বেশ ভাল ব্রেকফাস্ট খাওয়ায় তো এরা।
হ্যাঁ। ইচ্ছে করলে কোনও আইটেম আবার চাইতে পারেন।
গাঙ্গুলি তার বউয়ের দিকে চেয়ে বলল, তুমি কিছু নেবে?
না বাবা, অনেক খেয়েছি।
গাঙ্গুলি বলল, কলকাতায় যাবেন নাকি?
হ্যাঁ।
কোথায় থাকেন?
গোপীনাথ কথাটা চেপে গিয়ে বলল, দেশের সঙ্গে বহুকাল সম্পর্ক নেই। হোটেলেই থাকতে হবে।
গ্র্যান্ড নাকি?
দেখা যাক।
আপনারা যারা বিদেশে থাকেন তারা বেশ আছেন। অঢেল পয়সা। আমরা গ্র্যান্ডে এক রাত্রি কাটানোর কথাও ভাবতে পারি না।
হোটেলে থাকা কি ভাল?
টুকটুক এসব কথাবার্তায় সময় কেটে যাচ্ছিল। অবশেষে সিটবেল্ট বাঁধা ও সিগারেট নিবিয়ে দেওয়ার নির্দেশ ঘোষিত হল। তারপর অবতরণের সূচনা।
গোপীনাথ মনে মনে সংযত ও শক্ত হওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। সামনেই কি বিপদ?
প্লেন টার্মিনালের গায়ে যখন এসে ঠেকল তখন যাত্রীদের মধ্যে নামবার বেশ হুড়োহুড়ি। গাঙ্গুলিরাও ব্যস্তসমস্ত।
গৌরাঙ্গ বলল, নামবেন না? কলকাতার ফ্লাইট এখনই ছাড়বে। আজ ডিরেক্ট ফ্লাইট।
হা নামব। আপনারা এগোন, আমি যাচ্ছি।
গৌরাঙ্গ সস্ত্রীক আর অপেক্ষা করল না। ঘরমুখো বাঙালিকে ঠেকায় কার সাধ্য।
গোপীনাথ অপেক্ষা করল। প্লেনের পিছন দিকটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিল ক্রমশ। যখন সব লোক দরজার কাছ বরাবর চলে গেছে তখন হঠাৎ গোপীনাথের মনে হল কাজটা ঠিক হচ্ছে না। যদি কেউ বাথরুম টয়লেটে লুকিয়ে থেকে থাকে তবে এই তার সুযোগ। সে চট করে উঠে পড়ল এবং দ্রুত পায়ে এগোতে লাগল সামনের দিকে।
সিদ্ধান্তটা যে সে ঠিকই নিয়েছে সেটা বুঝতে পারল সঙ্গে সঙ্গেই। পিছনে একটা ক্লিক শব্দ শুনে চট করে পিছনে তাকিয়ে সে একটা লোককে দেখতে পেল। লোকটা মাঝারি উচ্চতার এক সাহেব। চওড়া কাঁধ এবং বিশাল স্বাস্থ্য। লোকটা তার দিকে চিতাবাঘের মতো ছুটে আসছিল।
গোপীনাথ জীবনে কখনও শারীরিক সংঘর্ষে যায়নি। আসলে যেতে হয়নি তাকে। কিন্তু এই পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে আত্মরক্ষার্থে তাকে ঘুরে দাঁড়াতে হল। ছুটে দরজা অবধি যাওয়ার সময় ছিল না। কেউ পিছু ফিরে দেখতও না কী হচ্ছে।
লোকটার হাতে একটা ছোরার মতো জিনিস। মারবে নাকি? লোকটা তার ওপর এসে পড়ার আগেই গোপীনাথ গিয়ে পড়ল লোকটার ওপর, হিংস্র আক্রোশ এবং সম্পূর্ণ কাণ্ডজ্ঞানরহিত হয়ে। কী করে লোককে মারতে হয় তা জানে না গোপীনাথ। তার সম্বল শুধু রাগ।
আর সেই রাগটাই পেশাদার মাফিয়া গুন্ডার বিরুদ্ধে আশ্চর্য সফল হয়ে গেল। গোপীনাথ লম্বা মানুষ, পায়ে একজোড়া ভারী ইতালিয়ান জুতো। সে তার লম্বা পায়ে লোকটাকে সরাসরি একটা জম্পেশ লাথি কষাল অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায়। লোকটা নিশ্চয়ই মারপিটের কৌশল জানে। বাগে পেলে গোপীনাথকে হালুয়া বানিয়ে দিতে পারে। কিন্তু গোপীনাথ যে উলটে আক্রমণ করবে এটা প্রত্যাশা করেনি বলেই লাথিটা খেয়ে গেল লোকটা এবং উলটে চিতপাত হয়ে পড়ে গেল দু’সারি আসনের মাঝখানে অপরিসর জায়গাটায়। পড়ার সময় সিটের হাতলে মাথাটা ঠুকেও গেল খুব জোরে।
গোপীনাথ দ্রুত দরজায় কাছে পৌঁছে গেল। শেষ চার-পাঁচজন যাত্রী বেরিয়ে যাচ্ছে। গোপীনাথ তাদের সঙ্গেই বেরিয়ে এল।
লাউঞ্জ পেরিয়ে কলকাতার প্লেন ধরার জন্য আর একটা লাউঞ্জে পৌঁছে গেল সে। কলকাতায় ফ্লাইটের ঘোষণা চলছে লাউড স্পিকারে।
গৌরাঙ্গ গাঙ্গুলি আর তার বউ মুষ্টিমেয় কলকাতা-যাত্রীদের মধ্যে বসা। গৌরাঙ্গ তাকে দেখে বলে উঠল, দেরি হল যে!
একটু কাজ ছিল।
আসুন মশাই, বসুন এখানে। মেলা জায়গা। কলকাতার যাত্রী তো দেখছি নেই-ই।
সাবালক হওয়ার পর জীবনে এই প্রথম আজ সে একটা শরীরী সংঘর্ষে গেল। আর লাথি খেয়ে একটা লোক এখনও ওই প্লেনের মেঝেয় পড়ে আছে। ঘটনাটা এখনও বিস্মিত ও উত্তেজিত রেখেছে তাকে। সে বসে রুমালে মুখ মুছল। তারপর উঠে গিয়ে কল থেকে জল খেয়ে এল। ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগল তার।
গৌরাঙ্গ বলল, আপনাকে একটু রেস্টলেস লাগছে। শরীর ঠিক আছে তো?
আছে।
গৌরাঙ্গের বউ ওপাশ থেকে বলল, ওঁর কী সুন্দর ফিগার দেখছ না? শরীর খারাপ হবে কেন?
ফিগারের প্রশংসায় খুশি হওয়ার মতো অবস্থা এখন তার নয়। তবু ভদ্রতার হাসি হাসল সে।
গৌরাঙ্গ বলল, তা অবশ্য ঠিক। আপনার স্বাস্থ্যটা হিংসে করার মতোই। আপনি কী করেন বলুন তো?
চাকরি।
কোথায়?
রোমে।
বেশ আছেন। প্রাচীন শহর, কত কী দেখার আছে। আমাদের তো রোমটা দেখালই না। যাওয়ার সময় দু’দিন মাত্র ছিলাম। দু’দিনে আর কী দেখা যায় বলুন। ওই কলোসিয়ামটিয়াম যা একটু দেখাল। ফেরার সময় লন্ডন থেকে ছেড়ে দিল টিকিট দিয়ে।
আপনারা কি রোম থেকে ওঠেননি?
না মশাই, না। রোমে প্লেন আসতেই আমরা হ্যান্ডব্যাগট্যাগ নিয়ে টার্মিনালে গিয়ে উকিঝুঁকি মারলাম একটু।
তাই বলুন।
কলকাতার বিমানে ওঠার নির্দেশ ঘোষিত হল। গোপীনাথ চারদিকে নজর রাখছিল। না, লাথি খাওয়া লোকটাকে দেখা যাচ্ছে না।
বিশাল এয়ারবাসের অভ্যন্তরে যাত্রীসংখ্যা ত্রিশ-চল্লিশ জন হবে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসার পরও অভ্যন্তরটা হাঁ হাঁ করছিল।
গৌরাঙ্গদের পাশাপাশি সিট পড়েছিল তার। কিন্তু নির্দিষ্টসিটে বসার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। সুতরাং সে বসল গৌরাঙ্গদের পিছনের সারিতে জানালার ধারে।
প্লেন ছাড়তে কি একটু বেশি সময় নিচ্ছে? এখনও দরজা খোলা। কেউ কি উঠবে আরও?
