তাই হবে।
একটু শিস দিতে দিতে হালকা পায়ে বাসিলোঁ এগিয়ে গেল।
সুপ্রভাত।
মেয়েটা যেমন অবাক তেমনি যেন শিহরিত। বড় বড় নিষ্পাপ চোখে চাইল, তারপর স্মিত হাসি হেসে বলল, সুপ্রভাত।
কী নাম তোমার?
সিসি। তোমার?
বাসিলোঁ। তুমি কি জানো, তুমি ভীষণ সুন্দর?
মেয়েটা যেন ভীষণ লজ্জা পেয়ে খুশির গলায় বলল, ধন্যবাদ।
তোমাকে তো আগে দেখিনি। নতুন নাকি?
মেয়েটা একটু অপ্রতিভ হয়ে বলল, আসলে আমার বাবা এ বাড়ির জ্যানিটার। আমি এখানে থাকি না, প্যারিসে রান্না শিখতে গিয়েছিলাম। ছুটিতে এসেছি। বাবাকে একটু বিশ্রাম দিতেই তার কাজ করে দিচ্ছি।
দুটো হাত ঘষাঘষি করতে করতে বাসিলোঁ বলল, ভাল, ভাল, খুব ভাল কথা।
মেয়েটা হঠাৎ ভ্রু কুঁচকে বলল, আচ্ছা, তোমরা এখানে বসে আছ কেন? কারও জন্য অপেক্ষা করছ নাকি?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওইরকমই কিছু। আচ্ছা, তোমার সঙ্গে কোথায় দেখা হতে পারে? ধরো যদি আজ সন্ধেবেলায় তোমাকে ডিনারে নেমন্তন্ন করি?
মেয়েটা আবার শিহরিত হল আনন্দে। রাঙা হয়ে বলল, সত্যি। উঃ, তা হলে তো ভীষণ মজা হয়। কিন্তু আজ নয়। আজ আমার বিকেলটা আগে থেকেই আর একজনকে দিয়ে রেখেছি।
সে কে?
কোনও বয়ফ্রেন্ড নয়। আমার এক বিধবা নিঃসন্তান বুড়ি পিসি৷ সে মারা গেলে তার সম্পত্তি আমিই পাব। পিসি রাগী মানুষ, তাকে খুশি রাখতেই হবে।
ঠিক আছে, ঠিক আছে। কাল হলেও হবে।
তোমরা দু’জন বুঝি বন্ধু?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমরা খুব বন্ধু।
ওর নাম কী? বেনভেনুটি। একজন প্রাক্তন হেভিওয়েট বক্সার।
বক্সার? আমি বক্সারদের খুব পছন্দ করি।
বাসিলোঁ একটু হেসে বলল, শুধু বক্সারদের? জানো তো, বক্সারদের মাথা মোটা হয়? আর আমাকে দেখো, দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক।
মেয়েটি খুব লজ্জা পেয়ে বলল, তুমিও ভাল। নিশ্চয়ই খুব ভাল তুমি।
আচ্ছা, আচ্ছা। আমি ভাল কিনা সেটা তো তুমি বিচার করতে পারবেই। কাল সন্ধেবেলা তা হলে?
মেয়েটি ফের যেন লাল হল। বলল, আমার হাতে এখন একটু সময় আছে। তোমাদের দু’জনকে আমি কফি আর কুকি খাওয়াতে পারি।
পারো! কী ভাল কথা! সত্যিই পারো?
হ্যাঁ। এর ঠিক নীচের তলাতেই আমার ঘর।
কেন, তুমি তোমার বাবার সঙ্গে থাকে না?
আমাদের জায়গা হয় না। তাই দোতলায় একটা ছোট ঘর নিয়ে আছি। এসো না, তোমার বন্ধুকেও ডাকো।
একটা হাই তুলে বাসিলোঁ বলল, একটু অসুবিধে আছে। এখানে একজনকে মোতায়েন থাকতেই হবে।
কেন বলো তো!
আমাদের এক বন্ধুর ওপর নজর রাখতে হচ্ছে।
ও, তা হলে থাক।
কেন, থাকবে কেন? আমি তো যেতে প্রস্তুত।
মেয়েটি হঠাৎ একটু গম্ভীর হয়ে বলল, থাক, পরে হবে।
ওঃ, তুমি তো দেখছি সত্যিই বক্সারদের খুব পছন্দ করো। শোনো, আমি বক্সার না হলেও আমার অন্য বিদ্যে জানা আছে। আমি সার্কাসে খেলা দেখাতাম, জানো? ট্রাপিজের খেলা।
মেয়েটা চোখ বড় বড় করে বলল, তাই!
বাসিলোঁ হাসল, এবার খাওয়াবে কফি?
মেয়েটা একটু দুষ্টু হাসি হেসে বলল, তোমার চোখ দেখে মনে হচ্ছে, একা ঘরে তোমার সঙ্গে কিছুক্ষণ সময় কাটানো বিপজ্জনক। আমার একজন দেহরক্ষী দরকার।
বাসিলোঁ হেসে বলল, বুঝেছি।
তারপর ফিরে সে বেনভেনুটিকে ডেকে বলল, কিছুক্ষণের জন্য একটা কফি ব্রেক নেওয়া যাবে কি?
বেনভেনুটি প্রায় নিরবচ্ছিন্ন সিগারেট খায়। বলল, না।
একটি সুন্দরী মেয়ের সম্মানেও নয়? সিসি তোমাকে খুব পছন্দ করেছে।
কাজটা উচিত হবে না।
আরে ওই ইন্ডিয়ানটা তো নড়াচড়াই করছে না। বোধহয় এখন ঘুমোচ্ছে।
কত কী ঘটে যেতে পারে।
দশ মিনিটে কিছুই ঘটবে না, সাত দিনে যখন ঘটেনি। সিসির বক্সারকে পছন্দ।
বেনভেনুটি গড়িমসি করে উঠল। বলল, দশ মিনিট, তার বেশি নয় কিন্তু।
আরে না। এসো, এর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই।
তিনজনে কথা বলতে বলতে নীচের তলায় নামল। মেয়েটি তাদের করিডরের শেষ প্রান্তে একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দোতলার সিঁড়ির মুখোমুখি আর একটা ঘরের দরজা খুলে হরিণের পায়ে ওপরে উঠে এল সুধাকর দত্ত। সোজা গিয়ে গোপীনাথের দরজায় টোকা দিয়ে বলল, দরজাটা খুলুন। তাড়াতাড়ি।
গোপীনাথ বাংলা কথা শুনে তাড়াতাড়িই দরজা খুলল।
সুধাকর চাপা গলায় বলল, শিগগির আসুন। পাসপোর্টটা নিয়ে।
কোথায়?
কথা বলার সময় নেই। প্লিজ।
গোপীনাথ পাসপোর্ট নিয়ে বেরিয়ে এল। সুধাকরের পিছু পিছু দোতলায় নেমে এল সে। সুধাকর তার ঘরের দরজা খুলে গোপীনাথকে প্রায় টেনে ঢুকিয়ে নিল ঘরে। তারপর দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে বলল, এখন আপনি অনেকটা নিরাপদ।
গোপীনাথ বলল, আপনি কে?
সুধাকর হাত তুলে বলল, এসব প্রশ্নের জবাব পরে দেব। আমি কে জেনে আপনার লাভ নেই। শত্রুও হতে পারি, মিত্রও হতে পারি। সমুদ্রে শয়ান যার, শিশিরে কি ভয় তার? আপনার তো মশাই, জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ। তাই নয় কি?
গোপীনাথ ক্লিষ্ট একটু হেসে বলল, তা বটে।
বসুন। একটু কফি খেয়ে গলাটা ভিজিয়ে নেবেন?
তা খেতে পারি।
খান মশাই, আপনার এখন অনেক কিছু বলার আছে।
আমার ওপর কিন্তু সারাক্ষণ নজর রাখা হচ্ছে। আপনি যে আমাকে নিয়ে এলেন এটা ওরা টের পাবে না?
এখনই পাবে না। কারণ ওরা আপনার ঘরের দরজাটা শুধু নজরে রাখে, আর আপনি বেরোলে পিছু নেয়, তাই না?
হ্যাঁ।
তা হলে কিছুক্ষণের জন্য নিশ্চিন্ত। আপনার ঘরে কি ফোন আছে?
