সোনালি হঠাৎ শুকনো মুখে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি এ ব্যাপারে কিছুই করতে পারি না।
মনোজ অপ্রতিভ হয়ে বলল, আই অ্যাম সরি। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম—
সোনালি সামান্য হাঁফ-ধরা গলায় বলল, দেখুন, আমি অফিসিয়াল কাজকর্মের বাইরে যেতে চাই না।
মনোজ বেকুবের মতো চেয়ে রইল। প্রসাদের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করাটা মস্ত ভুল হয়ে গেল হয়তো। বড্ড বোকা বোকা লাগল নিজেকে।
সোনালি বলল, আর কিছু বলবেন?
না না। আপনাকে ডিস্টার্ব করেছি বলে ক্ষমা করবেন।
সোনালি আর একটাও কথা না বলে নিজের ঘরে চলে গেল।
মনোজ ঘটনাটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলার জন্য এক কাপ কফি খেল। তারপর কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
বিকেলের দিকে পিআরও সুব্রতর একটা ফোন এল।
স্যার, একটু আসতে পারি?
এসো।
সুব্রত এল। ছেলেটিকে মনোজের বেশ পছন্দ। স্মার্ট, চটপটে, হাসিখুশি। বসে হাসিমুখে বলল, আপনি কি কারও সম্পর্কে কোনও ইনফর্মেশন চান?
বুঝতে না পেরে মনোজ বলল, কার কথা বলছ?
সুব্রত সামান্য দ্বিধা করে বলল, শুনলাম আপনি গোপীনাথ বসুর ইনফর্মেশন চাইছেন।
মনোজ বলল, চাইছিলাম। কিন্তু তোমাকে কে বলল?
মিস সোম।
মনোজ অবাক হয়ে বলে, মিস সোম। আশ্চর্য! উনি তো মনে হল, গোপীনাথ প্রসঙ্গে অসন্তুষ্টই হলেন।
সুব্রত মাথা নেড়ে বলল, শি হ্যাজ হার গ্রাজ।
তা তুমি কী জানো?
আমি বলতে এসেছি যে, গোপীনাথ বসু টেলিফোনে অ্যাভেলেবল নন।
কেন, ওঁর টেলিফোন নেই?
আছে। কিন্তু উনি একটা ভয়ংকর বিপদের মধ্যে আছেন।
তুমি কী করে জানলে?
গোপীনাথ বসুকে আমি ছেলেবেলা থেকে চিনি আর দাদা বলে ডাকি।
ওঃ, দ্যাটস গুড। কিন্তু বিপদের কথা কী বলছিলে?
উনি একটা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। আপাতত, ওঁর প্রাণসংশয়।
মনোজ একটু ভাবল। গোপীনাথ বসুকে সে ব্যক্তিগতভাবে চেনে না, সুতরাং তার বিপদে বিচলিতও সে হচ্ছিল না। সে বলল, বিপদটা কীরকম এবং কেন তা জানো?
খানিকটা জানি। ভিকিজ মব নামে একটা গুন্ডার দল ওঁকে চেজ করছিল। তারপর সাক্কির কর্তারাও ওঁর পিছনে মাফিয়া লাগিয়েছে।
কিন্তু কেন?
কারণ হল আদ্রেঁর মৃত্যু এবং তার গবেষণার কাগজপত্র। গোপীদা সেগুলো নিরাপদে রাখতে গিয়ে উলটে বিপদে পড়ে গেছেন।
মনোজ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, বেঁচে আছেন কি না জানো? যেরকম গুন্ডার কথা বলছ তাতে তো মনে হচ্ছে মর্টাল ডেনজারের মধ্যে আছেন।
হয়তো তাই।
মনোজ কাধ একটু ঝাঁকিয়ে বলল, তুমি আমার হয়ে সোনালিকে বোলো যে প্রসঙ্গটা উত্থাপন করেছি বলে আমি দুঃখিত।
ঠিক আছে স্যার, বলে দেব।
সুব্রত চলে যাওয়ার পর ঘড়ি দেখে মনোজ তার ফোন তুলে নিয়ে সোজা রোমের একটা নম্বর ডায়াল করল নোটবই দেখে।
কিছুক্ষণ পর একটা গমগমে গলা ফোনে ভেসে এল, হ্যালো… হ্যালো…হ্যালো…
মনোজ একটু হাসল। জার্মান ভাষায় বলল, গলাটা নামাও মার্ক।
মার্ক বলল, আরে সেন নাকি? কী খবর?
খবর ভাল নয়। আমাদের একটা বাজে সময় যাচ্ছে।
সেরকম তো সকলেরই হয়। ও কিছু নয়।
শোনো, তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।
বলে ফেলো।
তুমি সাক্কির একজন মস্ত কর্তা। খবরটা তোমার জানা উচিত।
কী খবর?
তোমাদের একজন সায়েন্টিস্ট আছে, গোপীনাথ বসু। চেনো?
কে না চেনে? সবাই চেনে। বিগ ম্যান।
তার কী খবর?
কেন, খবর তো ভালই হওয়ার কথা।
সে কি অফিসে আসে?
এক মিনিট ধরে থাকো। খবর নিয়ে বলছি।
মনোজ ধরে রইল।
একটু বাদে মার্ক বলল, না আসেনি আজ।
গতকাল কি এসেছিল?
না। মনে হচ্ছে ছুটি নিয়ে কোথাও গেছে। ওর বাড়িতে রিং করে দেখতে পারো।
তাতে লাভ নেই। তুমি আরও একটু খোঁজ নাও। আমি বাড়ি যাচ্ছি। রাতে আমাকে আমার বাড়িতে ফোন করে খবরটা জানাও জরুরি।
ঠিক আছে।
মনোজ তার কাজ শেষ করে বেরিয়ে পড়ল। বাড়িতে ফিরে ডিনার খেয়ে নিল। তারপর অপেক্ষা করতে লাগল।
রাত প্রায় দশটা নাগাদ মার্কের ফোন এল।
কী জানতে চাও?
মনোজ বলল, সবকিছু।
সবকিছু আমি জানি না। তবে আমি অফিশিয়াল সোর্সে খবর নিয়ে জেনেছি যে, সে বাড়িতে নেই, অফিসে আসছে না।
আনঅফিসিয়ালি কী জানো?
সেটা তোমাকে আনঅফিশিয়ালি বলছি। লোকটা খুব সাংঘাতিক বিপদের মধ্যে ছিল।
ছিল? পাস্ট টেন্স?
তাঁ। পাস্ট টেন্স। আমার সঙ্গে রোমের আন্ডারওয়ার্ল্ডের যোগাযোগ আছে। আমি তাদের কাছে জেনেছি, মিস্টার বোস অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে একটা প্রায় অসম্ভব অবস্থা থেকে পালিয়ে গেছে। নইলে মাফিয়া আর ভিকিজ মব তাকে প্রায় শেষ করে এনেছিল।
মাই গড! পালাল কীভাবে?
বোধহয় কারও সাহায্যে। আর কিছু জিজ্ঞেস কোরো না। জানি না।
তোমাকে ধন্যবাদ। শোনো, গোপীনাথ বসুকে আমার খুব দরকার। কোনও খবর পেলে জানাবে?
জানাব। তবে সে বোধহয় সাক্কিতে ফিরবে না। সেটা সম্ভব নয়। সাক্কি চারদিকে ওকে খুঁজছে। এটাও আনঅফিশিয়াল।
১৩.
রুমিং হাউস থেকে বেরিয়ে এসে যখন সামনের চাতালে একটা লাল টুকটুকে ছোট্ট স্পোর্টস কারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল গোপীনাথ, তখন তার বাঁ হাত ধরে যুবতীটি বারবার ঢলে পড়ছে তার গায়ে, ভীষণ মজার কথা বলছে এবং হাসছে। তারও হাসা এবং কিছু কথা বলা উচিত। কিন্তু গোপীনাথ কিছুতেই হাসতে পারছে না।
গোপীনাথ ভিতু নয়। বরং অত্যন্ত সাহসী। কিন্তু গত কয়েক দিনের কিছু ঘটনা তার ভিতরটাকে একেবারে নির্জীব করে ফেলেছে। আদ্রেঁর মৃত্যু এবং তার কাজকর্ম সম্পর্কে সাক্কির অতি-উৎসাহ। তার ওপর সোনালির শীতল প্রত্যাখান। গোপীনাথের ভিতরে একটা ভাঙচুর হয়েই গেছে। তাই সে যেন নিজের বশে ছিল না। যুবতীটি যথেষ্ট ভাল অভিনয় করছিল, কিন্তু গোপীনাথ পারছিল না। সে এর সঙ্গে কেন যাচ্ছে, কেন এরা তাকে ছদ্মবেশ পরিয়েছে কিছুই সে বুঝতে পারছিল না। সে তাই অভিনয়ও করছিল না।
