মারিয়া বলল, পরে দেখা যাবে। চলো, সময় নেই।
যে দুটি ছেলে তাকে টেনে এনেছিল, তাদের দুজনের হাতেই পিস্তল। একজন এসে বলল, দূর থেকে চালিয়েছে বলে বেঁচে গেছ, নইলে ব্যাগসুষ্ঠু তোমাকে ফুটো করে দিত।
মারিয়া গলির মধ্যে তাকে নিয়ে আরও প্রায় দুশো মিটার গেল। কানা গলি। দারুণ ঘিঞ্জি। গলির শেষ প্রান্তের কাছাকাছি মারিয়া তাকে নিয়ে একটা বাড়িতে ঢুকল। সরু সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে উঠে এল চার তলার ছাদে।
গোপীনাথ একটু হাঁফাচ্ছিল। ধকল কম যাচ্ছে না। ব্যায়াম নেই, তার ওপর উদ্বেগ ও অশান্তি তাকে খানিকটা কাহিল করে ফেলেছে।
মারিয়া ছাদের রেলিং-এর কাছে এসে বলল, ও পাশের ছাদটা মাত্র চার ফুট তফাতে। রেলিং-এ উঠে দাঁড়ালে অনায়াসে লাফিয়ে ওপাশে পড়া যায়। তুমি নার্ভাস নও তো?
গোপীনাথ বিবর্ণ মুখে হেসে বলল, আমার অন্য উপায় থাকলে এসব নিয়ে ভাবতাম। তবে এই লাফটা আমাদের প্রোগ্রামে তো ছিল না!
এটা ধর্তব্যের মধ্যে নয় বলে বলিনি।
মারিয়া রেলিং-এর ওপর উঠে দাঁড়াল। নীচে চারতলার ছাদ। কিন্তু সেটা গ্রাহ্য না করে বেড়ালের মতো একটা লাফ মেরে ও পাশের ছাদের রেলিং-এর ওপর চলে গেল। ছাদে নেমে হাত বাড়িয়ে বলল, তোমার ব্যাগটা দাও।
গোপীনাথ ব্যাগটা ওর হাতে চালান করে রেলিং-এর ওপর উঠল। উচ্চতার ভয় তার আছে, তবে এখন তার কাছে এগুলো কোনও ব্যাপার নয়। সে দাঁড়িয়ে একটু ঝুল খেল। তারপর খুব জোরে নিজেকে ছুঁড়ে দিল ওপাশে, এমনভাবে যাতে রেলিং-এ না থেমে ছাদে গিয়ে পড়া যায়। কিন্তু হিসেবের একটু ভুল হল গোপীনাথের। চমৎকার লাফটা দিলেও পা ভাল করে না গোটানোর ফলে পাশের ছাদের রেলিং-এ পা লেগে সে ও পাশের ছাদে গিয়ে পড়ল একেবারে কুমড়ো গড়াগড়ি খেয়ে।
মারিয়াই তাকে তুলে দাঁড় করাল, তোমার লাগেনি তো!
লেগেছে। ভালই চোট হয়েছে বাঁ হাঁটু আর বাঁ কনুইয়ে। শীতকাল বলে ব্যথাও হচ্ছে প্রচণ্ড। কিন্তু তা স্বীকার করে কী করে? সে বলল, না। তেমন কিছু নয়।
এসো, আমাদের সময় নেই।
মারিয়ার পিছু পিছু সে দোতলা অবধি নামল। বাড়িটা ফাঁকা এবং পোড়ো বলে মনে হচ্ছিল তার। জিজ্ঞেস করল, এটা কার বাড়ি?
এ বাড়িটা ভেঙে ফেলা হবে শিগগির। এসো।
তারা একটা ঝুল বারান্দার মতো জায়গায় এল। নীচে গলি।
নীচের দিকে চেয়ে গোপীনাথ আতঙ্কিত গলায় বলল, তুমি বলেছিলে দশ ফুট, কিন্তু এ তো দেখছি পনেরো ফুটের কম হবে না।
না, না, অত নয়। দশের জায়গায় বারো হতে পারে। পারবে না?
না পেরে উপায় কী?
শোনো। লাফ দেওয়ার সময় শরীরটাকে স্প্রিং-এর মতো করে নেবে। মাটিতে পড়েই পারলে গড়িয়ে নেবে একটু। তা হলে ইমপ্যাক্টটা টেরও পাবে না।
গোপীনাথ বলল, চেষ্টা করব।
আমি আগে নামছি।
মারিয়া রেলিংটা ডিঙিয়ে বিনা প্রস্তুতিতে লাফ দিল। অবিকল বেড়াল। পড়ল হাঁটু ভেঙে, পা আর হাতে চমৎকার ভর দিয়ে। এত অনায়াসে কাউকে এরকম নামতে দেখেনি গোপীনাথ। ব্যাগটা নীচে ফেলে সে-ও রেলিং ডিঙোল। তারপর নিজেকে ছেড়ে দিল ওপর থেকে। মারিয়ার নকল করেই নামল সে। কিন্তু গোঁড়ালি আর হাতের কবজি ঝিনঝিন করে উঠল লাফের ধাক্কায়। দাঁতে দাঁতে একটা জোর ঠোকাঠুকিও হল। তবু তেমন গুরুতর কিছুই ঘটল না।
মারিয়া তাকে ধরে গালে চকাস করে একটা চুমু খেয়ে বলল, তুমি দারুণ লোক। এসো, ওই আমার বাইক।
গোপীনাথ দেখল মোটরবাইকটা মোটেই মেয়েলি নয়। বেশ শক্তিশালী এবং বড়সড়। দুটো হেলমেট রাখা ছিল সিটের ওপর। মারিয়া তাকে একটা পরিয়ে নিজেও পরল।
শুরু থেকেই গোপীনাথ বুঝল মারিয়া বিপজ্জনক মেয়ে। গলিটা যে স্পিডে পার হল তাতে গোপীনাথের হাত-পা শিরশির করে উঠল।
একটু আস্তে চালাও মারিয়া। এত স্পিড, আমি হয়তো উড়ে যাব।
মারিয়া একটা ডানমুখী মোড় ফিরে স্পিড কমিয়ে বলল, এটা রোম, এখানে খুব স্পিডে কি চালানো যায়? আচ্ছা, তোমার সম্মানে আমি স্পিড কমাচ্ছি, কিন্তু মনে রেখো আমাদের হাতে সময় নেই।
দা ভিঞ্চি এয়ারপোর্ট পর্যন্ত মারিয়া বহুবার তার কথা ভঙ্গ করে মাঝে মাঝে এমন গতিতে চালাল যে গোপীনাথ মেয়েটাকে আঁকড়ে ধরে বসে থেকেও ভাবছিল বোধহয় বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে পিছনে। কিন্তু তারা পৌঁছোল অবিশ্বাস্য কম সময়ে।
নির্দিষ্ট টার্মিনালের বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল জিনা। মুখে একটু উদ্বেগ।
এসেছ? বাঁচা গেল।
গোপীনাথ একটা অদ্ভুত আবেগ বোধ করল মেয়েটার প্রতি। কিছুক্ষণ আগেই এই জিনা এসেছিল তাকে সঙ্গ দিতে। কিন্তু তার পরেই মেয়েটা নিল ত্রাতার ভূমিকা। জীবনটাই অদ্ভুত।
সে জিনার হাত আবেগে চেপে ধরে বলল, আমার জন্য তুমি এতটা করলে কেন?
জিনা একটু হাসল। বলল, সুযোগ পেলে পরে বলব।
আমি তোমার ঋণ কীভাবে শোধ করব বলল তো!
কেউ কারও কাছে ঋণী নয়। আমরা সবাই মানবতার জন্য যেটুকু পারি, করি।
জিনা, তুমি স্ট্রিপটিজ ছেড়ে দাও। তুমি তো সামান্য মেয়েমানুষ নও যে শরীর বেচে খাবে।
যাদের শরীর ছাড়া আর কিছু নেই তারা কী করবে বলো তো?
তোমার অনেক কিছু আছে জিনা। তুমি এক মহান নারী।
জিনা হাসল, এরকম কথা এর আগে আমাকে আর কেউ বলেনি। তুমিই প্রথম।
এটা তোষামোদ নয়। আমি আমার সত্যিকারের মনের কথা বললাম।
জানি। তোমার মুখ দেখে মনে হয় তুমি ধূর্ত নও। এই নাও তোমার টিকিট।
