ঈশ্বর! সে কোথায়?
এখানে নেই। একটু আগে বেরিয়ে গেছে।
মিথ্যে কথা।
বিশ্বাস করো। তবে সে বেশি দূর হয়তো যায়নি। আসবে।
আমরা অপেক্ষা করব। জিনার ঠিকানাটা দাও। তাড়াতাড়ি।
১৭.
কোনও মহিলাকে এত জোরে গাড়ি চালাতে আগে দেখেনি গোপীনাথ। বিশেষ করে রোমের কিছু অপ্রশস্ত রাস্তায়।
জিনা, তোমার সাহস আছে বটে, কিন্তু এটাই কি সাহস দেখানোর সময়?
জিনা একটা মোড় অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ফিরে গতি সামান্য কমাল। তারপর বলল, আমি বিপদের গন্ধ পাই।
সেটা কীরকম?
যখন গাড়িতে স্টার্ট দিচ্ছিলাম তখন হোটেলের চত্বরে তিনটে গাড়ি এসে থামল। একসঙ্গে প্রায় আট-দশজন লোক নেমে এল। তাদের মধ্যে একজন আমার গাড়িতে অত্যন্ত অভদ্রভাবে উঁকি দিয়েছিল।
কই, বলোনি তো?
তোমাকে ঘাবড়ে দিতে চাইনি।
ওরা কারা?
ওরা আর যাই হোক ভালমানুষ নয়। এদের একজনকে আমি চিনি। তার নাম বাসিলোঁ। অত্যন্ত ভয়ংকর লোক।
বাসিলোঁ?
নামটা শুনেছ?
আমি অনেকদিন রোমে বাস করছি। সুতরাং শুনতেই পারি। নামটা চেনা চেনা ঠেকছে।
একটা মাফিয়া দলের সর্দার গোছের। আমার সঙ্গে আলাপও হয়েছিল।
বন্ধুত্বও হয়েছিল কি?
জিনা ব্যথিত গলায় বলল, আমাদের যা জীবন তাতে কত কিছু হয়। না, লোকটা আমাকে ব্যবহার করেছিল বটে, কিন্তু বন্ধুত্ব হয়নি। শোনো গোপীনাথ, আমি গুন্ডা বদমাশদের একদম পছন্দ করি না।
হাঁ, কথাটা বোধহয় আগেও বলেছ।
আর সেইজন্যই অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে তোমাকে ওখান থেকে বের করে এনেছি।
গোপীনাথ সামান্য উদ্বেগের গলায় বলল, কিন্তু ওরা তো তোমার ঠিকানা জানে জিনা।
জানে। তবু আমার ঠিকানায় তুমি নিরাপদ। আমি যদি পাড়ার লোকদের বলে রাখি তবে তারা এমন ব্যবস্থা করবে, যাতে বাইরের কেউ ঢুকতে পারবে না। আমার পাড়াটায় আমারই নানা আত্মীয়স্বজনের বাস। আমরা খুবই আত্মীয়বৎসল।
জিনা ক্রমশ রোমের ঘিঞ্জি একটা এলাকায় ঢুকে পড়ছিল। সরু সরু গলি, বাচ্চারা খেলছে, বউ-ঝিরা গল্পসল্প করছে। রাস্তাটা যেন রাস্তা নয়, বৈঠকখানা। পথে ঝগড়াঝাটিও হচ্ছে কোথাও কোথাও।
জিনা যে পাড়ায় ঢুকল সেটা প্রায় দমবন্ধ করা একটা গলি। বহু পুরনো পাড়া, বাড়িগুলো যেন একটা আর-একটার ওপর ভর করে আছে।
নামো।
শোনো জিনা, তোমাদের বাড়িতে কি আমি অনভিপ্রেত লোক নই?
না। কারণ তুমি বিপন্ন। বিপন্ন মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে আমাদের পরিবারের সুনাম আছে।
গোপীনাথ নামল। জিনা গাড়িটা পথের পাশেই লক করে রেখে তাকে হাতে হাত ধরে নিয়ে চলল।
জিনাদের বাড়িটা আরও একটা গলির মধ্যে, যেখানে গাড়ি ঢুকবে না। বাড়িটা বেশ বড় এবং পুরনো। গলির পাথরে বাঁধানো রাস্তা থেকে সরাসরি বাড়ির সদর দরজায় উঠতে হয়, অনেকটা উত্তর কলকাতার গলিঘুজির মতোই।
দরজা খুলেছিল একজন বৃদ্ধা।
জিনা চাপা গলায় বলল, আমার পিসি। কথা বলার চেষ্টা কোরো না, বুড়ি কানে শোনে না।
তোমাদের কি যৌথ পরিবার?
না। আমরা মাত্রই কয়েকজন। ভাইরা বেশির ভাগই বিদেশে। আমি, মা, পিসি আর একজন কাকা।
তোমার বাবা?
বাবা নেই।
‘নেই’ কথাটার অনেক রকম মানে হয়। তবে গোপীনাথ আর বেশি জানতে চাইল না।
জিনা তাকে দোতলায় নিয়ে এল। একটা ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল, এই ঘরটাই আপাতত তোমার গাড্ডা। আমি বেরোচ্ছি তোমার টিকিটের ব্যবস্থা করতে। ইতিমধ্যে আমার মা তোমার দেখাশোনা করবে। তোমার কি খিদে পেয়েছে?
না। আমি একটু চোখ বুজে পড়ে থাকতে চাই।
বেশ কথা। শুয়ে থাকো। ভয় নেই, কোনও বিপদ হবে না। আমি পাড়ায় বলে যাচ্ছি।
জিনা বেরিয়ে এল। গোপীনাথ জুতোজোড়া খুলে রেখে বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। গভীর ক্লান্তি। অথচ ক্লান্তির কারণ নেই। গত দু’দিন সে কোনও পরিশ্রমের কাজই করেনি। তবে কি ভয় আর উদ্বেগই এই ক্লান্তির কারণ?
একটু বাদে দরজায় টোকা পড়ল। গোপীনাথ শক্ত হয়ে গেল হঠাৎ। চাপা গলায় বলল, ভিতরে আসুন।
খিটখিটে চেহারার এক বুড়ি ঢুকেই বলল, তুমি গোপীনাথ?
হ্যাঁ।
কী খাবে?
কিছু না।
কফি?
তারও দরকার নেই।
জিনা তোমার দেখাশোনা করতে বলে গেছে। আমি জিনার মা।
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
তোমার কি খুব বিপদ?
হ্যাঁ।
চিন্তা কোরো না। এখানে কিছু হবে না। তুমি নিরাপদ।
আপনাকে ধন্যবাদ।
ঘুমোও।
বুড়ি চলে গেল।
গোপীনাথ উঠে ঘরের ছোট জানালাটা দিয়ে গলিটা একটু দেখল। ডাইনে গলির মুখটায় কয়েকটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।
কৌতূহলী গোপীনাথ গরাদহীন জানালা দিয়ে আরও একটু ঝুঁকে ছেলেগুলোকে দেখার চেষ্টা করতে যেতেই হঠাৎ বাড়ির নীচে আড়াল থেকে একটা অল্পবয়সি ছেলে বেরিয়ে তার দিকে চেয়ে ইতালিয়ান ভাষায় বলল, ভিতরে যাও। একদম জানালায় থেকো না। ওরা আসছে।
কারা আসছে?
মাফিয়ারা।
গোপীনাথ কেঁপে উঠল। বলল, কী করে জানলে?
আমাদের লোক চারদিকে আছে।
আমার জন্য তোমাদের যদি বিপদ হয়?
আমরা বিপদ পছন্দ করি। তুমি দয়া করে জানালা দিয়ে মুন্ডুটা বের কোরো না।
গোপীনাথ ছেলেটাকে ভাল করে দেখল। বছর কুড়ির বেশি বয়স নয়। রোগা লম্বা চেহারা।
গোপীনাথ বলল, আমার জানা দরকার ওরা আসলে কারা।
বাসিলোঁকে চেনো?
নাম শুনেছি। বা
সিলোঁ আর বেনভেনুটি। সঙ্গে ওদের আরও লোক আছে।
ওদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র আছে। পারবে না।
আগ্নেয়াস্ত্র আমাদেরও আছে। তার চেয়েও বড় কথা, এ পাড়ায় ঢুকবার আগে ওদের দু’বার ভাবতে হবে।
