জিনা বেরিয়ে যাওয়ার পর খুব দ্রুত গোপীনাথ পোশাক পরে নিল। কফির ট্রে দরজার বাইরে রেখে ডোন্ট ডিস্টার্ব সাইন টাঙাল দরজায়। পাসপোর্ট এবং প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে বাতি নিবিয়ে পেছনের ফায়ার এসকেপের কাছে এসে দাঁড়াল।
আধঘণ্টা সময় যে কতটা সময় তার কোনও ঠিক নেই। এক-এক পরিস্থিতিতে আধঘন্টা পাঁচ মিনিটের মতো আচরণ করে, এক-এক সময় পাঁচ ঘণ্টার মতো, এখন পাঁচ ঘণ্টার মতো লাগছে।
একজন অচেনা মেয়ের কাছে নিজেকে এতটা সমর্পণ করে কি বোকামি করছে না গোপীনাথ? এটা হয়তো এদেরই তৈরি করা ফাঁদ! গোপীনাথের এখানে তবু একটু নিরাপত্তা ছিল, এরপর কী হবে কে জানে! তবে তার তো জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ। বেশি আর কী-ই বা হতে পারে?
ফায়ার এসকেপটা লাথি মেরে খুলে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল গোপীনাথ।
গলির মুখে কিছুক্ষণ দাঁড়াতে হল তাকে। তারপর ডানপ্রান্ত দিয়ে একটা আলো নেবানো ছোট্ট গাড়ি মুখ ঢোকাল গলিতে। স্ট্রিট লাইটের আলোয় লাল রংটা বোঝা গেল।
সামনে এসে গাড়িটা দাঁড়াতেই দরজা খুলে জিনা বলল, উঠে পড়ো, কেউ এখন হোটেলে নেই।
গোপীনাথ উঠে পড়ে বলল, দাতা কোথায়?
খোঁজ নিয়ে জানলাম, যে একটা জরুরি টেলিফোন পেয়ে একটু আগেই বেরিয়ে গেছে।
গোপীনাথ ব্যাগটা পিছনের সিটে রেখে সামনের সিটে জিনার পাশে উঠে বসল। জিনা গাড়ি ছাড়ল।
.
আর ঠিক এসময়ে গোপীনাথের হোটেলের ঘরের দরজাটা কেউ লাথি মেরে খুলে ফেলল। ঘরে ঢুকল দু’জন। তাদের একজন বেনভেনুটি, অন্যজন বাসিলোঁ, দু’জনের হাতেই পিস্তল। চারদিক দেখে নিয়ে বাসিলোঁ বলল, বেনভেনুটি, আমাদের কপাল নিতান্তই খারাপ দেখছি।
বেনভেনুটি বাথরুমে উঁকি মেরে দেখছিল। বলল, কপাল খারাপ বললে তো হবে না বাসিলোঁ, লোকটাকে খুঁজে পাওয়া না গেলে আমাদের কী হবে তা ভেবে দেখেছ?
দেখেছি, কিন্তু ভাবতে চাই না।
আর এসবের জন্য দায়ী তুমি বাসিলোঁ। মেয়েছেলে দেখলেই তুমি এমন চঞ্চল হয়ে ওঠো যে, কাণ্ডজ্ঞান থাকে না, মেয়েটার সঙ্গে খুনসুটি করতে না গেলে সেদিন চিড়িয়া উড়ে যেতে পারত না।
ভুল বেনভেনুটি, তোমার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। ওদের একটা পরিকল্পনা কার্যকর না হলে আর একটা হতই, আমরা ওদের প্রথম কৌশলটারই শিকার হয়ে গিয়েছিলাম।
বেনভেনুটি ভ্রু কুঁচকে বলল, এখন কী করবে?
অন্য ঘরগুলো খুঁজে দেখব। হোটেলটা তছনছ করব।
দাঁড়াও। ফায়ার এসকেপটা দেখো।
কী দেখব?
ফায়ার এসকেপটা খোলা রয়েছে।
ঈশ্বর! বলে বাসিলোঁ এগিয়ে গেল। ফায়ার এসকেপ খুলে নীচের দিকে চেয়ে বলল, পরিশ্রম অনেকটাই বেঁচে গেল মনে হচ্ছে। হোটেলটা আর তছনছ করতে হবে না। আমাদের পাখি এদিক দিয়েই পালিয়েছে।
অথবা তাকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
একই কথা বেনভেনুটি। আমাদের গর্দান যূপকাষ্ঠেই রয়ে গেল। এসো বেনভেনুটি, তলাটা একটু ঘুরে দেখে আসি।
দু’জনে নীচে নামল। গলির মধ্যে পা রেখে বাতাস শুকে বাসিলোঁ বলল, বেনভেনুটি, পেট্রোলের গন্ধ পাচ্ছ? এই গলি দিয়ে সচরাচর গাড়ি চলাচল করে না। সুতরাং আমাদের পাখিটির জন্য কিছুক্ষণ আগেই এখানে গাড়ি ঢোকানোর ব্যবস্থা হয়েছিল। গলিটা সরু তাই নিশ্চয়ই কোনও ছোট গাড়ি।
তুমি পুলিশে চাকরি করলে পাকা ডিটেকটিভ হতে।
ডিটেকটিভরা বড্ড গরিব হয় বেনভেনুটি। তুমি নিশ্চয়ই চাও না, আমি দরিদ্রের জীবন যাপন করি।
কিন্তু শ্রীযুক্ত গোপীনাথ বসুকে খুঁজে বের না করতে পারলে আমাদের দুজনকেই হয়তো ভিক্ষে করতে হবে।
না বেনভেনুটি, না। দলে নতুন এসেছ, তাই জানোনা। ভিখিরি হয়েও যদি বেঁচে থাকতে পারো তো সেটা পরম সৌভাগ্য। লোকটা যদি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে তা হলে আমাদের দু’জনকেই গুলি করে টাইবারের জলে ফেলে দেওয়া হবে।
ঈশ্বর! তা হলে কিছু করো বাসিলোঁ।
হ্যাঁ। করতেই তো আসা। আপাতত চলল, ম্যানেজারকে আরও একটু কড়কানো যাক।
দু’জনেই ফিরে এল ফায়ার এসকেপ দিয়ে। আবার চারদিক দেখে নিল। তারপর নেমে এল একতলায়। যেখানে তাদের দলের আরও জনাপাঁচেক পেশাদার গুন্ডা ম্যানেজারের ঘরে এবং দরজায় পাহারা দিচ্ছে। রেস্টুরেন্টের দিক থেকে নাচগানের শব্দ এবং কিছু হল্লা আসছে।
ভীত ইতালিয়ান ম্যানেজার সাদা মুখে নিজের চেয়ারে বসে ছিল।
বাসিলোঁ মৃদু গলায় বলল, গোপীনাথ বোস তার ঘরে নেই।
আ-আমি জানি না।
না জানলে কি চলে? এত মাননীয় দামি একজন অতিথির খবর রাখো না, তুমি কেমন ম্যানেজার?
বিশ্বাস করো, তার এখন ঘরেই থাকার কথা। একটু আগে জিনা তাকে সেবা করতে গিয়েছিল। দু’ঘণ্টা ছিলও তার ঘরে। একটু আগেই জিনা নেমে এল।
জিনা কে?
স্ট্রিপটিজ করে।
বাঃ। তা হলে অতিথির জন্য আপ্যায়নের ব্যবস্থা ভালই ছিল।
হ্যাঁ, জিনা এসে বলল অতিথি ভাল আছে।
জিনা কি রোজ গোপীনাথের কাছে যেত?
না। আজই প্রথম।
অন্যান্য দিন কারা যেত?
কেউ না, উনি বোধহয় খুব একটা সেক্সি নন।
তা হলে আজ হঠাৎ জিনাকে দরকার হল কেন?
আ-আমি জানি না।
তা হলে কে জানে?
একজন লোক জিনাকে যেতে বলেছিল।
লোকটা কে?
আমি চিনি না। তবে তাকে দাতা বলে কেউ কেউ ডাকছিল।
বাসিলোঁর ভ্রু কুঁচকে গেল, দাতা! কোন দাতা?
তা জানি না।
রিভলভারটা ম্যানেজারের দিকে আলগোছে তুলে বাসিলোঁ বলল, ব্যাপারটা গুরুতর। বলো।
ম্যানেজার তোতলাতে তোতলাতে বলল, ভিকিজ মব-এর সর্দার।
