বউ একটু গুম হয়ে আছে। শুধু বলল, ও।
এখনই বউটি ফিসফিস করে গৌরাঙ্গর কাছে এবং গৌরাঙ্গ ফিসফিস করে বউয়ের কাছে তার বিষয়ে বলবে। তখন গোপীনাথের ভাবমূর্তি যে এদের কাছে কী হবে তা ভাবতেই গোপীনাথের বড্ড লজ্জা হচ্ছে। ফিরে আসার পর গৌরাঙ্গ বা তার বউ তার সঙ্গে কথা বলছে না, এটাও অস্বস্তিকর। যদিও প্লেন থেকে নেমে যাওয়ার পর আর কারও সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে না, তবু একটা বিচ্ছিরি ঘটনার তেতো স্বাদ থেকে যাবে। গোপীনাথ তাই এদের সঙ্গে সম্পর্কটা সহজ করার উপায় ভাবতে লাগল।
হঠাৎ একজন তরুণী এয়ার হোস্টেস তাদের সামনে এসে মিসেস গাঙ্গুলিকে ইংরিজিতে জিজ্ঞেস করল, মিস্টার গোপীনাথ বসুর এই সিটে বসার কথা। তিনি কোথায়?
গাঙ্গুলির বউ থতমত খেয়ে গোপীনাথকে দেখিয়ে দিয়ে বাংলায় বলল, উনি এই সিটে ছিলেন।
এয়ার হোস্টেস নিচু হয়ে প্রায় তার কানে কানে বলল, ইউ আর ওয়ান্টেড অন দি ফোন স্যার। ইটস ইন্টারপোল!
ইন্টারপোল! গোপীনাথ তটস্থ হল। ইন্টারপোল তাকে চাইছে কেন?
এবার সে আর অ্যাটাচি কেসটা সঙ্গে নিল না, গৌরাঙ্গকে দেখতেও বলে গেল না। সেটা পড়ে থাকল তার সিটে। যাক, ওইটুকুই তার গৌরাঙ্গ আর তার বউয়ের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা।
টেলিফোনে নির্ভুল দাতার কণ্ঠস্বর, কেমন আছেন?
ভালই।
কোনও ঘটনা ঘটেনি তো!
না। আপনি কোথা থেকে ফোন করছেন?
প্যারিস। শুনুন, আপনার পিছনে দুটি ছায়া আছে।
তার মানে?
ইউ আর বিয়িং শ্যাডোড বাই টু অপারেটর্স।
তারা কারা?
সাক্কির ভাড়া করা মাফিয়ারা।
গোপীনাথ একটু চুপ করে থেকে বলল, কী করব বলুন তো!
সতর্ক থাকবেন।
সতর্কই আছি।
আমার অনুমান ওরা প্লেনের ভিতরে কিছু করবে না।
কোথায় করবে এবং কী করবে সেটাই জানা দরকার।
কিছুই বলা যায় না। আপনি যে তিমিরে আমিও সেই তিমিরে। আপনি ভয় পাননি তো?
যথেষ্ট নার্ভাস বোধ করছি। কারণ আমি তো বিপজ্জনক জীবন যাপন করি না। এসব অভিজ্ঞতা নতুন।
তা হলে অভিজ্ঞতাটা হোক। জীবনের এসব দিক সম্পর্কেও জ্ঞান থাকা দরকার।
তাই দেখছি।
এবার ভাল করে শুনুন। আমার কথা পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছেন তো! পাচ্ছি। আর ঘণ্টা দেড়েক বাদে আপনার প্লেন দিল্লিতে নামবে। নামবার সময় আপনি মোটেই তাড়াহুড়ো করবেন না। আপনার আগে অন্য সবাইকে নামতে দেবেন। প্রত্যেকটা লোককে ওয়াচ করার চেষ্টা করবেন।
ঠিক আছে। অ্যাটাচি কেসটা কখনও হাতছাড়া করবেন না। গোপীনাথ একটু শঙ্কিত গলায় বলল, কিন্তু এখন তো ওটা আমি সিটে রেখে এসেছি। সর্বনাশ। তা হলে! ওতে যা আছে সেগুলো তো কপি মাত্র। আপনার সঙ্গে তো আরও কপি আছে।
আছে আবার নেইও। ওতে এমন কিছু ইনফর্মেশন আছে যা হাতছাড়া হলে আমাদের হয়তো তেমন ক্ষতি হবে না, কিন্তু শত্রুপক্ষ বিরাট দাও মেরে দেবে।
আমি সিটে ফিরে যাচ্ছি। শুনুন। যে দু’জন অপারেটর আপনাকে ফলো করছে তাদের চোখে ধুলো দিতে হবে যেমন করেই হোক। কথাটা খেয়াল রাখবেন।
চেষ্টা করব। ফোন রেখে গোপীনাথ দ্রুত পায়ে নিজের জায়গায় ফিরে এল। অ্যাটাচি কেসটা রয়েছে জায়গামতোই। আছে গৌরাঙ্গ এবং তার বউও। তবে গৌরাঙ্গ তার দিকে কেমন যেন বিস্ফারিত চোখে চেয়ে আছে।
সে বসার পর কিছুক্ষণ ফাঁক দিয়ে গৌরাঙ্গ গাঙ্গুলি হঠাৎ মোলায়েম গলায় জিজ্ঞেস করল, কিছু যদি মনে না করেন একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
নিশ্চয়ই। করুন না।
আপনার অ্যাটাচি কেসটায় কী আছে জানি না, কিন্তু আপনি কি কোনও বিপজ্জনক বা গোপনীয় জিনিস নিয়ে যাচ্ছেন? আপনি উঠে যাওয়ার পর একটা কালোমতো লোক ওদিক থেকে এসে অ্যাটাচিটা হাতে নিয়ে বলল, মিস্টার বোস এটা চাইছেন, নিয়ে যাচ্ছি।
বলেন কী?
ঠিকই বলছি। লোকটা খুব লম্বা, অন্তত ছ’ফুট দু’ইঞ্চি হবে। ব্ল্যাক।
আপনি কী করলেন?
আমি বললাম, না, অ্যাটাচিটা আপনি আমার হেফাজতে রেখে গেছেন। সুতরাং দরকার হলে আমি নিয়ে যাব।
আপনাকে ধন্যবাদ। লোকটা কী করল?
ইংরিজিতে বলল, আপনার নাকি খুবই দরকার অ্যাটাচিটা না হলেই নয়। একটু টানাহ্যাঁচড়াও করছিল।
তারপর?
গায়ের জোরে পারতাম না। কিন্তু হঠাৎ দু’জন এয়ার হোস্টেস এসে পড়ল। তারা লোকটাকে বলল নিজের জায়গায় চলে যেতে। লোকটা বিড়বিড় করে বোধহয় গালাগাল দিতে দিতেই চলে গেল সামনের দিকে।
লোকটা কোথায় বসেছে বলুন তো!
জানি না। সামনের কোথাও হবে।
আপনাকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেব! আপনার সঙ্গে আমি একটু অভদ্র ব্যবহারও করেছি। বিশেষ করে আপনার স্ত্রীর সঙ্গে। আপনারা দুজনেই আমাকে মাপ করে দেবেন। আমি একটা বিশেষ টেনশনের মধ্যে রয়েছি।
আরে তাতে কী হয়েছে? আমরাও বলাবলি করছিলাম যে আপনার একটা টেনশন চলছে।
সম্পর্কটা সহজ হওয়ায় একটা শ্বাস ফেলল গোপীনাথ। তারপর অ্যাটাচিটা খুলল।
গাঙ্গুলি পাশ থেকে আড়চোখে অ্যাটাচির অভ্যন্তরটা দেখে নিয়ে বলল, ইম্পর্ট্যান্ট পেপার্স।
হ্যাঁ।
কাগজপত্র ঠিক আছে দেখে ফাইলটা বন্ধ করে অ্যাটাচিটা ফের পাশে রাখল সে। ব্রেকফাস্ট আসছে। আর ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যেই দিল্লি।
ব্রেকফাস্টে মোটেই মন বসাতে পারছিল না সে। পাশের গাঙ্গুলিরা অবশ্য গোগ্রাসে খাচ্ছিল। খাওয়ারই কথা। ট্রাভেল এজেন্টদের সঙ্গে ইউরোপ ঘোরা মানেই খাওয়ার কষ্ট। গোপীনাথ যতদূর জানে ওরা ব্রেকফাস্ট ছাড়া মোটে আট-দশটা রাউন্ড মিল দেয়। সুতরাং ডিনার আর লাঞ্চ খেতে হয় নিজের পয়সায়, যেটা অধিকাংশ ভারতীয় ভ্রমণকারীই পেরে ওঠে না। ইউরোপে খাবারদাবারের দাম এঁদের পথে বসিয়ে দেয়।
