আপনি ভুল বুঝছেন।
সোনালি মাথা নেড়ে বলল, ভুল বুঝব কেন? আমি ঘর করেছি বলেই জানি। পরিণতিটাও দেখুন, একটাও নিজের জন নেই লোকটার, ওর টাকা হাত পেতে নেওয়ার লোক নেই। ওর তো এরকমই হওয়ার কথা।
আপনি একটু ভুল বুঝছেন ম্যাডাম।
সোনালি একটা তীব্র হেসে বলল, ভুল বুঝলে তো ভালই হত। আপনিই দেখুন, বিপদে পড়েও এখন শুধু ওর বিষয়সম্পত্তি আর টাকার কথাই ভাবছে।
সকলেই তো তাই ভাবে। মরার সময়ে যাবতীয় উত্তরাধিকার কাউকে দিয়ে যেতে চায়।
ওটা মানি-সেন্ট্রিকের ভাবনা।
সুব্রত কী একটা বলতে গেল, কিন্তু জুতসই কিছু খুঁজে পেল না। চুপ করে রইল।
সোনালি মৃদু স্বরে বলল, ওকে বলে দেবেন ওর টাকায় আমার দরকার নেই।
সোনালিদি, আপনি বড্ড নিষ্ঠুরতা করছেন। একটু ভেবে বলুন।
আমার ভাবনাচিন্তা অনেক আগেই হয়ে গেছে। আমি কোনওভাবেই গোপীনাথ বসুর উত্তরাধিকারী নই।
তা হলে কী হবে সোনালিদি?
কী আবার হবে। ওর সব টাকাপয়সা বাড়ি গাড়ি সরকার নিয়ে নিক। আমার দরকার নেই।
সুব্রত তবু কিছুক্ষণ বসে রইল। সোনালি তার স্যান্ডউইচ আর খেল না। তুলে বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দিল। কফিটাও আর ছুঁল না।
সোনালিদি, আমাকে আজ একটা কথা বলবেন?
কী কথা?
গোপীদাকে আপনি এত অপছন্দ করেন কেন?
অপছন্দ করার মতো বলেই।
এর বেশি কিছু বলবেন না?
আজ থাক সুব্রতবাবু, অন্য দিন বলব।
গোপীদা কি হৃদয়হীন?
সোনালি একটু চুপ করে থেকে বলল, তাই তো মনে হয়।
আমি ছেলেবেলা থেকে ওকে চিনি, আপনি তো জানেন।
জানি। পুরনো কথা শুনে আমার লাভ নেই। গোপীনাথ জীবনে যা চেয়েছে পেয়েছে। তার বেশি কিছু চায়নি, পায়নি।
সুব্রত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠল।
পরদিন রাত প্রায় দশটায় গোপীনাথের ফোন এল তার বাড়িতে।
সুব্রত, গোপীদা বলছি।
হ্যাঁ, গোপীদা, ওদিককার কী খবর?
খবর ভাল নয়। জাল গুটিয়ে আনছে।
তার মানে?
মেয়াদ খুব কম। সোনালি কী বললে?
ভেবে বলবে।
গোপীনাথ একটু চুপ করে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, জানতাম।
১১-১৫. লক্ষ করো বেনভেনুটি
লক্ষ করো বেনভেনুটি, ওই যে মেয়েটি করিডর ঝাড়ু দিচ্ছে, ওর মতো উরু তুমি কখনও দেখেছ? ওরকম যার ঊরু সে কোন দুঃখে জ্যানিটরের কাজ করছে বলতে পারো? এ তো কোটিপতিদের শয্যাসঙ্গিনী হতে পারে।
বেনভেনুটি নামক গরিলার মতো বলবান লোকটি করিডরের সিঁড়ি ও লিফটের মুখোমুখি একটা পাথরের মূর্তির আড়ালে দুটি চেয়ারের একটিতে বসে খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে সিগারেট খেতে খেতে বলল, বাসিলোঁ, লক্ষ করাই আমার কাজ।
বাসিলোঁ ছিপছিপে এবং বেশ লম্বা। তার দেহ-গঠনে একটা চিতা বাঘের মতো তৎপরতা আছে। বয়সে সে বেনভেনুটির চেয়ে অন্তত আট-দশ বছরের ছোট। বেনভেনুটির যদি মধ্য ত্রিশ তা হলে এ ছেলেটি পঁচিশ হতে পারে। দু’জনের পরনেই জিক্স এবং ঊর্ধ্বাঙ্গে গরম জ্যাকেট। রোমে একটু শীত পড়তে শুরু করেছে। বাসিলোঁ তরল গলায় বলল, তুমি কি ইমপ্রেসড নও?
অবশ্যই। সুন্দরী মেয়েরা বরাবরই আমাকে ইমপ্রেস করে থাকে।
বেনভেনুটি, তুমি ভাল করে মেয়েটাকে দেখোনি। আমার মনে হচ্ছে, মেয়েটা আমাদের লোভাতুর করতে চাইছে। বুঝলে! ঠিক একজন ব্যালেরিনার মতোই চমৎকার ভঙ্গিতে ঘুরে ঘুরে কেমন ঝাড়ু চালাচ্ছে দেখো।
বেনভেনুটি মাথার টুপিটা ভ্রু পর্যন্ত টেনে নামিয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, মিনি স্কার্ট পরা কোনও ঝাড়ুদার আমি দেখিনি কখনও বাপু।
মেয়েটা বোধহয় নতুন কাজ পেয়েছে। একটু আলাপ করে আসব?
আসতে পারো। তবে বেশি মজে যেয়ো না। ওর হয়তো বয়ফ্রেন্ড আছে, কিংবা স্বামী।
তুমি সত্যিই বুড়ো হয়েছ। দেখো, দেখো, মেয়েটার মুখখানা কী সুন্দর! এতক্ষণ পিছন ফিরে ছিল বলে মুখটা দেখা যায়নি। সোনালি চুল, নীল চোখ এবং অসাধারণ ঠোঁট।
মেয়েমানুষই তোমাকে খেলো, বাসিলোঁ।
আহা, গত সাতদিন ধরে একঘেয়ে যে কাজটা আমাদের করতে হচ্ছে সেটাই বা কোন মজার কাজ? একটা ভিতুর ডিম ইন্ডিয়ান তার ঘরে দরজা বন্ধ করে দিন-রাত বসে আছে আর আমরা বাইরে বসে মাছি তাড়াচ্ছি।
ইন্ডিয়ানটা হয়তো ইম্পর্ট্যান্ট লোক। আমাদের কাজ নজর রাখা, রাখছি।
তুমি কি জানো, বেনভেনুটি, যে পৃথিবীতে সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট লোকগুলোই হয় সবচেয়ে বেশি বোর?
জানি।
এ লোকটা যদি একটু পালানোটালানোর চেষ্টা করত তা হলেও না হয় হত। এ তো শুধু মাঝে মাঝে নীচের ল্যান্ডিং-এ গিয়ে ফোন করে, আর রাস্তার ওপাশে সুপার স্টোরে কেনাকাটা করতে যায়। কোনও অ্যাডভেঞ্চারই নেই। আমাকেও ও চিনে ফেলেছে। ওর গায়ের সঙ্গে লেগে লেগে তো আমাকেই থাকতে হচ্ছে।
আমাদের যা করতে বলা হয়েছে তা ছাড়া আমাদের কিছু করার নেই বাসিলোঁ। আমরা এ কাজের জন্য যথেষ্ট টাকা পাচ্ছি।
লোকটাকে এক-আধটা ঘুসি মারা কি বারণ?
হ্যাঁ, বারণ। ওর গায়ে হাত দেওয়া যাবে না। হয়তো সময়মতো ওকে খুন করা হবে এবং সে ভার পাবে হয়তো বা তুমিই।
চমৎকার। আমি সেই হুকুমটার জন্যই অপেক্ষা করছি। কিন্তু বেনভেনুটি, মেয়েটা যে বড্ড কাছে এসে পড়েছে এবং আমাকে কটাক্ষও করল বোধহয়।
ঠিক আছে, এগিয়ে যাও। এখন সকাল আটটা বাজে, সন্ধে ছ’টায় আমাদের জায়গা নিতে আসবে দিনো আর নিনো দুই ভাই। যদি মেয়েটার সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে চাও সেটা ছ’টার পরে যেন হয়।
