চাতালটা স্বাভাবিক। দু-চারটে গাড়ি পার্ক করা। দু-চারজন লোক এধারে ওধারে। কোনও অস্বাভাবিকতা নেই।
মেয়েটা গাড়ির দরজা খুলল। গোপীনাথ বাকেট সিটে বসে পড়ল নির্বিকারভাবে। মেয়েটা স্টিয়ারিং ধরে বসল। খুব স্বাভাবিকভাবেই গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ধীর গতিতে ফটক পেরিয়ে বা ধারের রাস্তা ধরল।
গোপীনাথ ইতালিয়ান ভাষায় জিজ্ঞেস করল, আমরা কোথায় যাচ্ছি?
কোথাও যাচ্ছি। চুপ করে থাকো।
তুমি কে?
লুসিল।
তুমি কার লোক?
তার মানে?
ও লোকটা কে?
লুসিল একটু চুপ করে থেকে বলল, আমার বস।
লোকটা বাঙালি?
হ্যাঁ।
বস মানে কী? তোমরা কি সরকারি লোক?
না।
তা হলে তোমরা আসলে কারা?
সে কথা বস হয়তো তোমাকে কখনও বলবে। এখন চুপ করে থাকো। আমার মনে হচ্ছে, একটা গাড়ি আমাদের পিছু নিয়েছে।
গোপীনাথ আয়নার দিকে চেয়ে বলল, কোন গাড়িটা?
একটা কালো সিত্রঁন।
গোপীনাথ কিছুক্ষণ গাড়িটাকে লক্ষ করল আয়নায়। মেয়েটা কয়েকটা মোড় ফিরল ইচ্ছে করেই। গাড়িটা লেগে রইল পিছনে। গোপীনাথ মেয়েটার দিকে চেয়ে বলল, হ্যাঁ, গাড়িটা পিছু নিয়েছে। তুমি কি পারবে ওটাকে ঝেড়ে ফেলতে?
মেয়েটা দেখতে বেশ সুন্দর। লম্বাটে, মেদহীন, নমনীয় চেহারা। ব্যালেরিনার মতো দেখতে। মুখখানাও বেশ সুন্দর। কিন্তু এসব ব্যাপারে কতখানি দক্ষ তা বোঝা যাচ্ছে না। গোপীনাথ বলল, শোনো সুন্দরী লুসিল, অত বেশি পাক খেয়ো না। তা হলে ওরা জানতে পারবে যে তুমি ওদের অস্তিত্ব টের পেয়েছ।
তা হলে কী করতে হবে?
স্বাভাবিক গতিতে চালাও। টাইবার নদীর দিকে চলল। ওদের বুঝতে দাও, আমাদের পালানোর কিছু নেই।
মেয়েটা মৃদু একটু হেসে বলল, ব্যাপারটা অত সহজ নয়। তোমাকে ওই জয়েন্ট থেকে বের করে আনতে আমাদের অনেক মেহনত আর ঝুঁকি গেছে। একটা বোকামির ফলে ঘটনাটা কেঁচে গেলে সর্বনাশ।
কিন্তু তুমি গাড়িটা নাটকীয়ভাবে চালিয়ো না। যে-কোনও একটা রাস্তা ধরে কিছুক্ষণ চালাও। তোমার যদি ব্যাক আপ থেকে থাকে তবে কার-টেলিফোনে তাকে খবর দাও। যদি গাড়ি সুইচ করার ব্যবস্থা থাকে, তবে ভালই। না হলে একটু মুশকিল আছে। সাধারণত এসব ক্ষেত্রে দু-তিনটে গাড়ির ব্যবস্থা রাখা ভাল।
মেয়েটা একবার গোপীনাথের দিকে চেয়ে নিয়ে বলল, তোমার কি এরকম সিচুয়েশন হ্যান্ডেল করার অভিজ্ঞতা আছে?
গোপীনাথ ম্লান একটু হেসে বলল, আমি নিরীহ একজন প্রযুক্তিবিদ মাত্র। আমি বিপজ্জনক জীবন যাপন করি না। তবে এরকম কয়েকটা বিপদে আমাকে পড়তে হয়েছে। শোন, রোম আমার ভীষণ চেনা শহর। তুমি স্টিয়ারিং আমার হাতে দাও। হয়তো তোমার চেয়ে আমি সিচুয়েশনটা একটু বেশি সামাল দিতে পারব।
কীভাবে সামাল দেবে? তোমার ইগো তো খুব স্ট্রং দেখছি।
ইগো নয়। অস্তিত্বের সংকট থেকে আমি কিছু বেশি দক্ষতার অধিকারী।
তুমি চুপ করে বসে থাকো। এটা তোমার মাথা ঘামানোর বিষয় নয়। তুমি অতিথি।
তারা রোমের প্রধান সড়কগুলিতেই মাঝারি গতিতে ঘুরপাক খাচ্ছিল। একটু পিছনে সিত্রঁন গাড়িটা। সামনের সিটে দু’জন কালো সুট পরা লোক বসে আছে। দু’জনেরই কালো টুপি কপাল পর্যন্ত ঢাকা। দু’জনেরই চোখে কালো চশমা।
গোপীনাথ বলল, তুমি বোধহয় তেমন ভয় পাওনি।
আমি অকারণে ভয় পাই না।
অকারণে?
এখন পর্যন্ত তো তাই। ওরা পিছু নিয়েছে, কিন্তু এখনও অবধি তোমাকে ছিনতাই করার তো চেষ্টা করেনি।
করলে?
দেখা যাবে।
লুসিল, আমার একটু টয়লেটে যাওয়া দরকার।
টয়লেট! মাই গড!
খুবই দরকার।
দাঁড়াও দাঁড়াও, এখন টয়লেটে যাওয়া মানেই হল—
প্লিজ! কতগুলো ব্যাপার নিয়ে বিতর্ক চলে না।
বুঝতে পারছি।
মেয়েটা হঠাৎ বাঁ ধারে একটা রাস্তায় গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে স্পিড বাড়িয়ে দিল। বলল, তুমি কোনও ফন্দি করছ নাকি?
না। আমার যা অবস্থা, ফন্দি করে লাভ নেই।
একটা ছোট হোটেলের চত্বরে গাড়িটা ঢুকিয়ে দিল লুসিল। বলল, চলো।
গোপীনাথ গম্ভীর মুখে নামল। তার বাথরুম পায়নি এবং সে সত্যিই একটা প্ল্যান করেছে। সেটা কতদুর ফলপ্রসূ হবে তা সে জানে না।
লুসিল তাকে সোজা রিসেপশনের পিছনে টয়লেটে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল, পালানোর চেষ্টা করবে না তো! করে লাভ নেই। এটা আমার কাকার হোটেল। চারদিকেই আমাদের লোক।
গোপীনাথ মৃদু হেসে বলল, তোমার মতো সুন্দরীকে ছেড়ে পালায় কোন আহাম্মক?
টয়লেটে ঢুকে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল গোপীনাথ। বাস্তবিক সে কোথায় যাবে এবং কী করবে তা ভেবে পাচ্ছে না। কিন্তু তার মনে হচ্ছে–কিংবা বলা যায় মনের মধ্যে একটা অস্পষ্ট অস্বস্তি হচ্ছে–সে আর একটা জালে জড়িয়ে পড়ছে না তো?
টয়লেটের আয়নায় নিজের ছদ্মবেশে ঢাকা চেহারাটা দেখে সে একটু আঁতকে উঠল। এরকম অদ্ভুত ছদ্মবেশ তাকে কেন পরানো হল কে জানে? এরকম ছদ্মবেশ বরং লোকের দৃষ্টি বেশিই আকর্ষণ করে। নিজের প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল গোপীনাথ। হঠাৎ একটা শব্দ শুনে ঘুরে চেয়ে অবাক হয়ে দেখল, একটা বেঁটে এবং স্বাস্থ্যবান ইতালিয়ান যুবক তার দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
গোপীনাথ বিরক্ত হয়ে বলল, কী চাও?
তুমি একটু বেশি সময় নিচ্ছ।
তাতে কী? আমার কোথাও যাওয়ার তাড়াহুড়ো নেই। তুমি কে?
আমি লুসিলের জ্ঞাতি ভাই। আমরা তোমাকে পালাতে সাহায্য করছি।
