হ্যাঁ। আজ রাতেই আমি রোম ছাড়ছি। খু
ব ভাল। মাফিয়ারা লোক খুব খারাপ। যত তাড়াতাড়ি পালাতে পারো ততই ভাল।
একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
করো।
জিনা কেন স্ট্রিপটিজ করে?
ওটা ওর পেশা। খারাপ কী? আমাদের তো বাঁচতে হবে।
এটা তো খারাপ পেশা।
হয়তো তাই। বিশেষ করে এই এইডসের যুগে। তবে বেশিদিন নয়। জিনা হয়তো চাকরি পেয়ে যাবে।
জিনা ভাল মেয়ে। ওকে বলবেন স্ট্রিপটিজ মোটেই ভাল পেশা নয়।
বলব। তুমি যে ওর জন্য ভেবেছ তাতে খুশি হলাম।
নীচে ডোর বেল বাজল। উৎকর্ণ হল গোপীনাথ।
১৮.
জিনার পিসিই বোধহয় দরজা খুলল নীচের তলায়। একটি মেয়েলি কণ্ঠ কী যেন জিজ্ঞেস করল। তারপর একজোড়া লঘু পা উঠে এল ওপরে। একটু বাদে যে এসে ঘরে ঢুকল তাকে বালিকাই বলা যায়। পনেরো-ষোলো বছরের একটি ফুটফুটে মেয়ে। পরনে হালকা নীল রঙের পুলওভার, গরম কাপড়ের প্যান্ট, পায়ে ভারী রবার সোলের জুতো, মাথায় খুব রংদার একখানা রাশিয়ান কান-ঢাকা টুপি।
ঘরে ঢুকেই গোপীনাথের দিকে ডান হাতখানা বাড়িয়ে দিয়ে ইতালিয়ানে বলল, মারিয়া। আমি জিনার বন্ধু।
করমর্দন করে গোপীনাথ বলল, আমি গোপীনাথ।
জানি। জিনা তোমার হুবহু বর্ণনা আমাকে দিয়েছে।
জিনা কোথায়?
জিনা তোমার সঙ্গে এয়ারপোর্টে দেখা করবে। আমি এসেছি তোমাকে নিয়ে যেতে।
গোপীনাথ একটু অস্বস্তি বোধ করে বলল, তুমি! তোমার বয়স কম। তুমি কেন এসব বিপদের মধ্যে এলে?
মেয়েটি ভারী সুন্দর হাসি হেসে বলল, আমি বিপদ ভালবাসি।
গোপীনাথ তবু একটু কিন্তু কিন্তু করছিল। একবার জিনার মায়ের দিকে তাকাল।
জিনার মা তার শুকনো মুখে বললেন, ওকে অবিশ্বাস করার কিছু নেই। ও আন্তনিওর বোন।
আন্তনিওর বোন! তা হলে তো সত্যিই অবিশ্বাসের কিছু নেই। গোপীনাথ তৈরিই ছিল। উঠে পড়ে বলল, চলো।
আমি কিন্তু তোমাকে একটা মোটরবাইকে চাপিয়ে নিয়ে যাব। ভয় পাবে না তো?
না। ভয়ের কী আছে?
সবাই বলে আমি নাকি বড্ড জোরে চালাই।
রোমের রাস্তায় জোরে না চালানোই বুদ্ধির কাজ।
মারিয়া হাসল, জোরে না চালালে তোমাকে বের করে নিয়ে যাব কেমন করে? এ পাড়া থেকে বেরোবার মোট চারটে পথ আছে! চারটের মধ্যে তিনটে পথই ওরা বন্ধ করে দিয়েছে।
কীভাবে?
বন্ধ করেছে বলতে ওদের লোক তিনটে মোড়েই পাহারা দিচ্ছে। আন্তনিওর ভয়ে ভিতরে এসে হামলা করেনি। কিন্তু এ অবস্থা বেশিক্ষণ চলবে না। ওরা শেষ অবধি দল বাড়িয়ে ভিতরে ঢুকবে। তার আগেই তোমাকে বের করে নিয়ে যেতে হবে। তা ছাড়া সময়ও বেশি নেই।
চার নম্বর পথটা কি নিরাপদ।
মারিয়া ভ্রু কুঁচকে একটু ভাবল। তারপর বলল, তুমি দশ ফুট উঁচু থেকে লাফ দিতে পারবে?
অবাক হয়ে গোপীনাথ বলল, তার মানে?
চার নম্বর পথ বলতে কিছু নেই। কিন্তু একটা ছাদ ডিঙিয়ে ওপাশে পড়তে পারলে কোনও চিন্তা নেই। ও পাশে আমার মোটরবাইক রাখা আছে।
গোপীনাথ বলল, পারব।
তা হলে চলো। দেরি করলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠবে।
আমার জন্য তোমরা অনেক ঝুঁকি নিচ্ছ।
ঝুঁকি আবার কীসের? এসব আমাদের কাছে জলভাত। মাফিয়াতন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের আরও বড় লড়াই করার আছে। চলো।
গোপীনাথ জিনার মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এল।
সিঁড়ি দিয়ে গোপীনাথের আগে আগে নামতে নামতে মারিয়া বলল, একটু দৌড়োতেও হবে। তুমি দৌড়োতে পারবে তো?
পারব। তবে গত এক সপ্তাহ আমি কোনও ব্যায়াম করিনি।
কিন্তু তোমার ফিগার তো ভাল। দেখতে বেশ শক্তপোক্ত।
হ্যাঁ। আমি সহজে কাবু হই না।
তা হলে পারবে।
রাস্তায় বেরিয়ে চারদিকটা দেখে নিয়ে মারিয়া বলল, গলির মুখে যে আড়াআড়ি রাস্তাটা দেখছ ওটাই দৌড়ে পার হতে হবে। কারণ ডানদিকে একটা প্রান্তে ওরা ওত পেতে আছে।
হ্যাঁ, ওদিক থেকেই ওরা আমাকে তাক করে গুলি চালিয়েছিল।
জানি। ওই রাস্তায় তোমার দিকে আবার গুলি চলতে পারে, যদি ওরা দেখতে পায়। তবে গলির মুখের বাতিগুলো আমরা নিবিয়ে দিয়েছি।
ওখানে তোমাদের পাহারা নেই?
মারিয়া মাথা নেড়ে বলল, আছে। তবে এটা একটা খোলা রাস্তা। বাইরের গাড়িটাড়ি যায়। কাজেই ওটা আমরা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারিনি। করলে পুলিশ এসে ঝামেলা করবে, ট্রাফিক জ্যাম হবে।
বুঝেছি।
গলির মুখে এসে সাবধানে ডাইনে বাঁয়ে দেখে নিল মারিয়া। সামনের রাস্তায় খানিকটা সত্যিই অন্ধকার।
মারিয়া চাপা গলায় বলল, এবার আমাদের বাঁদিকে খানিকটা দৌড়ে যেতে হবে। ওই যে জলের কলটা দেখছ, ওর পিছনে ডানদিকের গলিতে ঢুকে যেতে হবে। তারপর নিশ্চিন্ত।
গোপীনাথ ব্যাগটা কাঁধের ওপর ফেলে বলল, চলো, আমি প্রস্তুত।
মারিয়া যত জোরে ছুটতে পারে তত জোরে গোপীনাথ পারে না। অন্তত এখন পারছে। দুশো মিটারের মতো পথ মারিয়া এক লহমায় পার হয়ে গেল। গোপীনাথ মাঝামাঝি পর্যন্ত যেতেই হাঁফাচ্ছিল। কে যেন সামনে থেকে চাপা গলায় বলল, জোরে জোরে দৌড়োও দেখতে পাবে।
জলের কলের কাছটায় পৌঁছেই গিয়েছিল গোপীনাথ। একেবারে শেষ সময়ে আচমকা দূর থেকে একটা গুলির শব্দ হল। কোথায় লাগল কে জানে, কিন্তু গোপীনাথ একটা ধাক্কা খেয়ে উপুড় হয়ে পড়ে গেল।
দু’জোড়া পা ছুটে এল। দু’জোড়া হাত তাকে ধরে প্রায় হিঁচড়ে গলির মধ্যে নিয়ে গিয়ে ফেলল।
মারিয়া উদ্বিগ্ন গলায় বলল, তোমার কোথায় লেগেছে?
গোপীনাথ উঠে দাঁড়িয়ে শরীরটাকে অনুভব করল। না, তার গায়ে গুলি লাগেনি। কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে সে বলল, সত্তবত ব্যাগে লেগেছে। অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না।
