আর মার্কেটিং! ইউরোপে যা জিনিসের দাম? ওসব মার্কেটিং দেশে করলে দশ ভাগের এক ভাগ দামে পাওয়া যেত।
ওগো, ভদ্রলোক বোধহয় ঘুমোননি। হাঁটু নাড়ছেন। বলবে?
আরে না, প্লেনে যে যার সিট বেছে নেয়। বললে রেগে যাবে।
আমি বাজি ফেলতে পারি, ভদ্রলোক বাঙালি।
বাঙালিরা তো আরও প্রতিবাদী হয়।
ধ্যাত, তুমি কোনও কাজের নও।
গোপীনাথ আর পারল না। চোখ খুলে সোজা হয়ে বসে ভদ্রমহিলার দিকে চেয়ে বলল, আসুন, আপনি এই সিটে বসুন।
মহিলা জিভ কেটে হেসে ফেললেন, এ মা, আপনি আমার কথা শুনতে পেলেন নাকি?
না না, একদম শুনতে পাইনি। কিন্তু আকাশে আজ যে জ্যোৎস্নাটা উঠেছে সেটা মনে হল এক্সক্লুসিভলি মহিলাদের জন্যই। আসুন, লজ্জার কিছু নেই।
একটু ‘না না’ করে ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা জানালার দিকে সরে গেলেন। গোপীনাথ আইল সিটে বসল। ওপরের ক্যাবিনেটে অ্যাটাচি রাখতে ভরসা পাচ্ছে না। পাশেই রাখল।
ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি এনআরআই?
কী করে বুঝলেন?
বোঝা যায়।
হ্যাঁ, আমি এনআরআই-ই বটে।
আমার নাম গৌরাঙ্গ গাঙ্গুলি।
আমি গোপীনাথ বসু।
কোথায় থাকেন?
রোমে।
দু-চার কথা আলাপ জমে উঠছিল। কিন্তু এই আলাপটা খুব একটা চাইছিল না গোপীনাথ। তার চারদিকে নজর রাখা দরকার। সে আড়চোখে ভিতরটা দেখে নিয়েছে। সন্দেহজনক কিছু দেখতে পায়নি। সামনের দিকে কয়েকজন বিদেশি আছে বটে, কিন্তু তারা মাফিয়া কি না কে বলবে।
গৌরাঙ্গ কিছুক্ষণ কথা বলে ঘুমিয়ে পড়ল। কেবিন লাইটগুলো নিভে গেল একে একে। প্লেন ভেসে চলেছে আকাশের অনেক ওপর দিয়ে।
আজ রাতে গোপীনাথের ঘুম আসবে না। সে মাথাটা এলিয়ে রেখে চোখ বুজে রইল। সামনে অনিশ্চিত একটা সময়। সে নিজের পরিস্থিতি বুঝতে পারছে না।
ঘণ্টাখানেক বাদে হঠাৎ সে একটু চমকে উঠল। সামনের চারটে রো আগে একটা লম্বা লোক আধো অন্ধকারে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। লোকটা বিদেশি। লোকটা পিছনের দিকে আসছে।
অ্যাটাচি কেসটা শক্ত করে চেপে ধরল গোপীনাথ। লোকটা তাকে পেরিয়ে টয়লেটের দিকে চলে গেল। একটু বাদে ফিরে গেল নিজের সিটে।
গোপীনাথ ভাবল, আমার কি রজ্জুতে সর্পভ্রম হচ্ছে?
ঘড়িতে যখন রাত তিনটে তখনই পূর্ব দিগন্তে সূর্যোদয় ঘটে গেল। প্লেনের ভিতরটা ঝলমল করে উঠল সকালের আলোয়।
গৌরাঙ্গ একটা হাই তুলে বলল, সকাল হয়ে গেল বুঝি?
হ্যাঁ। আমরা পুবদিকে যাচ্ছি তো, তাই।
বেশ মজার ব্যাপার। আচ্ছা, এরা ব্রেকফাস্ট কখন দেবে?
দেবে।
লোকটা টয়লেটে গেল। মহিলা অঘোরে ঘুমোচ্ছেন। এঁরা কষ্ট করে ইউরোপ ভ্রমণ করে এলেন প্যাকেজ ট্যুরে। এই টুরগুলো মধ্যবিত্ত বাজেটে বাঁধা থাকে বলে খানিকটা কষ্ট হয়।
গোপীনাথ খুব সন্তর্পণে চারদিকটা দেখল। টয়লেটে যাওয়া দরকার, কিন্তু অ্যাটাচি কেসটা কারও জিম্মায় না দিয়ে যায় কী করে? একটু অপেক্ষা করার পর গৌরাঙ্গ ফিরলে সে বিনীতভাবে বলল, দয়া করে অ্যাটাচি কেসটা একটু নজরে রাখবেন? আমি টয়লেট থেকে আসছি।
গৌরাঙ্গ অবাক হয়ে বলল, উড়ন্ত প্লেন থেকেও চুরিটুরি হয় নাকি?
গোপীনাথ একটু লজ্জা পেল। বাস্তবিক, প্রস্তাবটাই অবাস্তব। মৃদু হেসে বলল, কত কী হয়।
গৌরাঙ্গ বলল, আমার অবশ্য ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটের তেমন অভিজ্ঞতা নেই। ঠিক আছে, আপনি যান।
টয়লেট থেকে যখন ঘুরে এল গোপীনাথ তখন বারো-তেরো মিনিট কেটেছে। এসে দেখল, অ্যাটাচি নেই, গৌরাঙ্গ নেই। শুধু মহিলাটি ঘুমোচ্ছন।
আতঙ্কে খানিকক্ষণ স্ট্যাচু হয়ে রইল গোপীনাথ। তারপর ভদ্রমহিলাকে হাঁটুতে ঠেলা দিয়ে জাগিয়ে হিংস্র গলায় বলল, আপনার হাজব্যান্ড কোথায়?
মহিলা ভয় পেয়ে সোজা হয়ে বললেন, জানি না তো! আমি তো ঘুমোচ্ছিলাম।
সর্বনাশ! বলে গোপীনাথ সামনের দিকে দ্রুত পায়ে ছুটে গেল। উড়ন্ত প্লেন থেকে কেউ কখনও পালাতে পারেনি। সুতরাং লোকটাকে ধরা যাবেই।
ধরা গেল সহজেই। গৌরাঙ্গ গাঙ্গুলি খাবারের ঘরের সামনে প্যাসেজে দাঁড়িয়ে একজন এয়ার হোস্টেসের সঙ্গে গল্প করতে করতে কফি খাচ্ছে। গোপীনাথের অ্যাটাচি কেস তার ডান হাতে। গোপীনাথ গিয়ে তার হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিল সেটা।
লোকটা অবাক হয়ে বলল, ও আপনি? আমি ভাবলাম ছিনতাই হচ্ছে বুঝি। ভাবলাম, যখন দেখতে বলে গেছেন তখন অ্যাটাচি কেসটায় গুরুতর জিনিস আছে। তাই এটা নিয়েই কফি খেতে এসেছিলাম।
গোপীনাথ অপ্রস্তুতের একশেষ। মৃদু স্বরে বলল, আমাকে ক্ষমা করবেন।
২০.
গোপীনাথ বুঝতে পারছে পরিস্থিতির চাপে সে সম্পূর্ণ অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। নার্ভাস, নির্বোধ ও কাণ্ডজ্ঞানশূন্য। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ না আনতে পারলে সে হয়তো আরও বোকার মতো কাণ্ড করে ফেলবে। গৌরাঙ্গ গাঙ্গুলির হাত থেকে অ্যাটাচি কেসটা কেড়ে নিয়ে সে এমন একটা কাণ্ড করল যা আশেপাশের সকলের চোখে পড়েছে।
নিজের সিটে ফিরে এসে সে কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে রইল। মিসেস গাঙ্গুলির ঘুম সে এমন ভাবেই ভাঙিয়ে দিয়েছে যে ভদ্রমহিলা জড়সড় হয়ে বসে ভিতু ভিতু চোখে মাঝে মাঝে তাকে দেখছে। বড় লজ্জা করছে গোপীনাথের। ভদ্রমহিলার হাঁটু সে খিমচে দিয়েছিল।
গৌরাঙ্গ গাঙ্গুলি সিটে ফিরল আরও প্রায় দশ মিনিট পর। বউকে বলল, গুহবাবুর সঙ্গে দেখা করে এলাম। পরশু পাস্তা খেয়ে পেট খারাপ হয়েছিল। এখন ভাল আছেন।
