কফি খেতে খেতে মেয়েটা বলল, কী কথা বলতে চাও?
প্রথমে জানতে চাই তোমার নাম কী?
আমার নাম জিনা।
তুমি কি কল গার্ল? খানিকটা তাই। তবে আমি চাকরিও করি।
পুরুষদের খুশি করে বেড়াতে কি পছন্দ করো?
মেয়েটার মধ্যে হঠাৎ যেন সব চঞ্চলতা থেমে গেছে। কফির কাপটা ঠোঁটের কাছে ধরে একটু ভেবে বলল, তুমি আমাকে নীতি উপদেশ দেবে না তো!
না, ওসব আমার আসে না।
খুব ভাল। কারণ ওসব আমি মানি না। যা খুশি করি।
সবাই আজকাল তাই করে। আজকালকার মানুষ কিছু মানার ধার ধারে না।
আমরা একটা ছোট্ট জীবন পেয়েছি আর চারদিকের এই পৃথিবী, জীবনটা যতদূর পারি ভরে নেওয়াই তো ভাল।
ঠিক কথা। জীবনটা যদি ভরে নেওয়া যায় তা হলে আপত্তি কীসের? আমি জানতে চাই তুমি কি এই হোটেলেই চাকরি করো?
হ্যাঁ।
কী চাকরি?
স্ট্রিপ ড্যান্স।
দাতা কে জানো?
মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে বলল, দাতা! দাতা আবার কে?
একজন ভারতীয়, আমার মতোই।
না, আমি লুইজির বান্ধবী।
লুইজি কি এই হোটেলের মালিক?
ওর কাকা মালিক।
লুইজির বোনকে চেনো?
চিনি, কেন বলো তো!
না, আমি একটা প্যাটার্ন বুনবার চেষ্টা করছি।
কীসের প্যাটার্ন?
নানা ঘটনাবলির।
কীরকম ঘটনা?
একে বেশি কিছু বলে লাভ নেই, জানে গোপীনাথ, তবু কাউকে তার কিছু বলতে ইচ্ছে করছিল। সে বলল, তুমি কি সাহসী মেয়ে?
তাই তো জানি।
তা হলে তোমাকে বলা যায়। শুনবে?
শুনব।
গোপীনাথ একটু ভেবে তার কাহিনিটা ছাঁটকাট করে বেশ সংক্ষেপে বলল। তারপর জিজ্ঞেস করল, আমি যাদের হেপাজতে রয়েছি তারা কেমন লোক তা কি তুমি জানো জিনা?
জিনা কফির শূন্য কাপটা ট্রে-তে রেখে বলল, এক কথায় এ প্রশ্নের জবাব হয় না। তবে লুইজি ভাল ছেলে। ওর কাকা হোটেল চালায় বলে গুন্ডা বদমাশ এবং সন্দেহজনক লোকদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। তবু বলতেই হবে এমপ্লয়ার হিসেবে লোকটা তেমন খারাপ নয়।
আমি লুসিলের কথা জানতে চাই।
লুসিল! না তার কথা আমি তেমন কিছু জানি না। লুইজির কাছে শুনেছি তার বোন লুসিল প্যারিসে থাকে।
এই হোটেলে কোনও মাফিয়া বা গুন্ডার দলের নজর আছে কি না জানো?
তারা তো সব জায়গাতেই আছে।
আমি একটু স্পেসিফিক হতে চাইছিলাম।
মেয়েটি মাথা নেড়ে বলল, এই হোটেলে সন্ধ্যায় আমাকে কয়েক ঘণ্টা কাটাতে হয়। কত লোক আসে! নাচঘর তখন অন্ধকার থাকে।
ঠিক কথা, তুমি আমাকে অনেক কথাই বলেছ। আলাপ করে খুশিই হলাম।
তার মানে তুমি কি আমাকে এখন চলে যেতে বলছ?
তা নয়। তবে আমার যেটুকু জানার ছিল জেনেছি।
শোনো পণ্ডিত মানুষ, তোমার মুখখানা আমার খারাপ লাগছে না। তুমি সেক্সি না হতে পারো, কিন্তু বর্বর নও।
ধন্যবাদ।
আমার কথা শেষ হয়নি।
তা হলে বলো।
আমি মাফিয়া এবং গুন্ডা বদমাশদের ঘেন্না করি।
খুব ভাল।
তুমি যে একটা বিপদের মধ্যে রয়েছ তা আমি বিশ্বাস করছি। তোমার মুখে উদ্বেগটা প্রকাশ পাচ্ছে।
গোপীনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমি মিথ্যে কথা সহজে বলি না।
শোনো, তোমাকে আমি সাহায্য করতে চাই।
কীভাবে সাহায্য করবে?
মেয়েটা একটু ভেবে বলল, আমি তোমার নিরাপত্তার কোনও নিশ্চয়তা দিতে পারি না।
সেটা জানি।
তবু তোমাকে আমি এখান থেকে পালাতে সাহায্য করতে পারি। শুধু তাই নয়, আমাদের পরিবারে তুমি দু’-একদিন আশ্রয়ও পাবে। যদি ইচ্ছে করো।
তারপর?
তারপর তোমার যা ইচ্ছে।
গোপীনাথ একটু চুপ করে থেকে বলল, ভিকিজ মব বা মাফিয়াদের হাত খুবই লম্বা। তারা যেখানেই হোক আমার নাগাল পাবেই।
সেটা ঠিক কথা।
তবু আমি এই জোন থেকে বেরিয়ে পড়তে চাই।
কোথায় যাবে?
কলকাতায়।
তোমার কাছে ভাড়ার টাকা আছে?
না, তবে আমার কাছে চেকবই আছে। কিন্তু আমি টাকা তুলতে গেলেই ধরা পড়ে যেতে পারি।
টাকাটা যদি আমি তোমাকে ধার দিই?
ধন্যবাদ, কিন্তু ব্যাঙ্কে টাকা থাকতে ধার করার মানেই হয় না।
হয়। টাকাটা এখনই তোলার দরকার নেই। চেকটা তুমি আমাকে দিয়ো। তুমি নিরাপদে দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর আমি আমার ব্যাঙ্কের সাহায্যে টাকাটা তুলে নেব।
বাঃ। চমৎকার। আমাকে তোমার বিশ্বাস হচ্ছে তো?
হচ্ছে। আমি তোমাকে সাহায্য করতে চাই। এখন সবচেয়ে বেশি গুরুতর ব্যাপার হল, তোমাকে এই হোটেল থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া।
কীভাবে সেটা সম্ভব? আমি যতদূর জানি ভিকিজ মব-এর একজন এজেন্ট হল দাতা, অন্যজন লুসিল এবং হয়তো লুইজিও।
দাতাকে আমি চিনি না। তবে লুসিল এখন নিউ ইয়র্কে। লুইজি বার্সিলোনায়। দাতা সম্পর্কে খোঁজ নিতে হবে।
নাও।
কীরকম দেখতে সে?
লম্বাচওড়া এবং সুপুরুষ। চেহারায় একটা নিষ্ঠুরতা আছে। এবং খুবই বিস্ময়ের কথা, তোমাকে সেই আমার কাছে পাঠিয়েছে।
মেয়েটা অবাক হয়ে বলে, আমাকে তোমার কাছে আসতে বলেছে এই হোটেলের ম্যানেজার নিনো। সে ভারতীয় নয়, ইতালিয়ান।
তা হলেও পিছনে দাতা আছে।
মেয়েটা উঠে পড়ল, বলল, ভেবো না, আমি খোঁজ নিয়ে আসছি। তুমি তৈরি থেকো। এই হোটেলের ফায়ার এসকেপ দিয়ে নামলে পিছনে একটা সরু গলি পাবে। আমার গাড়িটা ছোট, থ্যাবড়া আর লাল রঙের। ফিয়াট। যদি রাস্তা পরিষ্কার থাকে তা হলে আধঘণ্টা বাদে আমি গাড়ি নিয়ে গলিতে অপেক্ষা করব।
গোপীনাথ সামান্য উদ্বেগের গলায় বলল, তোমার এতে কোনও বিপদ নেই তো!
না। তোমার সঙ্গে আমার দু’ঘণ্টা থাকার কথা। দু’ঘণ্টা পার হয়েছে। এখন চলে গেলে কারও সন্দেহ হওয়ার কিছু নেই। হলেও ভয় পেয়ো না। আমি যেখানে থাকি সেটা রোমের একটা ঘিঞ্জি পাড়া। বাইরের লোক ঢুকে সুবিধে করতে পারবে না, আমরা জোট বেঁধে থাকি।
