কেন বলো তো?
কারণ এখানে বাইরের লোক সুবিধে করতে পারে না।
গোপীনাথ ঘরের মধ্যে পিছিয়ে এল। এভাবে পালিয়ে থাকাটা তার কাপুরুষোচিত বলে মনে হচ্ছে।
কিন্তু বাসিলোঁ কে তা সে ঠিক বুঝতে পারছে না। নামটা সে কার কাছে শুনেছে। ওদের কে লাগাল তার পিছনে?
গোপীনাথ ফের বিছানায় এসে শুয়ে রইল।
কিছুক্ষণ বাদে হঠাৎ একটা দৌড়োদৌড়ির শব্দ পেল গোপীনাথ। একটা শিস দেওয়ার শব্দও। সে তাড়াতাড়ি উঠে জানালাটা ফাঁক করে চোখ রেখে দেখল, গলিটা ফাঁকা। মোড়ের ছেলেরাও কেউ নেই। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে গোপীনাথ দরজা খুলে প্যাসেজে বেরিয়ে এল। এদিক ওদিক চাইতেই বাঁদিকে সিঁড়িটা দেখতে পেল সে। সিঁড়ি বেয়ে সোজা ছাদে উঠে এল গোপীনাথ। ছাদ থেকে ঝুঁকে দেখল, গলি ছাড়িয়ে আর একটু দূরের রাস্তায় একটা গাড়ি দাঁড়ানো। দু’জন লোককে নিয়ে কয়েকটা ছেলে। উত্তপ্ত কিছু কথাবার্তা হচ্ছে। এখান থেকে শোনা গেল না।
গোপীনাথ তবু খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু সে ভুলেই গিয়েছিল যে, সে ভোলা ছাদে দাঁড়ানো। তাকে রাস্তা থেকে দেখা যাচ্ছে।
হঠাৎ দুম করে একটা শব্দ, আর শিস তুলে একটা তীব্র গতির বুলেট তার মাথার পাশ দিয়ে বেরিয়ে যেতেই কাণ্ডজ্ঞান ফিরে এল তার। সে বসে পড়ল এবং হামাগুড়ি দিয়ে চলে এল সিঁড়ির মুখে।
সিঁড়ি দিয়ে দ্রুতগতিতে নেমে দোতলার প্যাসেজে একটু দাঁড়াল সে। রাস্তার ও দুটো লোককে সে চেনে। এরাই আগের রুমিং হাউসটার করিডরে বসে তাকে পাহারা দিত। মারতে চাইলে তো তখনই মারতে পারত। গোপীনাথের বিশ্বাস ছিল, সাক্কি বা ভিকিজ মব কেউই তাকে মারতে চায় না। মেরে লাভ কী? বরং গোপীনাথ বেঁচে থাকলেই তাদের লাভ। কিন্তু আজ সে বিশ্বাস আর গোপীনাথের রইল না। বুঝতে পারছে তাকে খুন করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।
রাস্তায় আরও দু’বার গুলির শব্দ হল। জিনা যে আশ্বাস দিয়েছিল তা কতটা নির্ভরযোগ্য কে জানে। পাড়ার ছেলেরা হয়তো প্রতিরোধ করার চেষ্টা করবে, কিন্তু প্রবল প্রতিপক্ষের সঙ্গে পারবে কি?
ঘরে এসে গোপীনাথ একটা চেয়ারে বসল। জানালার কাছে যেতে সাহস পেল না। একটু দূরে কোথাও আবার দুটো গুলির শব্দ হল। নীচের গলি দিয়ে একাধিক দৌড়পায়ের শব্দ এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মিলিয়ে গেল।
তারপরই তাকে চমকে দিয়ে টেলিফোন বেজে উঠল ঘরের মধ্যেই। প্রথমটায় টেলিফোনটা খুঁজেই পেল না গোপীনাথ। তারপর পেল। দেয়ালে ঝোলানো সবুজ রঙের টেলিফোনটা জংলা ছাপের ওয়াল পেপারের সঙ্গে এমন মিশে গেছে যে বোঝা যাচ্ছিল না।
আমি জিনা।
উত্তেজিত গোপীনাথ বলল, জিনা, এখানে ভীষণ বিপদ। গুলি চলছে।
গুলি?
হ্যাঁ। আমি অল্পের জন্য বেঁচে গেছি। কিন্তু তোমার পাড়ার ছেলেদের কিছু হলে আমার লজ্জার সীমা থাকবে না।
জিনা শান্ত গলাতেই বলল, আমাদের এসব নিয়েই বাঁচতে হয়। তুমি ভেবো না।
না জিনা, আমি বেরিয়ে যাচ্ছি। এর চেয়ে মরা ভাল।
বীর হওয়ার চেষ্টা কোরো না। মন দিয়ে শোনো। আজ রাত বারোটা নাগাদ এয়ার ইন্ডিয়ার একটা ফ্লাইট রোম হয়ে দিল্লি যাবে। আমি তার একটা টিকিট জোগাড় করেছি।
ঈশ্বর! তুমি তো অসম্ভব সম্ভব করতে পারো।
আমার এক বন্ধু ট্রাভেল এজেন্ট। সে সাহায্য করেছে।
কিন্তু এয়ারপোর্টে যাব কী করে?
আমি তোমায় ঠিক বের করে আনব। অনেক গোপন পথ আছে। আমাদের পাড়াটা একটি পাক্কা গোলকধাঁধা।
জিনা, এ সময়ে তোমার পাড়ায় আসা বিপজ্জনক।
বিপদ কেটে যাবে। ভেবো না। অপেক্ষা করো।
জিনা লাইন কেটে দিল।
গোপীনাথ উঠে ঘরের মধ্যে একটু পায়চারি করল। তারপর গিয়ে জানালাটা ফাঁক করে গলিটা দেখল। সন্ধের আলোয় গলিটা ভুতুড়ে দেখাচ্ছে। কেউ কোথাও নেই।
গোপীনাথ মুন্ডু বের করে ভাল করে চারদিকটা দেখে নিল। মাফিয়ারা এত সহজে হাল ছাড়ার পাত্র কি?
দরজায় টোকা এবং জিনার মায়ের প্রবেশ, হাতে কফির কাপ।
একটু কফি খাও।
গোপীনাথ বলল, ধন্যবাদ। কফি না হলেও চলত।
তুমি নার্ভাস। কফি খেলে ভাল লাগবে। ওতে একটু ব্র্যান্ডি মেশানো আছে। খাও।
গোপীনাথ কফিতে চুমুক দিয়েই বুঝল, ভদ্রমহিলা জাতশিল্পী। ব্র্যান্ডি মেশানো কালো কফি কীভাবে করতে হয় তা দারুণ জানেন।
গোপীনাথ বলল, হ্যাঁ, আমি নার্ভাস। আমি আপনাদের খুব অসুবিধেয় ফেলেছি।
ভদ্রমহিলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, অসুবিধে কিছুই নয়। আমরা এরকম বিপদে প্রায়ই পড়ি। নিম্নবিত্ত ইতালিয়ানদের অবস্থা তুমি তো জানো না। আগে আমাদের কাছ থেকে তোলা আদায় করা হত। আন্তনিও সেসব বন্ধ করেছে।
আন্তনিও কে?
এ পাড়ার সে-ই মোড়ল। সে-ই সবাইকে এককাট্টা করে একটা বাহিনী গড়েছে। মাফিয়াবিরোধী গোষ্ঠী। হয়তো সে শেষ পর্যন্ত পেরে উঠবে না। কিন্তু একটু প্রতিরোধ তো হল। ইতালি শেষ হয়ে যাচ্ছে গুন্ডাবাজিতে।
জানি। আন্তনিওকে আমার নমস্কার জানাবেন।
আন্তনিও যদি সফল হয় তবে সারা রোমে এরকম প্রতিরোধ গড়ে উঠবে, দেখো।
তাই হোক।
আর আন্তনিও যদি মারা যায় তা হলে কী হবে বলা যায় না।
গোপীনাথ কফিটা শেষ করে বলল, উপায় থাকলে আমি আন্তনিওর দলে নাম লেখাতাম।
শুকনো মুখটা হাসিতে উদ্ভাসিত করে জিনার মা বলল, তোমাকে ধন্যবাদ। আন্তনিও শুনলে খুব খুশি হবে। জিনা কি তোমাকে ফোন করেছিল?
