না।
বাঃ চমৎকার।
গোপীনাথ মৃদুস্বরে বলল, করিডরের পাহারাদার দু’জন কোথায় গেল?
কাছেপিঠেই আছে। ওদের কফি খেতে পাঠিয়েছি।
পাঠিয়েছেন? তার মানে কি ওরা আপনার লোক?
না মশাই, না। পাঠিয়েছি মানে কি আর আমার হুকুমে গেছে? টোপ ফেলে সরাতে হয়েছে। এবার কফি খেতে খেতে আপনার সমস্যার কথা বলুন।
সমস্যা! বলে গোপীনাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, সমস্যা বললে কিছুই বলা হয় না। আমি রয়েছি অন্তিম সংকটের মধ্যে। রামেও মারবে, রাবণেও মারবে।
তবু বলুন।
গোপীনাথ কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে চুপ থাকল। তারপর ধীরে ধীরে মুখ তুলে বলল, আপনি একজন বাঙালি। এইসব ঘটনার মধ্যে আপনি কী করে এসে পড়লেন বুঝলাম না। তবু আপনাকে বন্ধু বলে মনে হচ্ছে। তাই বলছি।
গোপীনাথ আদ্যোপান্ত তার সব ঘটনাই সংক্ষেপে বলে গেল।
সুধাকর চাপা গলায় বলল, আপনি এখন কী চান?
গোপীনাথ মাথা নেড়ে বলল, আপনি আমাকে বাঁচাতে পারবেন না। বাঁচার সম্ভাবনা আমার নেই। শুধু আমার বিষয়সম্পত্তিগুলো যাতে শয়তানদের হাতে না পড়ে এইটেই আমার চিন্তা।
কী করতে চান?
আমার প্রাক্তন স্ত্রীকে অনুরোধ করেছি আমার উত্তরাধিকারী হতে। তিনি রাজি হলে নিশ্চিন্ত হই।
এখনও রাজি হননি?
জানি না। ভায়া মিডিয়া কথা চলছে। একটা টেলিফোন থাকলে জেনে নিতাম।
টেলিফোন? দাঁড়ান।
বলে সুধাকর উঠে গিয়ে একটা কর্ডলেস রিসিভার এনে গোপীনাথের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, এটা স্ক্র্যাম্বলার। ট্যাপ করার ভয় নেই। করুন।
কিন্তু কলকাতায় এখন তো শেষ রাত।
তাতে কী? আপনার বিপদ চলছে। এখন কারও ঘুম ভাঙানো অপরাধ নয়।
গোপীনাথ সুব্রতর নম্বর ডায়াল করল।
সুব্রত, গোপীদা বলছি।
বলুন গোপীদা।
কী খবর? আমার চিঠি পেয়েছিস?
পেয়েছি।
সোনালি কী বলল?
আগে বলুন, আপনি কেমন আছেন?
এখনও মরিনি, বুঝতেই পারছিস।
বিপদ কি চলছে?
হ্যাঁ, ভীষণভাবে। সোনালি কী বলল?
নেগেটিভ।
তার মানে? উনি সম্পত্তি চান না।
বলল?
হ্যাঁ। উনি বললেন, আপনি টাকাপয়সা বিষয়সম্পত্তি নিয়ে একটু বেশি চিন্তা করেন। এটাই ওঁর অপছন্দ।
গোপীনাথ একটু চুপ করে থেকে বলল, ও।
গোপীদা, আমিও বলি, আপনি এসব নিয়ে ভাবছেন কেন? ওসব ভাবনা ছেড়ে দিন।
গোপীনাথ বলল, ঠিক আছে।
ভাল থাকুন গোপীদা। অল গুড উইশেস।
গোপীনাথ ফোনটা অফ করে মলিন মুখে রিসিভার ফিরিয়ে দিয়ে বলল, ধন্যবাদ।
সুধাকর একটু হাসল, সোনালিদেবী রিফিউজ করলেন বুঝি?
হ্যাঁ।
তা হলে কী হবে?
গোপীনাথ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, কে জানে। উড়ে পুড়ে যাক।
সুধাকর হঠাৎ চকিতে উঠে দরজার কাছে গিয়ে কান পাতল। তারপর ফিরে এসে বলল, আপনার পাহারাদাররা ওপরে গেল।
বিবর্ণ মুখে গোপীনাথ বলল, তা হলে কি আমার বিপদ?
না। এখনও নয়। বাঁপাশে একটা ছোট ঘর আছে। সেখানে নতুন পোশাক আর কিছু মেক-আপ আছে। আপনি কি ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারেন?
না।
চলুন দেখিয়ে দিচ্ছি।
ছদ্মবেশে কি কাজ হবে?
অন্তত একটা ঝুঁকি তো নিতেই হবে। আসুন, সময় নেই।
গোপীনাথকে নিয়ে সুধাকর ভিতরের ঘরটায় গেল এবং নিপুণ হাতে তার চেহারার পরিবর্তন ঘটাতে লাগল।
প্রায় আধঘণ্টা বাদে গোপীনাথ আয়নার দিকে চেয়ে নিজেকে একদম চিনতে পারল না। তাকে হুবহু একজন কাফ্রি বলে মনে হচ্ছে।
এবার কী হবে?
সুধাকর মৃদু হেসে বলল, লেট আস টেক এ চান্স। আপনাকে এ বাড়ি থেকে বের করে নিতে হবে। আসুন।
সুধাকরের পিছু পিছু গোপীনাথ বেরিয়ে এল। সঙ্গে সঙ্গেই আর একটা দরজা দিয়ে একটি মেয়ে বেরোল অন্য ঘর থেকে।
আপনি মেয়েটার একটা হাত ধরে ধীরেসুস্থে নামুন। তাড়াহুড়ো করবেন না।
ঠিক আছে।
নীচে গাড়ি আছে। কোনও দিকে তাকাবেন না।
গোপীনাথ মেয়েটার হাত ধরে নামতে লাগল। বুক কাঁপছে, পা টলছে। ধরা পড়ে যাবে নাকি গোপীনাথ?
১২.
উমাকান্ত প্রসাদের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। মাথাভরতি কাঁচাপাকা চুল। একটু আত্মভোলা কাজপাগল লোক। চোখ দুখানা সবসময়েই যেন অন্তর্গত কোনও চিন্তায় তন্ময় হয়ে আছে। বিহারের লোক এই মানুষটি মনোজ ও রোজমারির অনেকদিনের চেনা। পরিচয় জার্মানিতেই। প্রসাদ বিদেশে থাকা পছন্দ করছিলেন না। দেশে ফেরার প্রস্তাবে উজ্জ্বল সম্মতি দিয়েছিলেন। ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যালয়ের কেমিক্যাল ল্যাব-এর ভার পেয়ে খুব খুশি। প্রসাদের একটাই ছেলে, এখন সে আমেরিকায় পিএইচডি করছে।
সকালে অফিসে এসে প্রসাদের সঙ্গে গভীর আলোচনায় ডুবেছিল মনোজ। একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। মনোজের সন্দেহ হচ্ছে, তাদের তৈরি অ্যালয়টার উদ্দিষ্ট ব্যবহারযোগ্যতা ছাড়াও আরও কিছু উপযোগ আছে। সেটা তারা ধরতে পারছে না। কথাটা তাই নিয়েই।
প্রসাদ মাথা নেড়ে বলল, এই অ্যালয় সোজাসুজি অন্য কাজে লাগানো সম্ভব নয়। তবে কেমিক্যাল রি-অ্যাকশন ঘটিয়ে হতে পারে। আপনি বলার পর থেকে গত সাতদিন আমি দিনে প্রায় আঠারো-উনিশ ঘণ্টা ধরে নানারকম টেস্ট করেছি। কিছু পাইনি। তবে এও বলছি, টেস্ট আরও অনেক করা যায়।
পারলে আপনিই পারবেন।
আমি শুধু ভাবছি, এটা বুনো হাঁসের পিছনে ছোটা হচ্ছে কি না, সবটাই পণ্ডশ্রম হবে তো। মনোজ মাথা নেড়ে বলল, তা বোধহয় হবে না। এর আর একটা ইউজ নিশ্চয়ই আছে। ঘটনাগুলি অন্তত তারই সাক্ষী দেয়।
প্রসাদ গম্ভীর মুখ করে বলে, আদ্রেঁর মৃত্যুর কথা বলছেন?
সেটা অনেক ঘটনার মধ্যে একটা।
