কলকাতায় কি আমি নিরাপদ?
মৃদু একটু হেসে দাতা বলল, নিরাপত্তার গ্যারান্টি কে কাকে দিতে পারে বলুন তো?
আপনি পারেন। কারণ আপনার অর্গানাইজেশনই আমাকে হুমকি দিয়েছিল।
দাতা একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, আপনি বিজ্ঞানের মানুষ, নিজের কাজ নিয়ে থাকেন। পৃথিবীর অন্ধকার জগতের খবর রাখেন না। যদি রাখতেন তা হলে বুঝতেন, অপরাধের জগৎও কী বিপুল।
আপনি এই জগতে ঢুকলেন কেন?
সেটাও আমার কাজ। তবে আমার পা দু’নৌকায়। সেসব আপনি বুঝবেন না। বোঝার দরকারও নেই।
আন্তর্জাতিক একটা অপরাধ চক্রের চাঁই একজন বাঙালি, এ যে আমি ভাবতেই পারি না।
তা হলে ভাববার দরকার কী? ওসব না ভাবাই ভাল। বাঙালি একটা জাতিসূচক পরিচয় মাত্র। মানুষকে কত ভাবে বাঁচতে হয়।
দাতা তার পাশে রাখা একটা চামড়ার ব্যাগ খুলে একটা ফাইল বের করল। ফাইলটা তার হাতে দিয়ে বলল, এটা সঙ্গে রাখুন।
কী এটা?
এর মধ্যেই আপনার সাধের এক্স টু থাউজ্যান্ড থ্রি-র তথ্যগুলো আছে। সাজিয়ে নেওয়া আপনার কাজ।
আমার কলকাতার ফ্ল্যাটে কম্পিউটার নেই।
দাতা অবাক হয়ে বলল, কে বলল নেই?
আমিই বলছি। কলকাতায় খুব কম যাই, গেলেও বিশ্রাম নিই বলে কম্পিউটার রাখি না।
ওসব ভাববেন না। আপনার ফ্ল্যাটে গেলেই দেখতে পাবেন যে, সেখানে একটা কম্পিউটার বসানো রয়েছে।
গোপীনাথ হাঁ করে দাতার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, আপনি তো সাংঘাতিক লোক?
বিনীতভাবে দাতা বলল, নানা, আমি তেমন কিছুনই। আসলে আমাদের অর্গানাইজেশনের হাত খুব লম্বা। তারা সব পারে।
তা বটে।
আর-একটা কথা। সাক্কি কিন্তু জানে যে, আপনি রুমিং হাউস থেকে পালিয়েছেন। তারা এটাও অনুমান করবে যে, আপনি ইতালি ছাড়ার চেষ্টা করবেন।
গোপীনাথ তটস্থ হয়ে বলল, তাই নাকি?
সেটাই তো স্বাভাবিক।
গোপীনাথ মাথা নেড়ে বলল, তা বটে।
সুতরাং একটু সাবধান থাকবেন।
কীরকম সাবধান?
তা জানি না। সেটা নিজেই ঠিক করে নেবেন।
আপনি কি আমার সঙ্গে এই ফ্লাইটেই যাবেন?
মাথা নেড়ে দাতা বলল, না। আমি যাব অন্য জায়গায়, অন্য কাজে। আপনার ভয় নেই, ভিকিজ মব আপনার পিছু নেবে না। যতদিন আমাদের কথা শুনে চলবেন ততদিন নয়।
আর সাক্কি?
সাক্কি একটা কোম্পানি। তারা তো গুন্ডামি করে না। কিন্তু প্রয়োজন হলে পেশাদার গুন্ডা লাগায়। তাদের গতিবিধি সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। আমি শুধু আপনাকে সতর্ক করতে পারি।
ধন্যবাদ।
লম্বা ও সুপুরুষ লোকটা উঠে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে তার কাঁধে একটু চাপ দিয়ে বলল, চলি, এটা আমার টার্মিনাল নয়। আমার ফ্লাইট অন্য টার্মিনালে। কখনও দেখা হয়ে যাবে হয়তো।
গোপীনাথ কথা বলল না। শুধু হাতটা একবার তুলল।
লোকটা দ্রুত পদক্ষেপে লাউঞ্জ পেরিয়ে কোন দিকে যে চলে গেল তা বুঝতে পারল না গোপীনাথ। কিন্তু লোকটার গতিবিধি যে অবাধ তাতে সন্দেহ রইল না তার।
আরও আধ ঘণ্টা বাদে প্লেনে ওঠার নির্দেশ ফুটে উঠল মনিটরে। খুব ধীরে উঠল গোপীনাথ। এগোতে লাগল যন্ত্রের মতো। মাথায় চিন্তার ঝড়।
যখন সিকিউরিটির গাঁট পেরিয়ে প্লেনের ভিতরে ঢুকল তখনও তার গভীর অন্যমনস্কতা কাটেনি।
সাধারণত আইল সিট তার প্রিয়। আজ সে ইচ্ছে করেই আইল সিট নেয়নি। নিয়েছে জানালার ধার। প্লেনের পিছনে প্রায় টয়লেটের কাছাকাছি। পিছনে মাত্র দুটো রো।
অ্যাটাচি কেসটা পাশে নিয়েই বসল সে। ফাইলটা কোলের ওপর রেখে খুলল। কম্পিউটার প্রিন্ট আউট এবং মাইক্রো ফিমের অনেক কিছুই জোগাড় করেছে এরা। ফাইলটা বন্ধ করে অ্যাটাচি কেসটা খুলে ভিতরে ঢুকিয়ে দিল সে। কেসটা সিটে তার শরীর ঘেঁষে দাঁড় করিয়ে রেখে সে বসল।
গভীর রাত। প্লেনে অনেক ভারতীয় যাত্রী। বাংলা কথাবার্তাও শুনতে পাচ্ছে সে। কিন্তু তার ভারতীয়ত্ব অর্ধমৃত। দীর্ঘকাল বিদেশে বসবাসের ফলে বাঙালি বা ভারতীয় দেখলেই আজকাল আর হামলে পড়তে ইচ্ছে যায় না।
পাশের সিট দুটো খালি ছিল। একজোড়া স্বামী-স্ত্রী এসে বসল এবং গোপীনাথ খুব অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। কারণ দু’জনেই বাঙালি। মহিলাটি শাড়ি পরা, সিঁথিতে সিঁদুর। সে বাঙালি টের পেলেই আলাপ জমানোর চেষ্টা করবে।
গোপীনাথ ঘুমের ভান করে সিটে এলিয়ে রইল।
হঠাৎ শুনতে পেল মহিলাটি তার স্বামীকে খুব চাপা গলায় বলল, হ্যাগো, ভদ্রলোককে বললে জানালার পাশের সিটটা ছেড়ে দেবে না?
আরে নাঃ, ওসব বলতে গেলে রেগে যাবে হয়তো।
রাগবে কেন? ভালভাবে বললে ঠিক ছেড়ে দেবে। মুখ দেখে তো ভাল লোকই মনে হচ্ছে, বোধহয় বাঙালিই।
তোমার মাথা। জানালার পাশে বসেই বা কী দেখবে? বাইরের কিছু দেখা যায়?
আহা, আজ চাঁদ উঠেছে দেখোনি? জানালার পাশে বসে জ্যোৎস্না দেখব।
দেখতে হবে না। ঘুমিয়ে পড়ো। গত কুড়ি দিনে অনেক কিছু দেখেছ। জ্যোৎস্নাটা বাদ দাও।
অনেক কিছু না হাতি। প্যাকেজ টুরে কিছু কি দেখা যায়? লুভ্র মিউজিয়ামটায় মাত্র একদিন নিয়ে গেল। রোমও তো কিছু দেখা হল না।
আচ্ছা, পরে আবার আসা যাবে।
আর এসেছ! এবার আসতেই কত সাধাসাধি করতে হয়েছে।
ছেলেমেয়ে রেখে বিদেশ বেড়াতে আমার ভাল লাগে না বলেই আপত্তি ছিল।
ওরা এখন বড় হয়ে গেছে। অত চিন্তা করো কেন বলো তো পুরুষমানুষ হয়ে?
আমার মন তোমার মতো শক্ত নয়।
মহিলা বললেন, এরা কিন্তু আমাদের খুব খাওয়ার কষ্ট দিয়েছে। এরকম জানলে এদের সঙ্গে আসতামই না। খেতে গিয়েই তো টাকা সব ফুরিয়ে গেল, মার্কেটিং হলই না।
