ঠিক যে ধরনের আপাত-অসম্ভব জ্বালানির কথা আদ্রেঁ ভেবেছিল তা সত্যিই তৈরি হলে শুধু সাক্কির আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রই উড়বে না, তার চেয়েও অনেক বড় কাজ হবে, আদিগন্ত ভবিষ্যতের জন্য মানুষের জ্বালানি সমস্যারও সমাধান হয়ে যেতে পারে।
যে অ্যালয় নিয়ে বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার কাজ করছিল আদ্রেঁ, সেটি কলকাতা এবং পৃথিবীর আরও কয়েকটি জায়গায় তৈরি হয়। কিংবা আরও অন্য কোনও ধাতু বা সংকর ধাতু নিয়ে সে কাজ করছিল। আমি সঠিক জানি না, কিন্তু তার এই কাজ সম্পূর্ণ করার জন্য আর একজন আদ্রেঁ দরকার। নইলে একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে ব্যর্থ হয়ে যাবে এত বড় একটা প্রয়োজনীয় আবিষ্কার। ধ্বংসের বিজ্ঞান থেকে অন্তত এটুকু সদর্থক একটা কিছু বেরিয়ে এলে আমি খুশি হতাম। তা হল না, কোন মূর্খ ঘাতক তাকে খুন করে দিল।
আজই আদ্রেঁর অটোপসির রিপোর্ট আমরা পেয়েছি। তার মৃত্যু হয়েছিল অত্যাধুনিক বিষে। খুব সূক্ষ্ম পরীক্ষা ছাড়া যা ধরাই যায় না। হার্ট অ্যাটাকের সমুদয় লক্ষণ নিয়েই মানুষ মারা যায়। তবু সন্দেহের বশে তার ময়নাতদন্ত করা হয়েছে বিশেষজ্ঞ দিয়ে।
জানি না ভিকিজ মব-ই তাকে মেরেছে কি না। যদি তারাই এ কাজ করে থাকে তা হলে তাদের অবিলম্বে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া দরকার। জানি তা সম্ভব নয়। এই পৃথিবীতে যা কিছু অসুন্দর, নিষ্ঠুর ও দুষণীয় তা দুর করা যায়নি, যাবেও না। কিন্তু আদ্রেঁর মৃত্যু যে আমাদের কতখানি ক্ষতি করল তা তোমাকে বোঝাতে পারব না। আমি বড় অসহায় বোধ করছি।
সুব্রত, তোমাকে সবই বুঝিয়ে লিখলাম। ভিকিজ মব আমার ওপর সর্বত্র ও সর্বক্ষণ নজর রাখছে বটে, কিন্তু আমার কাজে এখনও বাধা দিচ্ছে না। তার কারণ আদ্রেঁ মারা যাওয়ায় আমাদের প্রোজেক্ট এক বিরাট ধাক্কা খেয়েছে। আরে অসমাপ্ত কাজ শেষ করার মতো কেউ নেই। আশা করছি ভিকিজ মব কয়েকদিনের মধ্যে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে নিরস্ত হবে। কিন্তু বিপদ আসছে অন্যদিক থেকে। অপ্রত্যাশিত বলব না, এরকম যে ঘটবে তা আমি জানতাম।
বিপদটা হল, সাক্কি ইনকরপোরেটেডের কর্তৃপক্ষ গন্ধ পেয়ে গেছে যে, আদ্রেঁর গবেষণার ভিতরে সোনার খনি রয়েছে। সাধারণত তাদের ভাড়াটে বৈজ্ঞানিকরা কী কাজ করে সে সম্পর্কে সাক্কি কর্তৃপক্ষ ততটা খবর রাখে না। তাদের মূল লক্ষ্য ব্যাবসা এবং মুনাফা। তুমি তো জানোই, এই জ্বালানির ব্যাপারে আজ সারা পৃথিবী জুড়ে কীরকম প্রচেষ্টা চলছে। এই নতুন রকেট ফুয়েল শুধু আইসিবিএম নয়, সামান্য হেরফের ঘটিয়ে প্রায় সব ব্যাপারেই এই জ্বালানিকে কাজে লাগানো যাবে, যদি না কোনও বিষাক্ত প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু আপাতত সাক্কি এ ব্যাপারে খুবই আগ্রহী হয়ে উঠেছে। গত পরশু সাক্কির বোর্ড অফ ডিরেক্টরস আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিল। তাদের হাবভাব আমার ভাল লাগছে না। নানারকমভাবে তারা আমার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তারা বলছে প্যারিস থেকে পালিয়ে আসার পর আদ্রেঁর কাগজপত্র সরানো এবং ফটোকপি করা ইত্যাদির সব খবরই তারা রাখে। তাদের সন্দেহ আমার উদ্দেশ্য খুবই অসাধু। আমি তাদের ভিকিজ মবের কথা বুঝিয়ে বলেছি, কিন্তু তারা সেটা বিশ্বাস করছে না। আমার দূরভিসন্ধিমূলক কাজকর্ম তারা বরদাস্ত করতেও রাজি নয়। আরে যাবতীয় কাজকর্মের ফটোকপি তাদের হাতে আমি তুলে দিয়েছি, কিন্তু তারা তাতেও খুশি নয়। আমার কাছ থেকে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পেলে তারা সহজে ছাড়বে না আমাকে।
কাজেই ভিকিজ মব-এর সঙ্গে সাক্কির ভাড়াটে গুন্ডারাও আমার ওপর নজরদারি করছে। আপাতত রোম ছেড়ে আমার কোথাও যাবার উপায় নেই। ল্যাবরেটরিতে আমার প্রবেশ নিষেধ হয়েছে। সাক্কি যাদের কাজে লাগিয়েছে তারা সিসিলির মাফিয়া। চোখের পলকে খুন করে বসে।
আমি বেঁচে থাকার কোনও আশা দেখছি না। মৃত্যু অবধারিত বলেই মনে হচ্ছে। তবে তুমি তো জানোই, কাজ ছাড়া বেঁচে থাকাটাও আমার কাছে অর্থহীন। আমার মনে হয় না সাক্কি আমাকে কাজ করতে দেবে। আমি জীবনের আশা ছেড়ে দিয়েছি।
আমার বিষয়সম্পত্তি নিয়েই প্রশ্ন। তুমি তো জানোই যে, আমার নিকট আত্মীয়স্বজন বলতে কেউ নেই। মা-বাবা গত হয়েছেন। আমার দিদি সম্প্রতি আমেরিকায় মারা গেছেন। তার ছেলেমেয়েরা আছে বটে, কিন্তু তারা আমাকে চেনেও না। সুতরাং আমার উত্তরাধিকারী বলে কেউ নেই। একমাত্র সোনালি আছে–যে আইনত আমার কেউ নয়, কিন্তু একসময়ে সে আমার স্ত্রী ছিল। এখানে আমি আমার অ্যাটর্নি মারফত যাবতীয় সম্পত্তি সোনালির নামে ট্রান্সফার করার ব্যবস্থা করেছি। তাকে সরাসরি এ কথা জানানোর উপায় আমার নেই। কারণ আমার প্রতি তার একটা ঘৃণার ভাব আছে। অতীত যে কত বড় বর্তমান হয়ে বাধার সৃষ্টি করে। সে যাক, খবরটা তুমিই তাকে দিয়ো। আমি জানি তার তেমন আর্থিক সচ্ছলতা নেই। ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যালয়ের চাকরি থেকে প্রাপ্ত বেতন থেকে তাকে বাপের বাড়ির জন্য অনেকটাই খরচ করতে হয়। সে আমার কাছ থেকে খোরপোষ বা ক্ষতিপূরণ বাবদও কিছু নেয়নি। হয়তো এবারও নেবে না। কিন্তু আমার তো আর কেউ নেই। তাকে বোলো, গ্রহণ করলে আমি বড় শান্তি পাব।
আমাকে আমার অ্যাপার্টমেন্ট ছাড়তে হয়েছে। আমি একটা রুমিং হাউসে। এখানে টেলিফোন আছে বটে, তবে পাবলিক ফোন। সাক্কি আপাতত আমার অ্যাপার্টমেন্টের চার্জ নিয়েছে। কেন তা জানি না। আমি হয়তো বা গৃহবন্দি, কারণ, সবসময়ে একটা অস্বস্তি বোধ করছি। আমার চারদিকে অনেক নজরদার।
