অবাক হয়ে শুভ বলল, কেন জিজ্ঞেস করব? কিছু তো ঘটেনি। জাস্ট কো-ইনসিডেন্স।
কিছুই যদি ঘটেনি তা হলে মাথা ঘামাচ্ছ কেন?
দুটো কারণে। রোজমারিকে সম্প্রতি ভুল জন্মদিনে লাল গোলাপ পাঠানো এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যালয়ের আচমকা গুরুত্ব বৃদ্ধি। আমার মনে হচ্ছে ম্যাডাম রোজমারির আরও একটু সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে।
রোজমারিকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। উনি নিজের দেখভাল ভালই করতে পারেন।
শুভ একটু চুপ করে থেকে মৈত্রেয়ীর দিকে চেয়ে বলল, তোমার কি সত্যিই তাই মনে হয়?
মৈত্রেয়ী একটু বিরক্ত হয়ে বলল, এই তো বলছ তেমন ঘটনা কিছু ঘটেনি বলে রোজমারিকে কিছু বলোনি। আবার বলছ রোজমারির সতর্ক হওয়া দরকার।
শুভ কৃত্রিম দুঃখের সঙ্গে বলল, আমার দোষ কী জানো? কাউকেই কিছু ঠিকভাবে বুঝিয়ে বলতে পারলাম না। সেইজন্যই না বিদিশা কোনওদিন আমার ভালবাসা টেরই পেল না। বিয়ে করে বসল একজন ফ্লাইট লেফটেন্যান্টকে।
মৈত্রেয়ী হেসে ফেলে বলল, আর ইয়ারকি করতে হবে না। বিদিশার গল্পটা পুরো গুল।
শুভ মাথা নেড়ে বলল, গুল! বলো কী? আমার আজও তার জন্য কী ভীষণ কষ্ট হয়। অথচ সে তো অপ্রাপ্য ছিল না। শুধু একটু বুঝিয়ে বললেই হত।
মৈত্রেয়ী হেসে বলল, আমি বিদিশা নই। বুঝতে পারি।
কী বুঝতে পারো?
তুমি একটু বোকা আর একটু পাগল। যা বলছিলে বলো।
শুনবে? বোরিং নয় তো!
বোরিং হবে কেন? এ তো রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজের গল্প।
গল্প হবে কেন? একটা হাইপোথেসিস বলতে পারো, বেসড অন সলিড ফ্যাক্টস।
কিন্তু ফ্যাক্টগুলো এলোমেলো, ক্যাওটিক।
তাও ঠিক। প্রথম অবস্থায় প্যাটার্নটা বোঝা যায় না। তবে আমার মনে হচ্ছে, রোজমারি ইজ বিয়িং টেইলড। এভরিহোয়ার।
রোজমারিকে ফলো করে কী হবে?
সেইজন্যই তো সিঙ্গাপুর যাওয়াটার একটা ব্যাখ্যা খুঁজছিলাম। রোজমারি একটা বাচ্চাকে আদর করতে প্রায়ই সিঙ্গাপুর যাচ্ছে, আর আর-একটা লোক কাজকর্ম ফেলে এক কাঁড়ি টাকা খরচ করে তাকে ফলো করছে, এটা আমার কাছে বাড়াবাড়ি ঠেকছে।
বাড়াবাড়িই তো। লোকটা মোটেই রোজমারিকে ফলো করছে না। সে যাচ্ছে নিজের কাজে। তোমার উর্বর মাথা বাকিটা বানিয়ে নিচ্ছে।
শুভ চিন্তিতভাবে চেয়ে রইল মৈত্রেয়ীর মুখের দিকে। তারপর বলল, সে যাই হোক, আজ রোজমারির সঙ্গে তার গাড়িতে তুমিই যাবে। আমি মোটরবাইক এনেছি।
হ্যাঁ, সেটাও জিজ্ঞেস করা হয়নি তোমাকে। মোটরবাইক এনেছ কেন?
আমি বক্কেশ্বরকে ফলো করব।
মৈত্রেয়ী চোখ বড় করে বলল, বলো কী? তোমার কী দরকার লোকটাকে ফলো করার?
কারণ আছে। আই ওয়ান্ট টু নো।
শোনো শুভ, মোটরবাইক তুমি সবে কিনেছ। এখনও হাত সেট হয়নি। পাগলামি কোরো না।
তুমি কি জানো নলেজ জিনিসটা মানুষের মস্ত বড় হাতিয়ার?
এটাকে নলেজ বলে না শুভ, বড়জোর ইনফর্মেশন বলা যায়।
ইনফর্মেশনও নলেজ। তবে ছোট মাপের, এই যা।
বাড়াবাড়ি কোরো না শুভ। পুলিশের কাছে বলে দিলে তারাই হয়তো লোকটার খোঁজ করবে।
পুলিশ কেন ইন্টারেস্ট নেবে? লোকটা তো এখনও কোনও ক্রাইম করেনি। এমনকী একমাত্র রোজমারির পিছু পিছু সিঙ্গাপুর যাওয়া-আসা ছাড়া বিশেষ কোনও সন্দেহজনক কাজও করেনি।
ওঃ, তোমার সঙ্গে কিছুতেই পারা যায় না।
শুভ একটু হাসল, রোজমারি আমার বস, তার নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব আমার নয়। কিন্তু রহস্যের গন্ধ পেলে আমি কেন যেন একটু চনমনে হয়ে উঠি। ছেলেবেলা থেকে ডিটেকটিভ বই আর থ্রিলার পড়ে পড়েই বোধহয় এরকমটা হয়েছে।
বুঝেছি। এখন খোঁজ নাও তো, ফ্লাইট এত দেরি করছে কেন? ল্যান্ড করার শিডিউল টাইম তো ঘণ্টাখানেক আগে পেরিয়ে গেছে।
আধ ঘণ্টা লেট তো ছিল। হয়তো আরও একটু বেড়েছে। ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই। ফ্লাইট যখন আসবার আসবে। আমাদের কাজ হল অপেক্ষা করা।
তা হলে চলো, গাড়িতে গিয়ে বসি। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ব্যথা হয়ে গেল। এরা যে কেন লাউঞ্জে আমাদের ঢুকতে দেয় না।
এ দেশের প্রশাসন খুবই নির্বোধ। সিকিউরিটির অজুহাতে আজকাল ভিতরে ঢুকতে দেয় না, কিন্তু আদতে সিকিউরিটি ব্যাপারটায় হাজার ফুটো। তুমি কি বিশ্বাস করবে যে, ইচ্ছে করলে এই আমিই কলকাতা এয়ারপোর্ট থেকে যে-কোনও প্লেন হাইজ্যাক করতে পারি? কিংবা পারি যে-কোনও প্লেনে এক্সপ্লোসিভ লোড করে দিতে?
থাক বাবা, তোমাকে আর ওসব পারতে হবে না। তবে কথাটা হয়তো মিথ্যে বলোনি। পাবলিককে লাউঞ্জে ঢুকতে না দিয়ে খুব একটা কাজের কাজ কিছু হয়নি।
তারা ফিরে এসে পার্কিং লটে রাখা গাড়িতে বসে রইল। স্টিয়ারিং-এ অতীব বিশ্বস্ত শিউশরণ। গম্ভীর, মিতবাক শিউশরণ খুবই ঠান্ডা মানুষ। এরকম কর্তব্যপরায়ণ ও প্রভুভক্ত লোক বিশেষ দেখা যায় না। স্টিয়ারিং-এর পিছনে বসে সে একখানা নাম-কিতাব পড়ছে। বইখানা মজার। ওতে কেবল একটি বীজমন্ত্র পর পর ছাপা আছে। বইটা পড়ে যাওয়া মানেই জপ করে যাওয়া। শিউশরণ অবসর পেলেই বইখানা খুলে বসে যায়। শুভ আর মৈত্রেয়ী যখন গাড়িতে উঠে বসল তখন একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাদের দেখে নিল শিউশরণ। কোনও প্রশ্ন করল না, প্লেন দেরি কেন তা নিয়ে উদ্বেগ দেখাল না, নাম বই পড়ে যেতে লাগল শুধু।
মৈত্রেয়ী বলল, শুভ, তোমার বক্কেশ্বর কি পাজি লোক?
কে জানে! তবে সন্দেহজনক।
সত্যিই পিছু নেবে নাকি?
