গোপীনাথ একটা শ্বাস ফেলে বলল, তা হয়তো করছ, কিন্তু তোমাদের সব কাজই কাঁচা এবং অ্যামেচারিশ। আমাদের ফলো করে এসেছে একটি সিত্রঁন গাড়ি, লুসিল সেটাকে ঝেড়ে ফেলতে পারেনি। তার ওপর কোথাও গাড়ি সুইচ করার ব্যবস্থা রাখেনি। আমাকে এরকম কাফ্রি সাজানোরই বা মানে কী?
ওসব আমরা জানি না। আমাদের যা করতে বলা হয়েছে আমরা তা অক্ষরে অক্ষরে করেছি।
এই অপারেশনটা করাচ্ছে কে?
আমাদের বস।
তোমরা কারা?
হয়তো তোমার বন্ধু।
গোপীনাথ কাঁধ ঝাঁকাল। বলল, নির্বোধের বন্ধুত্বের চেয়ে বুদ্ধিমানের শত্রুতাও ভাল। তোমরা আমাকে বের করে এনেছ কি খোলা ময়দানে খুনির সামনে এগিয়ে দেওয়ার জন্য?
আমাদের বস যদি তাই চান তবে তাই হবে।
তোমাদের বসের সঙ্গে আমার দেখা হওয়া দরকার। কে তোমাদের বস?
বিগ ম্যান। এখন চলে এসো, আমাদের অনেক জায়গায় যেতে হবে।
গোপীনাথকে নিয়ে ছেলেটা বেরিয়ে এল। বাইরে মেয়েটা রিসেপশনের চেয়ারে বসে মন দিয়ে কিছু নোট করছে। একবার চোখ তুলে তাকাল। মুখে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, ভয় পেয়েছ নাকি?
না। তবু দুশ্চিন্তা হচ্ছে।
মেয়েটি হেসে বলল, ওই সিত্রঁন গাড়িটা ওখানে পার্ক করা আছে। ওতে যারা ছিল তারা আমাদেরই লোক। ব্যাক আপ কথাটা বোঝো। ওরা হল আমাদের ব্যাক আপ। এখন ওরা। ডাইনিং হলে বসে কফি খাচ্ছে।
গোপীনাথ একটু বেকুব হয়ে গেল। বলল, এরপর আমরা কোথায় যাব?
সেটা পরে দেখা যাবে। আপাতত এই হোটেলেই একটু গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে।
গোপীনাথ একটা নিশ্চিন্তির শ্বাস ফেলে বলল, বাঁচা গেল। এবার কি আমি আমার মুখের মেক-আপ তুলতে পারি?
পারো। কিন্তু জানালা দিয়ে বেশি উকিঝুঁকি মেরো না। তোমার খোঁজখবর হচ্ছে। জুতো জামা পরেই থেকো, যে-কোনও সময়ে পাঁচ মিনিটের নোটিসে রওনা হতে পড়তে পারে। লুইজি, বোসকে তার ঘরে নিয়ে যাও।
লুইজি হল বেঁটে ছেলেটা। গোপীনাথকে লিফটে করে চারতলায় এনে একটা ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বলে গেল, রুম সার্ভিস চালু আছে। খাবার বা পানীয় ঘরেই আনিয়ে নিয়ো। ঘরের বাইরে না যাওয়াই নিরাপদ। আর হ্যাঁ, এ ঘরে কিন্তু টেলিফোন নেই। শুধু ইন্টারকম।
গোপীনাথ বিরক্ত হয়ে বলল, কেন নেই?
নিরাপত্তার কারণে। টেলিফোন কল ট্রেস ব্যাক করা যায়। ঝুঁকি নেওয়ার দরকার কী?
গোপীনাথ ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। বাথরুমে গিয়ে অনেকক্ষণ সময় নিয়ে মেক আপ তুলল। জামাকাপড় বদলানোর উপায় নেই। তাই ঘরের বিছানায় জামাকাপড় সমেত শুয়ে রইল কিছুক্ষণ। তার বিশ্বাস হচ্ছে না যে, ওই বাঙালিটি নিছক তাকে বিপদ থেকে বাঁচানোর জন্য এতটা ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার করে এনেছে। বরং এর পিছনে আর একটা চক্র যে ক্রিয়াশীল হয়ে উঠেছে তাতে সন্দেহ নেই। এত তাড়াতাড়ি সবাই স্বার্থের গন্ধ কী করে টের পেয়ে গেল তা বুঝতে পারছে না গোপীনাথ।
কিন্তু এই গণ্ডিবদ্ধ জীবনটাও তার ভাল লাগছে না। তাকে ঘিরে, তাকে নিয়ে কিছু ঘটনা ঘটছে যেগুলোর ওপর তার কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। এটাই বা সে মেনে নেবে কী করে?
ঘণ্টাখানেক বাদে সে রুম সার্ভিসকে ডাকল ইন্টারকমে। বেশ রাজসিক একটা লাঞ্চের অর্ডার দিল। যতদূর সম্ভব এদের ঘাড় ভাঙা যাক।
লাঞ্চ আসতে সময় লাগল প্রায় চল্লিশ মিনিট। সত্যিই এলাহি লাঞ্চ। তিনজন ওয়েটার তিনটে ট্রে-তে বয়ে আনল। ইতালিয়ান আর ফরাসি খাবার।
গোপীনাথ খেল। ফেললও অনেক। এত খাওয়া একজনের পক্ষে তো সম্ভব নয়।
লাঞ্চের পর সে একটু ঘুমিয়ে নিল। ঘুমের মধ্যে সে নানা ধরনের অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল। স্বপ্নগুলোর কোনও মানে হয় না। অসংলগ্ন প্রলাপের মতো।
সন্ধের পর দরজায় টোকা পড়ল। সাড়া দিতেই লুইজি এল ঘরে। তার হাতে একটা সুটকেস।
এটা কী?
তোমার জিনিসপত্র। সবই নতুন কেনা হয়েছে।
গোপীনাথ অবাক হল। এরা তার পিছনে যথেষ্ট খরচ করছে। পরে সুদে আসলে তুলবে বোধহয়।
লুইজি সুটকেসটা বিছানায় রেখে ডালা খুলে দিয়ে বলল, দেখে নাও। পাজামা-সুট থেকে শুরু করে সবকিছু আছে। শেভিং সেট, কোলন, সবকিছু।
ধন্যবাদ। রুমিং হাউসে আমার অনুপস্থিতি কি ধরা পড়েছে?
যতদুর জানি, এখনও কেউ টের পায়নি। ল্যান্ডিং-এর পাহারা বদল হয়েছে। তবে বেশিক্ষণ আর নয়। টের পেল বলে।
আজকাল পেশাদার গুন্ডারা এত অসাবধানি হয়, জানা ছিল না।
লুইজি একটু হাসল। বলল, আমাদের চালাকিটা এতই ছোট আর সাধারণ যে, ওরা এরকম ঘটতে পারে বলে ভাবতেই পারেনি। বাই দি বাই, তুমি কি বেনভেনুটিকে চেনো?
কে বেনভেনুটি?
তোমাকে যে দু’জন পাহারা দিচ্ছিল তাদের একজন।
সে আসলে কে?
বেনভেনুটি একসময়ে দুরন্ত বক্সার ছিল। অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর প্রাইজ ফাইটিং-এও দুনিয়া কাপিয়ে দিয়েছিল।
বক্সিং! ওঃ হ্যাঁ, নামটা শুনেছি বটে।
আমি ওর খুব ফ্যান। দুঃখের বিষয়, বেনভেনুটি এখন একজন মাফিয়া ডনের হয়ে গুন্ডামি করে বেড়ায়। প্রতিভার কী অপচয়।
গুন্ডামি করে কেন?
কপাল। রোমের একটা নাইট ক্লাবে মারপিট করে একটা লোককে খুন করে বসেছিল। জেল তো হতই, ফাঁসিও হতে পারত। সেই সময় বেনভেনুটি ডনের কাছে আশ্রয় নেয়। বক্সিং আর পারত না। তবে গুন্ডামিটাই এখন ওর রুজি রোজগার।
তুমি কি ওর খুব ভক্ত?
লুইজি হাসল, খুব। আমিও বক্সার। যে-কোনও বক্সারই জানে বেনভেনুটির মধ্যে কী সাংঘাতিক সম্ভাবনা ছিল। আমাদের স্বপ্নের মানুষ। তোমার সৌভাগ্য যে ওরকম একটা লোক তোমায় পাহারা দিচ্ছিল।
