সুধাকর যেন একটু অবাক হয়ে বলল, দরকার? না, দরকার কিছুই নেই। জাস্ট প্যারিসে ফিরে যাওয়ার আগে একবার দেখা করে যাওয়া।
প্যারিসে ফিরে যাওয়ার আগে তার সঙ্গে দেখা করার কী দরকার তা বুঝল না সোনালি। বলল, ও।
বাই দি বাই, গোপীনাথবাবুকে আপনার কোনও মেসেজ দেওয়ার আছে কি? থাকলে আমাকে দিতে পারেন। বা যে-কোনও জিনিস। অনেকে তো এখান থেকে আমসত্ত্ব, পাটালি গুড় আর বাংলা বই পাঠায়, তাও দিতে পারেন।
সোনালির মুখখানা কঠিন হয়ে গেল। নিরাসক্ত গলায় বলল, আপনি ভুলে গেছেন যে, ওঁর সঙ্গে আমার আর সম্পর্ক নেই। তিনি কোথায় আছেন তাও জানি না।
সুধাকর জিব কেটে বলল, তাই তো, ইস ছি ছি, বড্ড ভুল হয়ে গেছে। ডিভোর্সের কথাটা আমার খেয়াল ছিল না।
অভিনয়টা চমৎকার করল সুধাকর। কিন্তু সেটা অভিনয় বলে বুঝে নিতে সোনালির কষ্ট হল না। সে মনিটরটার দিকে চেয়ে অকারণেই একটা পুরনো প্রোগ্রাম রিকল করল।
সুধাকর খুবই লজ্জিতভাবে একটা স্বগতোক্তি করল, অবশ্য উনি বোধহয় এখন প্যারিসে নেইও। আছেন রোমে, ওঁর হেড কোয়ার্টাসে।
যেখানেই থাকুন আমার কিছু যায়-আসে না।
সে তো বটেই।
বলে সুধাকর খুব চিন্তিত মুখে বসে রইল।
আর কিছু বলবেন?
না, না, আপনি কাজ করুন। আমি আপনাকে ডিস্টার্ব করছি না তো!
সোনালি জবাব দিল না।
আবার কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর সুধাকর বলল, আপনি বোধহয় রোমে থাকতেন, না?
না। জুরিখে।
চলে এলেন কেন?
সোনালি বিরক্ত হয়ে বলল, চলে আসব না কেন? আমি তো বিদেশে থাকতে যাইনি। বিয়ে ভাঙার পর চলে আসতে ইচ্ছে হল।
হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিকই তো। তখন বোধহয় মিস্টার বোস সাক্কিতে জয়েন করেননি, না?
না।
বাই দি বাই, সাক্কির সঙ্গে আপনাদের কানেকশনটা চেক করে দেখেছেন?
দেখেছি। সাক্কি আমাদের ক্লায়েন্ট। বানান আর উচ্চারণের তফাতটা জানা ছিল না বলে সেদিন বলতে পারিনি।
একটা কথা বলবেন? সাক্কির পারচেজের পরিমাণ কি এখন হঠাৎ একটু বেড়ে গেছে?
বেড়ে থাকতে পারে।
সাক্কি কি আপনাদের ইউরোপিয়ান এজেন্ট?
না। আমরা সাক্কিকে এজেন্ট হিসেবে অ্যাপয়েন্ট করিনি। তারা প্রোডাকশন কিনে নেয়, তারপর কী করে তা জানি না।
ঠিক কথা। মিস সোম, সাক্কি ঠিক কীসের বিজনেস করে তা কি আপনি জানেন?
খুব ভাল জানি না। শুনেছ এক্সপ্লোসিভস অ্যান্ড কো-রিলেটেড থিংস।
বাঃ, এই তো অনেক জানেন।
সাক্কি নামকরা কোম্পানি। সবাই জানে। আমি বরং কমই জানি।
গোপীনাথবাবু যে এই কোম্পানিতে আছেন তা আপনি জানতেন না, না?
না। আমি ওঁর কোনও খবর রাখি না।
ঠিক কথা। আফটার অল হি হ্যাজ ডেজার্টেড ইউ।
প্রসঙ্গটা আর না তুললেই খুশি হব।
সরি। গোপীনাথ বসু ইজ নাউ এ ফ্লাই ইন ইয়োর অয়েন্টমেন্ট। কিন্তু ওঁর প্রসঙ্গটা উঠছে কেন জানেন? হি ইজ এ বিগ গাই ইন হিজ ফিল্ড।
হতে পারে, আই অ্যাম নট ইন্টারেস্টেড।
সে তো ঠিক কথাই। আচ্ছা মিস সোম, আমি কি আপনাকে একটা গুরুতর প্রশ্ন করতে পারি?
ভ্রু কুঁচকে সোনালি বলে, কী প্রশ্ন?
প্রশ্নটা হল, কফি আসতে এত দেরি হচ্ছে কেন বলুন তো!
সোনালি ফের একটু হাসল এবং বেল বাজাল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ট্রে-তে দু’ কাপ কফি নিয়ে বেয়ারা ঢুকল।
বেয়ারা কফি রেখে চলে যাওয়ার পর সুধাকর তার কফিতে একটা চুমুক দিয়ে বলল, বাঃ, চমৎকার! এরকম কফির জন্যই বেঁচে থাকাটার একটা মানে খুঁজে পাওয়া যায়।
সোনালির মনে হল, কথাটা বড্ড বাড়াবাড়ি এবং বাহুল্য। সে মৃদুস্বরে বলল, আপনি বুঝি খুব কফি খান?
হ্যাঁ। তবে এরকম নয়। পারকোলেটরে তৈরি করা ব্ল্যাক তেতো কফি। ব্ল্যাক কফি ইজ এ ম্যাসকুলিন ড্রিঙ্ক।
আর এটা বুঝি ফেমিনিন?
না, না, তা নয়। এটাও চমৎকার। অত্যন্ত চমৎকার। ধন্যবাদ।
সোনালি লোকটাকে মনেপ্রাণে মোটেই পছন্দ করতে চাইছে না। আবার লোকটাকে তার খারাপও লাগছে না। এরকম বিপরীত প্রতিক্রিয়া তার আর কখনও হয়নি।
হঠাৎ সোনালি বেমক্কা প্রশ্ন করল, সাক্কিকে নিয়ে আপনি এত চিন্তিত কেন মিস্টার দত্ত?
সুধাকর কফির কাপে তার অখণ্ড মনোযোগ অব্যাহত রেখে খুবই মৃদু স্বরে বল, গুজব। সাক্কিকে নিয়ে হাজারও গুজব।
কীসের গুজব?
সেসব আপনার জানার দরকার নেই, সুখে থাকতে ভূতের কিল খাবেন কেন? এসব কারবারে যত না জেনে থাকা যায় ততই ভাল।
তাই বুঝি?
ঠিক তাই। এই যে আমি হাজার হাজার মাইল দৌড়ে মরছি তার অধিকাংশই হল পণ্ডশ্রম। চিলে কান নিয়ে গেছে শুনে চিলের পিছনে ছোটার মতো বোকামি। ওয়াইল্ড গুজ চেজ। সাক্কিকে নিয়ে যা রটেছে তাও এরকমই ব্যাপার হতে পারে।
তাই বুঝি?
আচ্ছা মিস সোম, আপনি নিজে সাক্কিকে নিয়ে চিন্তিত নন তো!
অবাক হয়ে সোনালি বলল, আমি! আমি কেন সাক্কিকে নিয়ে চিন্তিত হব?
ঠিক ঠিক, তাই তো। আপনার তো টেনশনের কারণ নেই।
না নেই।
আপনার বস মনোজ সেনের আছে কি?
ওঁর কথা আমি কী করে বলব?
তাও তো বটে। আপনি তো আর থট রিডার নন। আচ্ছা উনি এমনিতে তো লোক ভালই, না?
হ্যাঁ, ভালই তো।
আমারও তাই মনে হল। বেশ লোক। তবে ভাল লোকেরা তেমন বুদ্ধিমান বা যাকে চালাক চতুর চটপটে বলে তা হন না, তাই না?
সোনালি একটু হাসল। কিছু বলল না। আপনার কি মনে হয় মনোজবাবু খুব বুদ্ধিমান?
সোনালি মুখটা গম্ভীর করে বলল, বোকা হলে কি এত বড় কারখানা তৈরি করতে পারতেন?
