প্রায় চল্লিশ মিনিট ঘোরাঘুরি করার পর হতাশ হয়ে নেমে এল সে। একজন দোকানদারকে জিজ্ঞেস করে বাড়িটার নম্বর শুধু টুকে নিল সে। যদিও বুঝতে পারল, নম্বর নিয়ে কোনও লাভ নেই, এই বিশাল বাড়িতে অচেনা একটা লোককে খুঁজে বের করা খড়ের গাদায় উঁচ খোঁজার মতো ব্যাপার।
হতাশ হয়ে বেরিয়ে এসে সে হাঁটতে হাঁটতে মোটরবাইকের কাছে ফিরে এল। ভাগ্য ভাল ইতিমধ্যে মোটরবাইকটা চুরি হয়ে যায়নি। নতুন কেনা মোটরবাইকটাকে নিয়ে সর্বদাই তার দুশ্চিন্তা থাকে।
যখন অফিসে ফিরে এল শুভ তখন তিনটে বেজে গেছে। তাকে দেখে মৈত্রেয়ী চোখ বড় বড় করে বলল, আর আধ ঘণ্টা দেরি হলেই পুলিশে খবর দেওয়া হত। রোজমারি তোমার ওপর খুব রেগে আছে ওরকম রিস্ক নিয়েছ বলে।
শুভ অপ্রতিভ হয়ে বলল, তুমি কি রোজমারিকে সব বলে দিয়েছ নাকি?
না বলে উপায় ছিল? কী অ্যাডভেঞ্চার করে এলে?
শুভ মাথা নেড়ে বলল, কলকাতা শহরটা ফলোটলো করার পক্ষে একদম স্যুটেবল নয়, লোকটা বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটে একটা বিরাট বাড়িতে ঢুকে হারিয়ে গেল।
তুমি যে ফলো করছিলে তা টের পেয়েছিল?
না, বোধহয় না।
এখন যাও, রোজমারি তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।
বকাঝকা করবে নাকি?
করতেও পারে, যাও।
শুভ কাঁধ ঝাঁকাল, বলল, আমি তো ওর ভালই করতে চেয়েছিলাম।
মৈত্রেয়ী একটু হেসে বলল, তা হলে ভয় পাচ্ছ কেন?
রোজমারি একতলার বাঁ হাতি উইং-এ বসে। তার এলাকাটা খুব সাজানো গোছানো। শুভ আর মৈত্রেয়ীর বসার জায়গা উইংটার মুখে। রোজমারির ঘরখানা একটু তফাতে, মাঝখানে একটা কনফারেন্স রুম আছে।
বিনা অনুমতিতে রোজমারির ঘরে ঢোকা বারণ। বাইরে একজন বেয়ারা মোতায়েন রয়েছে। ভিতরে খবর পাঠিয়ে একটু অপেক্ষা করতে হল শুভকে৷ মিনিট তিনেক বাদে বাইরের দরজার মাথায় সবুজ আলোটা দু’বার জ্বলে নিবে গেল।
দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল শুভ। যাকে খুশিয়াল ঘর বলে রোজমারির ঘরখানা তাই। চার দেওয়ালে সিলিং থেকে মেঝে অবধি চিত্রিত মাদুরের ঢাকনা। সিলিং-এ চমৎকার বাঁশের কাজ, বাঁশের তৈরি ঝাড়বাতি আছে। বাঁশ আর মাদুরের কাজের জন্য ত্রিপুরা থেকে কারিগর আনানো হয়েছিল। মেঝেতে কার্পেট পাতেনি রোজমারি। খুব সুন্দর নরম রঙের নকশাদার টাইলস বসানো হয়েছে। রোজমারির কাজের টেবিলটাও তিন ভাগে বিভক্ত এবং ডিজাইন প্রায় ফিউচারিস্টিক। আসবাব বিশেষ নেই। একধারে, হাতের নাগালে একটি স্ট্যান্ডের ওপর খুব দামি একটা বিদেশি কম্পিউটার বসানো। পাঁচখানা টেলিফোন আছে রোজমারির। শুভ যখন ঢুকল তখন রোজমারি কারও সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলছিল। শুভকে ইঙ্গিতে বসতে বলে আরও কিছুক্ষণ কথা বলল রোজমারি। তারপর টেলিফোন রেখে শুভর দিকে কৃত্রিম ভ্রুকুটি করে বলল, তারপর, কোন অ্যাডভেঞ্চারে গিয়েছিলে?
আমি লোকটার কথা আপনাকে আগেও বলেছি। লোকটা প্রতিবার আপনার ফ্লাইটে সিঙ্গাপুর যায় এবং আসে।
রোজমারি মাথা নেড়ে বলল, তাতে কী হয়েছে?
আমি লোকটাকে ট্রেস করার চেষ্টা করেছিলাম।
তুমি আমাকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছ বলে ধন্যবাদ। তুমি সত্যিই একটি ভাল ছেলে। কিন্তু আমাদের বিপদটা মনে হয় আরও গভীর। আর শত্রুও বোধহয় অনেক কঠিন।
শুভ একটু অবাক হয়ে বলল, একথা কেন বলছেন?
রোজমারি একটা বড় শ্বাস ফেলে বলল, তুমি কি আমাদের কারখানাটির সম্পর্কে সব জানো?
শুভ মাথা নেড়ে বলল, না, আমি তো বৈজ্ঞানিক নই। তবে জানি যে, এটা খুবই আধুনিক কারখানা, ভারতবর্ষে কেন, এশিয়াতেও এরকম অত্যাধুনিক কারখানা নেই।
ঠিক তাই। আর আমাদের প্রোডাকশনটাও আংশিক একচেটিয়া ব্যাবসা করছে। ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্ট বাড়িয়ে দিলে শতকরা মুনাফা কোথায় পৌঁছোবে তার ঠিক নেই। কারণ পৃথিবীতেও এরকম কারখানা বেশি নেই। কিন্তু আমরা যে ব্যাবসাটা করছি তা অনেকেই ভাল চোখে দেখছে না। প্রথমে এটা আমাদের কাছ থেকে কিনে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। এখন চেষ্টা হচ্ছে কেড়ে নেওয়ার, ভয় দেখিয়ে।
কিন্তু কেন?
সেইটে আমরা এখনও বুঝতে পারছি না।
শুভ কিছুক্ষণ ভেবে বলল, তা হলে এখন কী করবেন?
ভাবছি।
পুলিশকে জানালে হয় না?
পুলিশকে জানালে একটা কংক্রিট অভিযোগ করতে হয়। আমরা সেটা করতে পারছি না। আমাদের হাতে যথেষ্ট প্রমাণ এবং তথ্য নেই। পুলিশকে জানালে তারা বড়জোর কিছুদিন কারখানা বা আমাদের বাড়ি পাহারা দেবে। কিন্তু তাতে তো লাভ নেই।
কেন নেই?
রোজমারি হেসে বলল, এই লড়াইটা অর্থনৈতিক লড়াই। এই লড়াইয়ে পুলিশের ভূমিকা নেই।
শুভ খুব আন্তরিকতার সঙ্গে বলল, ম্যাডাম, আমার এক কাকা লালবাজারের গোয়েন্দা, তিনি সাহায্য করতে পারেন।
তোমাকে ধন্যবাদ শুভ। আমার মনে হয় তোমার কাকা এ ব্যাপারে আমাদের সাহায্য করতে পারবেন না। তবু তিনি যদি কিছু মনে না করেন, তা হলে আমাদের পরামর্শ দিতে পারেন।
শুভর মনটা খারাপ লাগছিল। সে ভারাক্রান্ত মনে বেরিয়ে এল। রোজমারিকে সে নিজের মতো করে পছন্দ করে। রোজমারি অনেকটা তার দিদির মতো। স্নেহশীলা এবং প্রশ্রয়দাত্রী।
তাকে বেরিয়ে আসতে দেখে মৈত্রেয়ী জিজ্ঞাসু চোখে চেয়ে বলল, কী হল?
কিছুই নয়।
তোমাকে বকেননি তো!
না। তবে রোজমারি বিপদের মধ্যে আছে বলে মনে হল।
তোমাকে তো বলেইছি বড়লোকদের সবসময়েই বিপদ, তুমি কেন মাথা ঘামাচ্ছ?
