হ্যাঁ হ্যাঁ, সেটাও একটা পয়েন্ট।
সোনালি এবার সুধাকরের চোখে অকপট চোখ রেখে ঠান্ডা গলায় বলল, আপনি নিশ্চয়ই গালগল্প করতে আমার কাছে আসেননি। কী জানতে চান স্পষ্ট করে বলুন তো।
খুবই বিব্রত হয়ে সুধাকর কফির কাপটা রেখে বলল, এই দেখুন আমি আপনাকে ডিস্টার্ব করে ফেললাম। আসলে আমি একটু মাঠো লোক। কিছু মনে করবেন না। আমার বোধহয় এখন বিদায় নেওয়াই উচিত, কী বলেন?
ভ্রু কুঁচকে সোনালি বলল, প্রয়োজন শেষ হয়ে থাকলে অবশ্যই বিদায় নেবেন।
সুধাকর উঠতে গিয়েও ফের বসে পড়ে বলল, প্রয়োজন! প্রয়োজনের কথা বলেই মুশকিলে ফেললেন। আপনার কম্পানিটাই এত লোভনীয় যে সেটাকেই প্রয়োজন বলে ধরে নেওয়া যায়।
মিস্টার দত্ত, ফ্ল্যাটারি আমি পছন্দ করি না।
সুধাকর খুবই অপ্রতিভ হয়ে বলল, যথার্থ বলেছেন। ফ্ল্যাটারি জিনিসটা বোধহয় ভালও নয়। তবু মানতেই হবে যে, জিনিসটা খুবই প্রয়োজনীয়। অবস্থা বিশেষে খুবই কাজে লাগে।
কিন্তু ভুল জায়গায় হলে উলটো ফল হতে পারে।
সুধাকর দত্ত ঘনঘন নেতিবাচক মাথা নাড়া দিয়ে বলল, আমি আপনাকে মোটেই ফ্ল্যাটারি করিনি। এ যুগের প্রয়োজন অনুযায়ী যেমন হওয়া উচিত আপনি ঠিক তেমনই। আপরাইট, স্পষ্টবক্তা এবং সাহসী। ইউ আর রিয়েলি এ গুড কম্পানি।
আপনার কথা কি শেষ হয়েছে মিস্টার দত্ত?
হ্যাঁ হ্যাঁ, এবার আমি উঠব।
আসুন নমস্কার।
হ্যাঁ হ্যাঁ, নমস্কার। আচ্ছা মিস সোম, লাল গোলাপের ব্যাপারটা কি একটু বলতে পারেন?
লাল গোলাপ?
গুজবই হবে। তবে শুনেছি রোজমারি সেনকে কে বা কারা লাল গোলাপ পাঠিয়ে থ্রেট করেছে!
সোনালি ফের ভ্রু কোঁচকায়। তারপর বলে, থ্রেট হবে কেন? হয়তো কেউ রসিকতা করেছে।
আপনি তাই মনে করেন?
আমার মনে করায় কী আসে যায় বলুন।
তা বটে। তবে আমাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব ব্যক্তিগত কিছু ডিডাকশন আছে। আপনার ডিডাকশন কী বলে?
সেটা তো বললামই।
রসিকতা? তা হলে তাই হবে। কিন্তু এরকম রসিকতা কে করতে পারে বলুন তো!
তা জানি না। তবে মিসেস সেনের অনেক বন্ধু আছে কলকাতায়।
তাই নাকি?
হ্যাঁ।
সুধাকর কিছুক্ষণ চিন্তিত মুখে সোনালির দিকে চেয়ে থেকে হঠাৎ বলল, অঙ্কটা মিলছে না।
কীসের অঙ্ক?
আমার ব্যক্তিগত ডিডাকশন। সেখানে কিছু গণ্ডগোল হচ্ছে।
তার মানে?
আদ্রেঁ এবং লাল গোলাপ দুটো এক হাতের কাজ নয়। বাট হু ইজ দি সেকেন্ড পার্টি?
কী বলছেন আমি বুঝতে পারছি না।
সরি। আই ওয়াজ জাস্ট থিঙ্কিং অ্যালাউড।
তাই নাকি?
আজ্ঞে হ্যাঁ। আচ্ছা, রোজমারি বোধহয় খুবই বুদ্ধিমতী। না?
হ্যাঁ।
এই প্রোজেক্টটা কি উনিই চালান?
তা কেন? মিস্টার সেনও আছেন।
দু’জনের মধ্যে কাকে আপনার বেশি এফিশিয়েন্ট বলে মনে হয়?
দু’জনকেই সমান এফিশিয়েন্ট বলে মনে হয়।
ঠিক আছে ঠিক আছে। আমি আপনাকে কিছু কমিট করতে বলছি না। জাস্ট সিম্পল কৌতূহল। কিছু মনে করবেন না।
মনে করিনি। কিন্তু এখন আমি কাজ করব।
ছি ছি, সত্যিই আমি একটা ইডিয়ট। আপনার মূল্যবান সময় অনেকটা নষ্ট করলাম। আসি তা হলে?
আসুন।
সুধাকর উঠল এবং দরজার কাছ বরাবর গিয়ে ফিরে এল।
আচ্ছা মিস সোম এই যে অ্যালয়টা এঁরা তৈরি করছেন এর কোনও পিকিউলিয়ার ইউসেজের কথা কি আপনি কিছু জানেন?
সোনালি একটু হেসে বলল, আমি নন-টেকনিক্যাল হ্যান্ড। আমার কাজ করেসপন্ডেন্স অ্যান্ড অফিস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। ওসব ব্যাপার আমার জানার কথা নয়।
তাও তো ঠিক কথা। আমারই ভুল। কিন্তু অনেক সময়ে অনেক কিছু তো আন্দাজও করে মানুষ।
মাথা নেড়ে বিরক্ত সোনালি বলল, না, আমার অত আন্দাজ করার মতো ক্ষমতা নেই।
মিস সোম, ইউ আর রিয়েলি এ গুড কম্পানি।
ধন্যবাদ।
আচ্ছা, তা হলে গোপীনাথবাবুকে আপনার কোনও মেসেজ দেওয়ার নেই।
সোনালি কঠিন দৃষ্টিতে চেয়ে বলল, আমার মনে হচ্ছে আপনি ইচ্ছে করেই আমাকে উত্ত্যক্ত করতে চাইছেন।
জিব কেটে সুধাকর বলল, তা নয়, তা নয়। আসলে আমি তো এখন রোমেই যাচ্ছি। দেয়ার ইজ এ পসিবিলিটি অফ এ চান্স মিটিং। ঠিক আছে মিস সোম, আমি যাচ্ছি।
আসুন।
সুধাকর দত্ত চলে যাওয়ার পর সহজ হতে পারল সোনালি। আবার তার লোকটাকে খারাপও লাগছে না। যদি আবার কখনও দেখা হয় তা হলে সোনালি অন্তত বিরক্ত হবে না। লোকটা খুবই অদ্ভুত। বিরক্তিকর, অস্বস্তিকর, কিন্তু আকৰ্ষকও।
সোনালি কাজকর্ম শুরু করতে যাচ্ছিল, টেলিফোন বাজল।
সোনালিদি আমি সুব্রত।
হ্যাঁ, বলুন।
দত্ত তো চলে গেল দেখলাম।
হ্যাঁ।
খুব জ্বালিয়েছে নাকি আপনাকে?
একটু।
কেন যেন লোকটাকে আমার বিপজ্জনক মনে হয়।
হতে পারে। ভেবে কী করবেন?
১০.
একটা পোর্টেবল আইসিবিএম তৈরি করাটাই আমার মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, আমি একজন ভাড়াটে বেতনভুক বৈজ্ঞানিক। প্রভুরা যা চান আমার তা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। সাক্কির হয়ে আমি যা করেছি তা একজন কর্মচারী হিসেবেই করেছি। কর্মচারী হওয়া ছাড়া একজন বৈজ্ঞানিকের এ যুগে উপায়ও নেই। তার কারণ বহুল ব্যয়সাপেক্ষ গবেষণা চালাতে গেলে তার দরকার অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও বিশাল সংগঠন, যা ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তোলা যায় না। কর্মচারী হিসেবে আমি প্রচুর বেতন ও সুবিধা পাই। তার চেয়েও অনেক বেশি পাই কাজ করার অফুরন্ত সুযোগ ও পরিবেশ। সাক্কি অস্ত্রের কারবারি। তাদের তৈরি অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নরমেধেই প্রযুক্ত হয়। তাদের বিধ্বংসী অস্ত্রে অনেক কলকারখানা, বাড়িঘর, নগর বন্দর ছারেখারে যায় আমি জানি। এইসব অস্ত্র তৈরিতে আমাদের মতো বৈজ্ঞানিকদের অবদান তো কম নয়। এই যে পোর্টেবল, স্বল্প ওজনের দুরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রটি তৈরি হচ্ছে এটি ভবিষ্যৎ পৃথিবীর পক্ষে এক অভিশাপ হয়ে রইল। সাক্কি কোনও দেশের হয়ে কাজ করে না, তার কোনও স্থানিক পরিচয়ও নেই। এটি একটি নৈর্ব্যক্তিক, অর্থগৃধ্বু, ক্ষমতালিপ্সু প্রতিষ্ঠান। পৃথিবী ছারেখারে গেলেও এর কিছু যায়-আসে না। কিন্তু এদের ক্ষমতা ও অর্থবল বিশাল। এদের হাতে যেন আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ। কিন্তু আমি–গোপীনাথ বসু এই বিশাল সংগঠনের কতটুকু? লক্ষ ভগ্নাংশও নয়। কিন্তু এই আইসিবিএম তৈরি করতে গিয়ে আদ্রেঁ এবং আমি একটি অদ্ভুত জিনিস দেখতে পাই। আলোকোত্তর প্রতিভার অধিকারী আদ্রেঁ-ধাতব রসায়ন বিক্রিয়া থেকে জ্বালানি তৈরির কথা ভেবেছিল। তাই ওকে একটা সুযোগ দেওয়া হয়েছিল সাক্কিতে। জ্বালানি তৈরির জটিল ও সূক্ষ্ম কাজে দিনের পর দিন মগ্ন থেকেছে সে। অবশেষে সে একদিন আমাকে তার স্বভাবসিদ্ধ মৃদু স্বরে বলেছিল, হয়তো আমি স্বপ্ন দেখছি না মঁসিয়ে বোস। জিনিসটা হয়তো আমাদের নাগালে এসে গেছে।
