বেনভেনুটি কার হয়ে কাজ করছিল জানো?
না। তবে ও ভিকিজ মব-এর লোক নয়।
তা হলে কি সাক্কির?
হলেও হতে পারে।
লুইজি, আমি অনেক কিছুই জানি না। একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
করো।
সকালে একজন বাঙালি আমাকে উদ্ধার করে। সে কে?
লুইজি অবাক হয়ে বলে, ও তো দাতা।
দাতা!
হ্যাঁ। ওই তো দাতা। আমাদের বস।
১৪.
শুভ আর মৈত্রেয়ী এয়ারপোর্টে ফটকের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। আজ রোজমারি সিঙ্গাপুর থেকে ফিরবে।
রোজমারি প্রায়ই সিঙ্গাপুর যায়। ওখানে ওর এক বোন থাকে, তার স্বামী আন্তর্জাতিক কোম্পানির কর্মকর্তা। বোনও ওই কোম্পানিরই একজিকিউটিভ। সিঙ্গাপুরে রোজমারির কিছু কেনাকাটাও থাকে। মাসে বা দু’মাসে একবার কয়েক দিনের জন্য তার সিঙ্গাপুরে যাওয়া চাই-ই।
শুভ বলছিল, আচ্ছা, রোজমারি দুনিয়ার সব বড় শহরেই তো যায়, তবু সিঙ্গাপুর ওর এত প্রিয় কেন বলো তো!
মৈত্রেয়ী বলল, কে জানে বাবা, আমার তো মনে হয় ওর বোনের বাচ্চাকে বোধহয় ভালবাসে, নিজের তো নেই। তাই ঘনঘন বোনের কাছে যায়।
যাঃ, ওটা কোনও কারণ হতে পারে না। একটা বাচ্চাকে ভালবাসে বলেই দু’দিন পর পর এক কাঁড়ি টাকা গচ্চা দিয়ে এত দূর যায় কখনও?
সিঙ্গাপুর আর কী এমন দূর। আর টাকাটা আমাদের হিসেবে অনেক হলেও রোজমারির কাছে কিছুই নয়। ওর বোনপোটাকে খুব ভালবাসে রোজমারি। গতবার খ্রিসমাসে এসেছিল, কী ফুটফুটে দেখতে। খুব চটকাতে ইচ্ছে করছিল।
আমার মনে হয় বাচ্চা ছাড়াও অন্য কারণ আছে।
আছেই তো। মার্কেটিং। সিঙ্গাপুর থেকে কত কী নিয়ে আসছে প্রতি মাসে।
শুভ একটু গম্ভীর হয়ে বলল, দেখো মৈত্রেয়ী, রোজমারির অনেক টাকা। কিন্তু কখনও বেহিসেবি নয়। রোজমারি কখনও কোনও ফ্যান্সি সেন্টিমেন্টের জন্য টাকার অপচয় করবে না। আমি রোজমারিকে কৃপণ বলছি না, কিন্তু ভীষণ হিসেবি।
তোমার অত মাথা ঘামানোর দরকার কী? তুমি তো আর গোয়েন্দা নও। বেশ করে সিঙ্গাপুরে যায়। এর পরের বার আমাকেও সঙ্গে নেবে বলেছে।
তাই বলো! সেইজন্যই রোজমারির পক্ষ নিচ্ছ। কিন্তু কথাটা একটু ভেবে দেখো।
আচ্ছা, একজন মানুষ ঘনঘন সিঙ্গাপুর যায়–এর মধ্যে ভেবে দেখার কী আছে বলো তো! তুমি একটু বেশ অদ্ভুত আছ কিন্তু।
শুভ একটু চুপ করে থেকে হঠাৎ স্বগতোক্তির মতো করে বলল, ভাগ্যিস তুমি বক্কেশ্বরের কথা জানো না।
মৈত্রেয়ী ভ্রু কুঁচকে বলল, বক্কেশ্বর। সেটা আবার কে?
একটা বেঁটে মতো লোক। বেশ ফরসা আর টাইট চেহারা। খুব স্মার্ট।
সে আবার কে?
সে-ই বক্কেশ্বর।
তার মানে?
শুভ একটুও না হেসে বলল, গত চারবার লোকটাকে লক্ষ করেছি।
কোথায় লক্ষ করেছ?
শুভ বলল, আমার ভিতরে বোধহয় একজন ন্যাচারাল গোয়েন্দা আছে। লক্ষ করা এবং ডিডিউস করা আমার ভীষণ প্রিয় পাসটাইম।
থাক, আর নিজের সম্পর্কে অত সার্টিফিকেট দিতে হবে না। লোকটা কে?
তার আমি কী জানি।
এই যে বললে বক্কেশ্বর!
ওঃ, নামটা আমিই দিয়েছি। কেন যে লোকটাকে দেখলেই আমার বক্কেশ্বর নামটা মনে আসে।
কিন্তু লোকটাকে নিয়ে ভাবছ কেন?
ভাবছি কে বলল? আমি ভাবছি রোজমারিকে নিয়ে।
তা হলে বক্কেশ্বরবক্কেশ্বর করছ কেন?
গত চার মাসে রোজমারি যতবার সিঙ্গাপুরে গেছে ততবারই একই ফ্লাইটে বক্কেশ্বরও গেছে।
মৈত্রেয়ী প্রথমটায় একটু অবাক হলেও সামলে নিয়ে হাসল। সে বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন মেয়ে। বলল, গত চার মাসে রোজমারি সিঙ্গাপুর গেছে মোট তিনবার।
তিনবার?
পাক্কা হিসেব। চার মাসে তিনবার সিঙ্গাপুরে যাওয়াটা বড় কথা নয়। সিঙ্গাপুরে আরও অনেকেই আরও বেশি ঘনঘন যায়। অনেকেরই বিজনেস ইন্টারেস্ট আছে। আমাদের এক কাকু আছেন, যিনি প্রতি সপ্তাহে হংকং যান। বুঝেছ?
হ্যাঁ। এটা আমার মাথায় খেলেনি।
সুতরাং তোমার গোয়ন্দাগিরিটা জলে গেল।
তুমি বলছ বক্কেশ্বরও খুব ঘনঘন সিঙ্গাপুর যায় এবং গত চারবার রোজমারির সঙ্গে তার সিঙ্গাপুর যাওয়াটা কোনও সন্দেহজনক ঘটনা নয়?
ঠিক তাই। তবু লোকটাকে আমি দেখতে চাই।
শুভ যেন খুব লজ্জিত হয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ বলল, আসাটাও তাই?
তার মানে?
লোকটা
শুধু যায় না, আসেও।
একই ফ্লাইটে?
অবশ্যই।
মৈত্রেয়ী শুভর দিকে চেয়ে বলল, ইউ মাস্ট বি কিডিং।
শুভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে করুণ মুখ করে বলল, আমার দুঃখটা কী জানো?
কী?
তোমারও দু’খানা ড্যাবডেবে চোখ আছে। সে দুটোকে মাশকারা, কাজল ইত্যাদি দিয়ে সেবাও কম দাও না। কিন্তু সে দুটোর আসল কাজটায় কেন যে এত ফাঁক থাকে!
তুমি শুধু ফাজিলই নও, অসভ্যও। সাজগোজ নিয়ে কথা বলা এটিকেট নয়।
শুভ নিপাট ভালমানুষের মতো বলল, সাজতে কেউ বারণ করেনি। বারণ করলেই বা শুনছে কে? আমি বলছি ভগবানের দেওয়া ইন্দ্রিয় সকলের সদ্ব্যবহার করা উচিত। চোখ শুধু কটাক্ষ করার জন্য তো নয়, পর্যবেক্ষণও তার আর একটা কাজ।
আহা, আমি বুঝি তোমার চেয়ে কম অবজার্ভ করি? তুমিই তো বরং গত শুক্রবার রাস্তা পেরোনোর সময় স্কুটারের ধাক্কা খেয়েছিলে।
আচ্ছা, লেট আস মেক পিস। কথা হল, গত চারবার রোজমারির ফ্লাইটে আমি লোকটাকে যেতে এবং আসতে দেখেছি। রোজমারির সঙ্গে লোকটার আলাপ নেই, কেউ কাউকে চেনে বলেও মনে হয় না। না, একটু ভুল হল। রোজমারি চেনে বলে মনে হয় না। কিন্তু লোকটা সম্পর্কে আমি শিয়োর নই।
রহস্য পুষে না রেখে রোজমারিকে জিজ্ঞেস করলেই তো পারতে।
