সোনালিকে আমার অসহায় অবস্থার কথা বোলো। আমার অ্যাটর্নি কয়েকদিনের মধ্যেই ওর সঙ্গে যোগাযোগ করবে। ও যেন প্রত্যাখ্যান না করে। ওকে রাজি করানোর ভার তোমার ওপর ছেড়ে দিলাম।
রোমে আমার একটা ভিলা আছে। আছে কিছু শেয়ার আর নগদ টাকা। খুব কম করে ধরলেও সব মিলিয়ে দশ কোটি টাকার ওপর হবে। সোনালি বিদেশে থাকা পছন্দ করে না। যদি চায় অ্যাটর্নি মারফত বিক্রি করে সব টাকা কলকাতায় ওর অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে নিতে পারে। আর যদি আসে তা হলে তো নিজেই সব বুঝে নিতে পারবে। যদি বেঁচে থাকি সাতদিন বাদে আমি তোমাকে ফোন করব। সোনালি রাজি হল কি না জানার জন্য উদগ্রীব রয়েছি। ভালবাসা জেনো। গোপীদা।
.
চিঠিটা পেয়ে সুব্রতর মন খারাপ হয়ে গেল। এতটাই খারাপ যে, চোখে জল এল তার। গোপীনাথ শুধু তার ডাকের দাদা নয়, গোপীনাথ ছিল তার আশৈশব হিরো। মেধাবী, সাহসী ও প্রচণ্ড প্রাণবান গোপীনাথ যাতে হাত দিত তাতেই সোনা ফলিয়ে তুলতে পারত। চমৎকার অভিনয় করত, মূর্তি বানাত, ছবি আঁকত, বাচ্চাদের ব্যায়াম শেখাত। তবে গোপীনাথ ছিল গরিব। কষ্ট করে, লড়াই করে বড় হয়েছে। চিররুণ বাবা গোপীনাথের কিশোরবয়সেই মারা যান। মা মারা গেলেন গোপীনাথ কলেজে ভরতি হওয়ার আগেই। গোপীনাথের দিদি সুন্দরী ছিলেন বলে অল্পবয়সেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল এবং বিয়ের পরই যে বিদেশে চলে গিয়েছিলেন, আর বড় একটা আসতেন না। গোপীনাথ প্রায় একা একা জীবন কাটিয়েছে। মা মারা যাওয়ার পর থেকেই গোপীনাথ শুধু লেখাপড়া আর চিন্তাভাবনায় সময় কাটাত। ছাত্র অবস্থা থেকেই চেষ্টা করত বিদেশে চলে যাওয়ার। শেষ অবধি গেল। আমেরিকায়। দারুণ সব রেজাল্ট করল, বড় চাকরি পেল। তারপর সাধের বিয়ে।
সুব্রত আজও বিয়ে ভাঙার আসল কারণ জানে না। গোপীনাথ ভেঙে কিছু বলেনি কখনও। কিন্তু সোনালির সঙ্গে একটা যোগাযোগ সুব্রতর ছিল বরাবর। বিয়ের আগে থেকেই চেনা। এই যে সোনালি আর সে একই কোম্পানিতে চাকরি করে এটা কোনও অ্যাক্সিডেন্ট নয়, একটি ধুরন্ধর মাথার ঠান্ডা, হিসেব করা প্ল্যানিং। গোপীনাথ বসু দুর থেকে কলকাঠি নেড়ে এটা ঘটিয়েছে। সোনালি জানে না, সুব্রত জানে। কিন্তু গোপীদা কেন এটা ঘটিয়েছে তা স্পষ্ট জানে না সুব্রত।
চিঠিটা পেয়ে সুব্রত কিছুক্ষণ বিমূঢ় হয়ে বসে রইল। গোপীদা যদি খুন হয় তবে তার ভীষণ খারাপ লাগবে। লোকটা জীবনে কখনও সুখ পায়নি। টাকা রোজগার করেছে অনেক, কিন্তু সেই টাকারও ভাগীদার নেই, গোপীদা এমনই দুর্ভাগা। একটি দুঃখী লোক বিদেশ বিভুয়ে অকারণে গুন্ডাদের হাতে খুন হবে, ভাবতেই তার বুক হাহাকার করে।
পরদিন অফিসে এসেই সুব্রত সোনালির ঘরে ফোন করে বলল, ম্যাডাম, একটু কথা আছে।
কী কথা?
একটু সময় লাগবে। লাঞ্চে কি ফ্রি আছেন?
লাঞ্চ বলে কিছু তো আমার নেই। তবে বেলা একটায় সময় দিতে পারব।
তা হলে ওই কথাই রইল।
সোনালি কম কথার মানুষ। বেশ ব্যক্তিত্বও আছে। সোনালি কেন গোপীদাকে পছন্দ করতে পারেনি সেটা আজও রহস্য রয়ে গেল সুব্রতর কাছে।
লাঞ্চ পর্যন্ত সুব্রত আজ অন্যমনস্ক রইল। কাজে তেমন মন বসল না। বেলা একটায় ফোন করল সোনালিকে।
সোনালিদি, আর ইউ ফ্রি নাউ?
হ্যাঁ।
আমি কি আপনার ঘরে আসব?
আসুন।
সুব্রত যখন সোনালির ঘরে গিয়ে ঢুকল, তখন সোনালি নিশ্চিন্তে বসে বাড়ি থেকে আনা স্যান্ডউইচ আর কফি খাচ্ছে। বাঁ হাতে একটা টাইপ করা চিঠি দেখছে। সোনালি সবসময়ে কাজ ভালবাসে।
তার দিকে বড় বড় চোখ করে চেয়ে সোনালি বলল, কী ব্যাপার বলুন তো। বেশ টেনশ দেখাচ্ছে আপনাকে।
হ্যাঁ। আমি একটু টেনশনেই আছি।
বসুন।
সুব্রত বসে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। কী করে কথাটা বলবে তা সে গুছিয়ে আসেনি। একটু এলোমেলো লাগছে ভিতরটা।
বলুন। বলে সোনালি খুব গা ছেড়ে বসল।
সুব্রত সামান্য একটু দ্বিধা করে পকেট থেকে গোপীনাথের চিঠিটা বের করে সোনালির হাতে দিয়ে বলল, এ চিঠিটা পড়ুন।
কার চিঠি?
পড়লেই বুঝবেন।
চিঠিটা যতক্ষণ পড়ল সোনালি ততক্ষণ তার মুখের দিকে চেয়ে রইল সুব্রত। ভাবান্তর দেখার জন্যই।
ভাবান্তর হল। মুখটা ধীরে ধীরে শুকিয়ে যেতে লাগল। ভীষণ গম্ভীর হয়ে গেল সোনালি। ভ্রু কুঁচকে রইল। চিঠিটা পড়া শেষ করে সুব্রতর দিকে নীরবে চেয়ে রইল সোনালি।
সুব্রত বলল, কিছু বুঝলেন?
কী বুঝব?
গোপীদা আপনার একটা জবাব চাইছে।
সোনালি ভীষণ বিরক্ত হয়ে বলল, আঃ, ও তো বিষয়সম্পত্তির কথা। তা দিয়ে আমার কী হবে?
কিন্তু গোপীদা যে—
সোনালি কেমন যেন লাল হয়ে বলল, একটু চুপ করবেন? আমাকে ভাবতে দিন।
সুব্রত থতমত খেয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পরে সোনালি বলল, ও টেলিফোনে অ্যাকসেসেবল নয়। তা হলে কী করে যোগাযোগ করবেন?
চিঠি।
চিঠি? বলে যেন অবিশ্বাসের চোখে চেয়ে রইল সোনালি। তারপর বলল, চিঠি পৌঁছোতে তো সময় লাগবে।
তা ছাড়া উপায় কী? সাতদিন বাদে টেলিফোন করবেন বলে লিখেছেন। আমার হিসেবে আগামীকাল। কিছু বলতে হবে?
না। আমার কথা ওকে কিছু বলবেন না, প্লিজ।
তা হলে?
সোনালি একটু চুপ করে থেকে বলল, টাকার লোভ যে একটা মানুষকে কতখানি নষ্ট করে ফেলে।
কার কথা বলছেন?
আপনার গোপীদার কথা।
গোপীদা কি লোভী?
আর কী বলা যায় বলুন তো! ভূতের মতো খাটে, দু’হাতে পয়সা রোজগার করে, এ ছাড়া আর কী করে আপনার গোপীদা? জীবনটা কি ওরকম? শুধু কাজ আর টাকা?
