এমনিই। জাস্ট কৌতূহল।
মনোজ একটু ভেবে খুব চিন্তিতভাবে বলল, এমন হতে পারে যে, আমরা যা ভেবে জিনিসটা তৈরি করছি অন্য কেউ সেটা সেভাবে ব্যবহার করছে না। এমন হওয়া অসম্ভব নয় যে এ জিনিসটার এমন কিছু প্রপার্টি বা ইউসেজ আছে যা আমরা জানি না।
সেটা কীরকম স্যার? আপনি নিজেও তো সায়েন্টিস্ট আপনি কেন জানবেন না?
মনোজ ম্লান হেসে বলল, আমি সায়েন্টিস্ট ঠিকই, কিন্তু উর্বর মস্তিষ্কের মানুষের অভাব তো নেই। এই অ্যালয় হয়তো অন্য কোনও ম্যাটারের সঙ্গে রি-অ্যাক্ট করে, তার হয়তো জটিল প্রক্রিয়া আছে। সব কি আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব?
আপনি কি মনে করেন অ্যালয়টা বিপজ্জনক?
না সুব্রত, অ্যাপরেন্টলি বিপজ্জনক নয়। কিন্তু জিনিসটা নতুন, এখনও এর সব প্রপার্টি নিয়ে গবেষণা হয়নি। আমাদের ল্যাবরেটরিতে তো সবসময়েই জিনিসটা নিয়ে রিসার্চ হচ্ছে।
আমি টেকনিক্যাল লোক নই স্যার, বিজ্ঞানের কিছুই জানি না। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে এই অ্যালয়টা কারও কারও কাছে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস।
হতে পারে। তুমি কি বলতে চাও রোজমারিকে সেইজন্যই ভয় দেখানো হচ্ছে?
তা জানি না স্যার।
মনোজ চিন্তিত মুখে চেয়ে থেকে বলল, কারখানাটা অনেকে বহু টাকায় কিনতেও চাইছে।
হ্যাঁ স্যার, জানি।
মনোজ অসহায়ভাবে হাত উলটে বলল, কিছুই বুঝতে পারছি না। দেয়ার মাস্ট বি এ প্যাটার্ন সামহোয়ার। আদ্রেঁকে যদি খুন করা হয়ে থাকে তা হলে বুঝতে হবে আমাদের খুব নিশ্চিন্ত থাকা চলবে না। তুমি আমাকে ভাবিয়ে তুললে।
সোনালি মাথা নিচু করে বসে ছিল। একটিও কথা বলেনি। তার দিকে চেয়ে মনোজ বলল, মিস সোম, আজকের দিনটা আমি ল্যাব-এ কাটাতে চাই। রোজমারি আজ একটা অনাথ আশ্রমে গেছে। আপনারা এদিকটা একটু ম্যানেজ করবেন। আই মাস্ট নট বি ডিস্টার্বড।
সোনালি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ঠিক আছে।
চিন্তিত মনোজ উঠে পড়ল। মিটিং শেষ।
সোনালি নিজের ছোট ঘরখানায় এসে তার কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত রইল কিছুক্ষণ। তারপরই ফোন এল।
সোনালিদি।
বলুন।
বস কি একটু ভয় পেয়েছেন?
হ্যাঁ সুব্রতবাবু, ওভাবে বলাটা আপনার ঠিক হয়নি।
একটু অ্যালার্ট করার দরকার ছিল। এতে উনি সতর্ক হবেন। ওঁর এখন সত্যিই বিপদ।
কীসের বিপদ?
আপনি ভিকিজ মব-এর নাম শুনেছেন?
শুনব না কেন?
ভিকিজ মব ফিন্ডে নেমে পড়েছে।
তার মানে?
মানে বিপদ।
কিছু বুঝতে পারছি না।
আমিও কি ছাই পারছি। তবে আপনি যার নাম শুনলেই চটে যান সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার মাঝে মাঝে টেলিফোনে কথা হচ্ছে, উনিই খবরটা দিয়েছেন।
খবরটা কী?
সেটা আপনার জানার দরকার নেই। তবে গোপীদাও এখন বেশ ঝামেলার মধ্যে আছেন।
তাতে আমাদের কী?
একটু আমাদেরও ব্যাপার আছে। যতদূর মনে হচ্ছে এই অ্যালয়টা নিয়েই গণ্ডগোল।
সোনালি একটু চুপ করে থেকে বলল, আমাদের কি কিছু করার আছে?
না। কিন্তু চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা ভাল।
ঠিক আছে।
আর একটা কথা।
কী?
মিস্টার সুধাকর দত্ত ইন্টারপোল এখনও কলকাতাতেই আছে।
তাই বুঝি?
হ্যাঁ। আমি তাকে দেখতেও পাচ্ছি। এইমাত্র আমাদের রিসেপশনে ঢুকল এসে।
০৯.
রিসেপশন থেকে যে টেলিফোনটা আশা করেছিল সোনালি সেটা এল বটে, কিন্তু এল আরও দশ মিনিট পর।
মিস সোম, আপনার সঙ্গে মিস্টার সুধাকর দত্ত দেখা করতে চান।
সোনালি ভেবে পেল না, দশ মিনিট দেরি হল কেন এবং সুধাকর তার কাছে কী চায়। সে শুধু বলল পাঁচ মিনিট পরে পাঠিয়ে দিন।
পাঁচ মিনিট সময়টা দরকার। এই পাঁচ মিনিট তাকে মন ও চিন্তাভাবনাকে গুছিয়ে নিতে হবে। লোকটা তাকে প্রশ্ন করবেই। কিন্তু জেরা করার মতো করে নয়। খুব প্রাসঙ্গিকভাবে এবং সারল্যের সঙ্গে। অনেকটা বাচ্চা ছেলেদের মতো ‘এটা কী, ওটা কী’ গোছের হঠকারী প্রশ্নই। কিন্তু ওগুলোই হল বেশি বিপজ্জনক। ছদ্ম মোড়কে ঢাকা ওইসব প্রশ্নই মানুষের সতর্কতাকে ভন্ডুল করে দেয়। সুধাকরের এখন অনেক কিছু জানা বাকি। কিন্তু সোনালি তাকে সবকিছু বলতে চায় না। তাই কী বলবে এবং কী বলবে না তা এখনই ঠিক করে নেওয়া দরকার।
সোনালি চেয়ারে মেরুদণ্ড সোজা করে বসে ধ্যানস্থ হল। এই ধ্যানের প্রক্রিয়া তার খুব প্রিয়। এতে মনের শক্তি বাড়ে, ইচ্ছাশক্তিরও বৃদ্ধি ঘটে।
পাঁচ মিনিট পর দরজায় মৃদু ও ভদ্র করাঘাত। সোনালি তার কম্পিউটার মনিটরের ওপর চোখ রেখে ব্যস্ততার ভাবটি শরীরে ফুটিয়ে রেখে সামান্য অধৈর্যের গলায় বলল, কাম ইন।
সুধাকরের চেহারাটা সত্যিই অ্যাথলিটদের মতো। একখানা আড়া মাল্টি কালার স্ট্রাইপের টি-শার্ট পরে আছে বলে শরীরের ছমছমে ভাবটা বেশ ফুটে উঠেছে। হয়তো স্পোর্টসম্যান ছিল।
সুধাকর তার ঝকঝকে দাঁত দেখিয়ে একটু হেসে বলল, জ্বালাতে এলাম। আপনি বোধহয় খুব ব্যস্ত।
সোনালি একটু ক্লান্তির অভিনয় করে বলল, না, ঠিক আছে। আপনি বসুন।
টেবিলের ওধারে মুখোমুখি বসল সুধাকর। একটু চিন্তিত, একটু গম্ভীরও। আগের দিন বেশ বাচাল ছিল।
মিস সোম, আপনার পক্ষে কি একটা কাজ করা সম্ভব?
সোনালি উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, কী কাজ?
আমাকে এক কাপ কফি খাওয়ানো কি আপনার পক্ষে কঠিন হবে?
সোনালি তার ইচ্ছের বিরুদ্ধেই একটু হেসে বলল, না, কঠিন আর কী।
বেল বাজিয়ে বেয়ারাকে কফির কথা বলে দিয়ে সোনালি বলল, এবার দরকারের কথাটা বলুন।
