গোপীনাথ তার চেকবই বের করে সই করল। জিনার হাতে দিয়ে বলল, কিছু বেশি টাকা আছে, নিয়ো!
জিনা অবাক হয়ে বলল, কেন?
আমি চাই তুমি সাত দিন ছুটি নিয়ে কোথাও বেড়িয়ে এসো। এটা এক বন্ধুর প্রীতি উপহার।
জিনা চেকটা হাতে নিয়ে চোখ বড়বড় করে বলল, কিন্তু এ তো অনেক টাকা!
গোপীনাথ মাথা নেড়ে বলল, বেশি নয় জিনা, মোটেই বেশি নয়। তুমি তো জানো না মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা আগেও যখন মৃত্যুর মুখে বসে আছি তখন আমি উত্তরাধিকারী খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমার টাকা পয়সা, ভিলা, গাড়ি কাকে দিয়ে যাব বলো তো! পাঁচ ভূতে লুটে নিত সব। এখনও আমার উত্তরাধিকারী নেই। আমি যদি মারা যাই আমারটা ভোগ করার কেউ নেই।
তা বলে এত টাকা!
টাকার অঙ্কটা নিয়ে মাথা ঘামিয়ো না। ওটা কিছু নয়।
জিনা তাকে হঠাৎ কাছে টেনে এনে গালে একটা পর একটার চুমু খেয়ে বলল, তোমাকে ধন্যবাদ।
গোপীনাথ আর একটা চেক তাড়াতাড়ি সই করে হাস্যমুখী মারিয়ার হাতে দিয়ে বলল, খুকি তোমাকে এটা দিচ্ছি কেন জানো? এটা ঘুষ। যত তাড়াতাড়ি পারো ওই মোটরবাইকটা ঝেড়ে ফেলে একটা গাড়ি কিনে নাও। দু’চাকা বড্ড বিপজ্জনক জিনিস।
চেকটার দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে একটা শিস দিল মারিয়া। বলল, আমি জীবনে একসঙ্গে এত টাকা দেখিনি।
লজ্জিত গোপীনাথ বলল, বন্ধুর সামান্য উপহার।
ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে গোপীনাথ ভিতরের দিকে পা বাড়িয়ে একবার ফিরে তাকাল। দুটি মেয়ে তার দিকে করুণ গম্ভীর মুখ করে চেয়ে আছে। গোপীনাথ মুখ ফিরিয়ে নিল। তার কান্না আসছে।
মধ্যরাত্রির এখনও একটু দেরি আছে। সে বিমানবন্দরের বিবিধ বিধি অতিক্রম করে একসময়ে লাউঞ্জে পৌঁছে গেল। ডিসপ্লে মনিটার দেখল, এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ রোম ছেড়ে যাবে।
গোপীনাথ একটা আরামদায়ক আসনে বসে গা ছেড়ে দিয়ে চোখ বুজল। গত কয়েক ঘণ্টায় তার ওপর দিয়ে উদ্বেগ ও অশান্তির যে ঝড় বয়ে গেছে তার ফলে সে গম্ভীরভাবে ক্লান্ত। ভীষণ ক্লান্ত।
কতক্ষণ কেটে গেছে কে জানে। গোপীনাথের একটু ঝিমুনিও এসেছিল।
হঠাৎ কানের কাছে কে যেন পরিষ্কার বাংলায় বলল, বাঃ, এই তো চাই। আপনি তা হলে এসে গেছেন।
গোপীনাথ চমকে উঠে যাকে তার পাশের সিটে দেখল তার মতো অপ্রত্যাশিত লোক হয় না। তার শরীর হিম হয়ে গেল। পাশে বসে দাতা।
চমকে গেলেন নাকি?
আপনি?
আরে ভয় পাচ্ছেন কেন, সব কিছুর পিছনেই তো আমি।
তার মানে?
জিনা তো আমারই লোক।
গোপীনাথ হাঁ হয়ে গেল।
১৯.
আকস্মিক সাক্ষাৎকারের ধাক্কাটা সামলাতে গোপীনাথের কিছুক্ষণ সময় লাগল। লোকটা বাঙালি বটে, কিন্তু ঘটনাচক্রে এই লোকটাই ভিকিজ মব-এর প্যারিস শাখার চাঁই, আর ভিকিজ মব যে তার পরম শত্রু সেটা আর সন্দেহের অবকাশ রাখে না।
গোপীনাথ তার অশান্ত হৃদযন্ত্রকে কিছুক্ষণ সময় দিল শান্ত হতে। তারপর স্তিমিত গলায় বলল, আপনারা কী চান বলুন তো?
দাতা একটু হেসে বলল, আমরা কী চাই তা তো আপনার অজানা নয়। আমার বন্ধু পল প্যারিসে আপনার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করেছিল। এক্স টু থাউজ্যান্ড থ্রির সম্পূর্ণ কম্পিউটার প্রিন্ট আউট।
গোপীনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আপনি কি সায়েন্টিস্ট?
না। কিন্তু বন্ধু পল একজন ছোটখাটো বিজ্ঞানী। গোপীনাথ মাথা নেড়ে বলল, এক্স টু থাউজ্যান্ড থ্রি কত বড় প্রোজেক্ট তা আপনি জানেন। পলকে আমি বুঝিয়ে বলেছিলাম অত বড় একটা কাজের হাজারো দিকের হদিশ দেওয়া সহজ নয়। তা ছাড়া আমি সাক্কি ছেড়ে দিয়েছি, এখন তা আরও অসম্ভব। আপনি তো জানেন, সাক্কি আমাকে কীভাবে নজরবন্দি করে রেখেছিল। আপনি আমাকে উদ্ধার করেছিলেন।
হ্যাঁ। তারপর আরও অনেক ঘটনা ঘটে গেছে।
গোপীনাথ মাথা নেড়ে বলল, জিনা আপনার লোক অমি তা জানতাম না। জিনাকে আমার ভাল মেয়ে বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু ওখান থেকে আমাকে বের করে আনার নাটকটা করলেন কেন?
আপনি বেনভেনুটি আর বাসিলোঁকে চেনেন কি?
বাসিলোঁর নামটা শোনা।
হ্যাঁ, বেনভেনুটিও বিখ্যাত লোক। প্রাক্তন বক্সার। একটা মাফিয়া দলের নিচু দরের অপারেটর। নির্বোধ, কিন্তু ভয়ংকর। আপনার ওপর ওদের প্রতিশোধ নেওয়ার ছিল, কারণ রুমিং হাউস থেকে পালিয়ে এসে আপনি ওদের বিপদে ফেলেছিলেন।
তাই নাকি? আমি এত কিছু জানতাম না।
আপনি জিনার সঙ্গে পালিয়ে আসার মাত্র আধ ঘণ্টা আগে আমি খবর পাই যে, ওরা আসছে। জিনাকে সেইমতো সংকেত পাঠাই। জিনা আপনাকে নিয়ে পালিয়ে আসে।
জিনাকে কীভাবে সংকেত পাঠালেন? টেলিফোন তো বাজেনি।
দাতা হাসল, ইলেকট্রনিক্সের এই যুগে একজন বৈজ্ঞানিকের মুখে এই কথা? জিনার গলায় একটা সরু হার আছে, দেখেছেন? তার লকেটে….
গোপীনাথ মাথা নেড়ে বলল, বুঝেছি। এবার কী হবে?
দাতা মাথা নেড়ে বলল, কিছু হবে না। আপনাকে আমি নির্ভয়ে কলকাতা পর্যন্ত যেতে দিচ্ছি। কলকাতায় আপনি আপনার নিজস্ব ফ্ল্যাটে থাকবেন। কেউ বাধা দেবে না। সেইখানে বসে ঠান্ডা মাথায় আপনি এক্স টু থাউজ্যান্ড থ্রি-র ব্লু প্রিন্টটা তৈরি করবেন।
অসম্ভব!
জানি। আমরা আপনাকে সাহায্য করব। কিছু তথ্য আমরা আপনাকে দিচ্ছি। এগুলোকে লিঙ্ক আপ করা আপনার পক্ষে হয়তো সম্ভব। জিনিসটা একটা মারাত্মক পোর্টেবল ক্ষেপণাস্ত্র আমরা তার সবটুকু জানতে চাই। সবটুকু হলেও অনেকটাই আপনি জানাতে পারবেন।
