প্রয়োজন হলে। যদি দেখি, ওকে নিতে কোনও গাড়ি এসেছে তা হলে ফলো করব না। গাড়ির নম্বরটা টুকে নেব। পরে ট্রেস করা যাবে।
ট্যাক্সি নিলে?
অবশ্যই পিছু নেব।
কিন্তু তার আগে রোজমারিকে একবার জিজ্ঞেস করে নেওয়া ভাল, লোকটাকে সে চেনে কি না।
করেছি।
করেছ? কবে?
এর আগের বার। জিজ্ঞেস করেছিলাম এরকম ড্রেসক্রিপশনের কোনও লোককে সে চেনে কি না। রোজমারি আকাশ থেকে পড়ল। তুমি কি একটু টেনশন করছ আমি লোকটার পিছু নেব বলে?
মৈত্রেয়ী বলল, হ্যাঁ। রিস্ক নেওয়ার দরকারটা কী বুঝছি না।
এসব পরে বোঝা যাবে।
হঠাৎ শিউশরণ মুখ ঘুরিয়ে বলল, হাওয়াই জাহাজ নামছে।
মৈত্রেয়ী শুভ ব্যস্ত হল না। তারা জানে প্লেন নামলেও কাস্টমস ইমিগ্রেশন ইত্যাদিতে আধ ঘণ্টা-চল্লিশ মিনিট কম করেও লাগবে। ধীরেসুস্থে নেমে তারা যখন টার্মিনালের দরজার বাইরে দাঁড়াল তখন খাড়া দুপুর। বাইরে থেকেই দেখা যাচ্ছিল, সিঙ্গাপুর ফ্লাইটের যাত্রীরা ইমিগ্রেশনে জড়ো হচ্ছে এসে। তবে এত দূর থেকে কাউকে চেনা যাচ্ছিল না।
হঠাৎ শুভ বলল, মৈত্রেয়ী, ওই যে বক্কেশ্বর!
মৈত্রেয়ী চমকে উঠে বলল, কোথায়? আসছে। ওর কোনও মালপত্র নেই, শুধু একটা ছোট ব্যাগ। ও আগে বেরিয়ে যাবে। তুমি রোজমারির জন্য থাকো।
দাঁড়াও, দাঁড়াও, রোজমারি তোমাকে খুঁজবে যে! তিনটে বড় বড় সুটকেস আসছে, কে টানবে বাবা?
পোর্টার আছে। আমার সময় হবে না আজ।
টার্মিনালের গেট দিয়ে যে-লোকটা বেরিয়ে এল সে একটু বেঁটে সন্দেহ নেই, কিন্তু ফরসা টকটকে গায়ের রং। চুলগুলো একটু লালচে, মোটা লালচে গোঁফ। চোখে মুখে বুদ্ধির দীপ্তি আছে। ঝকঝকে ত্রিশ-বত্রিশ বছরের যুবক। পরনে জিন্স ও মেরুন রঙের টি শার্ট। লোকটা বেরিয়ে আসার পথে প্রি-পেইড ট্যাক্সি বুথে থেমে ট্যাক্সি বুক করল।
শুভ বলল, সরি মৈত্রেয়ী, আমাকে যেতেই হচ্ছে।
ওয়াইল্ড গুজ চেজ।
বোধহয় ব্যাপারটা ততটা কো-ইনসিডেন্স নয়। এনিওয়ে, গুডবাই…
কিন্তু রোজমারিকে কী বলব?
সত্যি কথাই বোলো। শি উইল আন্ডারস্ট্যান্ড।
শুভ একরকম দৌড়ে গিয়ে তার মোটরবাইকে চেপে বসল। হেলমেট মাথায় বসিয়ে বাইক স্টার্ট দিল। ওদিকে বঙ্কেশ্বর ট্যাক্সির লাইন ধরে গিয়ে উদ্দিষ্ট গাড়িটার কাছে পৌঁছে গেল। বেশ ধীর-স্থির হাবভাব। মৈত্রেয়ী ভাবল, এত হ্যান্ডসাম একটা লোক কি খুব খারাপ লোক হতে পারে?
ট্যাক্সিটা ছাড়ল। বিশ গজ পিছনে শুভর বাইক। শুভ একবার বাঁ হাতটা তুলে তাকে একটা অস্পষ্ট সংকেত জানিয়ে চলে গেল।
হাই মৈত্রেয়ী! শুভ কোথায়?
মৈত্রেয়ী চমকে উঠল।
১৫.
কলকাতার রাস্তায় মধ্য দ্বিপ্রহরে একটা ট্যাক্সিকে অনুসরণ করা যে কত কঠিন তা বুঝতে একটুও দেরি হল না শুভর। কলকাতার রাস্তায় শয়ে শয়ে ট্যাক্সি। তার মধ্যে কেবল একটিকে লক্ষ রাখা যে কত কঠিন। শুধু নম্বর প্লেটটা ভরসা, তার ওপর মোটরবাইক চালানোর অভিজ্ঞতা শুভর খুব দীর্ঘ নয়। তাকে পেরিয়ে বহুট্যাক্সি, গাড়ি এবং অটোরিকশাও ট্যাক্সিটাকে আড়ালে ফেলে দিয়েছে। শুভ তবু প্রাণপাত করছিল। ভিআইপি রোডেই যদি এই অবস্থা হয় তা হলে শহরের ভিতরকার ঘিঞ্জি রাস্তা বা গলিঘুজিতে ঢুকলে কী হবে?
উলটোডাঙার মোড় অবধি অবশ্য ট্যাক্সিটাকে শেষ পর্যন্ত নজরে রাখতে পারল শুভ। তার পর থেকেই শুরু হল ভজঘট্ট। হাজারো গাড়ি, হাজারো বাইক আর স্কুটারের জঙ্গলে দিশেহারা শুভ যে কতবার দুর্ঘটনা থেকে বরাতজোরে বেঁচে গেল তার হিসেব নেই। বার কয়েক রাস্তা ছেড়ে ফুটপাথেও উঠে পড়ল সে। ট্যাক্সিটা অবধারিত মানিকতলার মোড়ের দিকেই চলেছে। মোড়গুলোকেই ভয়। কোনদিকে বাঁক নেবে কে জানে। তাই বেশ কাছাকাছিই থাকতে হচ্ছিল তাকে। লক্ষ করল লোকটা একবারও পিছন দিকে তাকাল না। বেশ আয়েশ করেই বসে রইল। বাঁচোয়া।
মানিকতলা ছাড়িয়ে বিবেকানন্দ রোড। তারপর সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের খাঁচাকল। তারপর ডানধারে মোড় নিয়ে সোজা এসে থামল পোন্দার বিল্ডিং-এর কাছ বরাবর। ট্যাক্সি থামল। তারপর অলস ভঙ্গিতে নেমে ফুটপাথে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে যেন চারদিকটা খুব মেপেৰুপে দেখল, ক্রিটিক্যাল আই।
শুভ বাইকটাকে স্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে লক করল। তারপর ধীর কদমে লোকটার দশ হাত দূরে গিয়ে দাঁড়াল। বক্কেশ্বর এখন কোনদিকে যায় সেইটেই সমস্যা।
বক্কেশ্বর তার দিকে তাকাল না। সোজা হেঁটে যেতে লাগল বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের দিকে। ডানদিকে মোড় ফিরল। হাঁটতে লাগল। দুলকি চাল। কোনও তাড়া নেই। মিনিট পাঁচেক ভিড়ের রাস্তায় ডানধার ঘেঁষে হাঁটবার পর আচমকাই ডানধারে একটা প্রকাণ্ড বাড়ির দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল।
একটু দ্বিধায় পড়ে গেল শুভ। সেও কি ঢুকবে? কাজটা উচিত হবে কি? অবশ্য এই অঞ্চলের বাড়িগুলির ভিতরে অসংখ্য অফিস, গুদাম এবং দোকান রয়েছে। ঢুকলেও কেউ কিছু সন্দেহ করবে না, সুতরাং দ্বিধার ভাবটা ঝেড়ে ফেলে শুভও ঢুকল। কিন্তু ওই সামান্য দ্বিধা আর কালক্ষেপই সব গণ্ডগোল করে দিল।
বাড়ির ভিতরে ঘিঞ্জি সব দোকান, আড়ত এবং থিকথিক ভিড়। দিশাহারা পরিস্থিতি। শুভ সেই ভিড়ের মধ্যে বেদিশা হয়ে খানিকক্ষণ ঘোরাফেরা করল। ডান ধারে একটা সরু সিঁড়ি পেয়ে সেটা বেয়ে ওপরেও উঠল সে। ওপরেও হাজার রকমের ব্যাবসা বাণিজ্যের আয়োজন। সর্বত্রই মানুষ আর মানুষ। কোথাও বন্ধেশ্বরকে দেখা গেল না।
