আমরা কি কিছু করতে পারি না মৈত্রেয়ী?
কী করবে?
রোজমারি বলল, এই কারখানা নিয়েই নাকি নানারকম খেলা চলছে।
কীরকম খেলা?
খুব একটা ভেঙে বলল না। তোমার কি মনে আছে রোজমারিকে কিছুদিন আগে একগোছা লাল গোলাপ পাঠানো হয়েছিল!
কেন থাকবে না? খুব মনে আছে।
ট্যাগে লেখা ছিল আর আই পি, খ্রিস্টানদের কবরে লেখা থাকে।
তাও জানি।
ব্যাপারটা বেশ সিরিয়াস মৈত্রেয়ী।
হলেও তোমার কিন্তু কিছু করার নেই শুভ।
.
শুভ ঘর থেকে বেরিয়ে আসার পরই রোজমারি ফোন তুলে একটা নম্বর ডায়াল করল।
ওপাশ থেকে একটা মোলায়েম গলা বলল, লুলু হিয়ার।
রোজমারি জার্মান ভাষায় বলে, বোকামিটা কেন করলে?
জার্মান ভাষাতেই জবাব এল, বোকামি করিনি। শেষ অবধি ছেলেটাকে ঝেড়ে ফেলেছি।
সেটা কথা নয়। তোমার চলাফেরা এবং হাবভাবই তোমাকে ধরিয়ে দিচ্ছে। তোমার আরও অনেক ট্রেনিং বাকি।
আসলে তোমার সঙ্গে একই ফ্লাইটে যাওয়া এবং আসাটাই একটা বোকামি হয়েছে। কিন্তু ইদানীং আমি তোমার নিরাপত্তা নিয়ে একটু চিন্তিত বলেই একই ফ্লাইটে যাই আসি।
বুঝলাম, কিন্তু ধরা পড়ে গেছ। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে তোমাকে শেষ অবধি ট্রেস করতে পারেনি।
এর পর থেকে আমি আরও একটু সতর্ক হব রোজমারি।
ছেলেটা তোমার মুখ মনে রেখেছে। কাজেই তুমি আমার অফিসে কখনও আসবে না।
না। আর কিছু?
আপাতত কিছু নয়, পরে কথা হবে।
রোজমারি ফোনটা রেখে দিল।
ভ্রু কুঁচকে চিন্তিত রোজমারি কিছুক্ষণ ফাঁকা ঘরে পায়চারি করল, তারপর মনোজকে ফোন করল।
মনোজ, কী খবর?
কোনও খবর নেই। গোপীনাথ বসু অদৃশ্য হয়ে গেছে।
আমাদের সায়েন্টিস্ট কী বলছে?
না, কোনও পথ দেখাতে পারছে না।
তা হলে?
অপেক্ষা করা ছাড়া পথ দেখছি না।
আমি কি একটু রোমে যাব?
যেতে পারো, কিন্তু কী লাভ হবে?
তা জানি না, কিন্তু এভাবে অনিশ্চয়তা নিয়েও তো থাকা যায় না। আমার টেনশন হচ্ছে।
টেনশন, টেনশনের কী আছে? গোপীনাথ বসু যদি বেঁচে থাকে তবে একদিন যোগাযোগ করতে পারব।
তুমি কি সোনালিকে একটু ট্যাপ করছ?
ও বাবা, তাতে উলটো ফল হয়েছে। কিন্তু সুব্রত গোপীনাথের খুব কাছের লোক। পারলে সে-ই সাহায্য করবে।
.
যাকে নিয়ে কথা হচ্ছিল সেই গোপীনাথ বসুর অবস্থা গৃহবন্দির মতোই। ঘর থেকে বেরোনোর উপায় নেই। টেলিফোনে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। শুয়ে বসে সময় কাটানোর ধাত তার নয়। ফলে ক্রমে ক্রমে সে ধৈর্য হারিয়ে ফেলছিল।
মজা হল, দ্বিতীয় রাতেই তার কাছে ফোন করে একজন গম্ভীর গলার মানুষ জানতে চাইল, তার বান্ধবীর দরকার আছে কি না।
গোপীনাথ অবাক হয়ে বলল, বান্ধবী! হঠাৎ একথা কেন?
টেনশন কাটাতে বান্ধবী খুব সাহায্য করে।
গোপীনাথের মনে হল ফোনটা করছে ওই দাতা, অর্থাৎ বাঙালি মস্তানটি, যদিও কথা বলছিল ইতালিয়ানে। ফোন বলতে ইন্টারকম। তার মানে লোকটা এখন এই হোটেলেই আছে।
গোপীনাথ বলল, আমার বান্ধবীর দরকার হয় না।
আপনি হোমোসেক্সুয়াল নন তো?
না, এ প্রশ্নই বা কেন?
আপনার সব খবর আমাদের জানা নেই বলে, ভয় পাবেন না, বান্ধবীটি কিন্তু অন্য কোনও মতলবে যাবে না, শুধুই সঙ্গ দেবে।
গোপীনাথ একটু দ্বিধায় পড়ে বলল, পাঠিয়ে দিন।
বান্ধবী এল দশ মিনিট বাদে। তাকে দেখে চমকে গেল গোপীনাথ। বছর পচিশ-ছাব্বিশ বয়সের চাবুক চেহারার একটি ইতালিয়ান মেয়ে। জিপসিদের ধরনের পোশাক পরা। মাথায় একটা ধাতুর তৈরি সাপের মুকুট।
কটাক্ষ এবং লোল হাসির পর মেয়েটি বলল, পছন্দ?
হ্যাঁ।
ড্রিঙ্কস?
না।
তুমি ড্রিঙ্ক করো না?
না, আমার অভ্যাস নেই।
তা হলে সন্ধেটা কাটাবে কী করে?
আমরা কথা বলতে তো পারি? কথা,
কথা দিয়ে সময় কাটানো যায় নাকি?
যায় না?
কিছু অ্যাকশনও তো দরকার, নাচলে কেমন হয়?
আমি নাচ জানি না।
তুমি কি পণ্ডিত লোক?
গোপীনাথ হাসল, পণ্ডিতরাও ফুর্তি করে। আমি আসলে ফুর্তিবাজ নই।
তুমি কেমন?
সেটা তুমিই আজ আবিষ্কার করো।
মেয়েটা তার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, বাঃ, এই তো সুন্দর কথা, আমি আজ তোমার ভিতরে আগুন জ্বালিয়ে দেব। তুমি নিজেকে চিনতেই পারবে না।
তথাস্তু।
১৬-২০. গোপীনাথের ভিতরে আগুন
না, গোপীনাথের ভিতরে কোনও আগুনই জ্বলল না, মেয়েটি কিছু ছলাকলা শুরু করতেই গোপীনাথ হঠাৎ খুব ঠান্ডা গলায় বলল, ক্ষান্ত হও, বৃথা পরিশ্রম কোরো না।
মেয়েটা থমকে গিয়ে বলল, কেন? আমি যথেষ্ট আকর্ষক নই?
নিশ্চয়ই, তবু ক্ষান্ত হও, আমি পরিশ্রান্ত, উদ্বিগ্ন এবং খানিকটা ভীত একজন মানুষ। এখন কোনও সুন্দরী মহিলার ঘনিষ্ঠ সাহচর্য আমি উপভোগ করতে পারছি না।
মেয়েটা একটু হেসে বলল, মানুষ তো ওসব কাটানোর জন্যই মেয়েদের চায়। গোপীনাথ মেয়েটার দিকে চেয়ে বলল, তুমি কি জানো সেক্সের মধ্যে কতটা শরীর আর কতটা মন?
মেয়েটা বলল, সেক্স তো শরীর মাত্র।
গোপীনাথ মাথা নেড়ে বলল, সকলের কাছে নয়। আমার কাছে সেক্স-এর অর্ধেক মন আর অর্ধেক শরীর।
তুমি বোধহয় জ্ঞানী লোক।
না, তবে আমি একজন মনোযোগী ছাত্র।
তুমি কী চাও বলো তো!
আপাতত আমি তোমার সঙ্গে বসে কফি খেতে খেতে একটু কথা বলতে চাই।
মেয়েটা মুখোমুখি সোফায় বসে বলল, তবে তাই হোক।
গোপীনাথ ইন্টারকমে কফির অর্ডার দিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। এই হোটেলের রুম সার্ভিস খুবই ভাল, ঠিক সাত মিনিটের মাথায় একজন বেয়ারা এসে কফির ট্রে নামিয়ে রেখে চলে গেল।
