুশি হব। একদিন ডিনার বা লাঞ্চে আমার বাড়িতে এলে আরও খুশি হব।
বিমান নামবার ঘোষণা হল। বিশাল বিমানটি হেলতে দুলতে শুরু করে ক্রমে ক্রমে উচ্চতা হারাতে লাগল। গোপীনাথ দেখল, এখনও কেউ তার দিকে আসছে না। দুই মাফিয়া এখনও চোখের আড়ালে।
প্লেন নেমে পড়ল। গোপীনাথ একটা স্বস্তির শ্বাস ছাড়ল। এটা কলকাতা, রোম নয়। গোপীনাথ আর তেমন অসহায় বোধ করছে না।
এবার সে আর ভুল করল না। দাতা তাকে বলেছিল সবার শেষে নামতে। আর সেটা করতে গিয়েই দিল্লিতে বিপদে পড়েছিল সে। এবার তা করবে না। সিঁড়ি লাগবার পর সে সকলের সঙ্গেই দরজার কাছে গিয়ে হাজির হয়ে গেল।
আশ্চর্যের বিষয়, মাফিয়া দু’জনের দেখা নেই।
গোপীনাথ নামল। প্রথম গাঙ্গুলি দম্পতি এবং তার পরেই সে ইমিগ্রেশন পার হল। গাঙ্গুলিরা লাগেজের জন্য অপেক্ষা করবে। সুতরাং সে বেশ তাড়াহুড়ো করে বিদায় নিয়ে সোজা প্রি-পেইড ট্যাক্সির কাউন্টারে চলে গেল। কেউ তাকে অনুসরণ করছে না। লক্ষ অবধি করছে না।
ট্যাক্সিতে বসে সে যখন বালিগঞ্জের দিকে ছুটছে তখনও ভাল করে লক্ষ করল, কেউ তার পিছু নেয়নি। হতে পারে, মাফিয়ারা তার কলকাতার ঠিকানা জানে। তাই অকারণে কোনও অ্যাডভেঞ্চার করার ঝুঁকি নিচ্ছে না।
