এক চটকায় উত্তর দিল না। অন্যমনস্ক মুখটা আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে এল। আচমকা একটু হাসল সে। বোঝা গেল, ক্যামেরা ওর ভীষণ প্রিয়। বলল—ডেভেলপ আর প্রিন্ট করা আরও শক্ত। আমি সব নিজে করি। আমাদের ডার্করুম আছে।
শোওয়ার ঘরে গিয়ে কখন যেন চুমকি বসানো শাড়িটা ছেড়ে একটা গাঢ় কালচে লাল শাড়ি পরেছে সে৷ শাড়ি পালটানোর সময়ে ভাগ্যিস গিয়ে হাজির হয়নি সোমেন। ব্যাপারটা ভাবতেই লজ্জা করছিল তার। লাল শাড়িটাতেও কেমন মানিয়েছে! একদম বালিকা বয়স, অহংকারে ডগোমগো মুখ, হাঁসের মতো গলা উঁচু করে বসে আছে কিশোরী-দেমাকে। তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে, বুকের ভিতরে মায়া জন্মায়।
সোমেন অবাক হওয়ার ভান করে বলে—তাই নাকি! এইটুকু বয়সে!
রিখিয়া লকেটটা দাঁতে চেপে রেখেছিল। ছেড়ে দিয়ে বলল—বয়স কী কম! লকেটটা গড়িয়ে পড়ল ওর বুকের ওপর, ঢাকা দুটি কোমল স্তনের মাঝখানে।
সোমেন চোখ তুলে নেয়। বলে—এরকম আর কী কী জানো তুমি? গাড়ি চালাতে?
—ওমা! সোজা। অবশ্য লাইসেন্স নেই। ময়দানে গিয়ে চালাই। স্কুটারও পারি। বলে হাসল।
সোমেন সিগারেট ধরাল। কত কী জানো তুমি! আমি কিচ্ছু পারি না। ভারী লজ্জার কথা। তুমি এত জানো কেন? প্রিসিসন ক্যামেরায় অঙ্ক কষে ছবি তোলো, বড় গাড়ি চালাও, স্কুটার জানো। বড় পাকা মেয়ে। দূর, তোমার সঙ্গে আমাকে মানাত না।
—কে বলেছে শুনি! রিখিয়া হঠাৎ জিজ্ঞেস করে।
সোমেন চমকে ওঠে। মনে মনে বলা কথা সব শুনতে পেল নাকি ও?
—কে কী বলেছে? বোকার মতো জিজ্ঞেস করে সোমেন।
—ওই কথাটা! রিখিয়া নিজের হাতের পাতার দিকে চেয়ে বলে।
সোমেন একটু হাসে। বলে—বিয়ের কথা তো?
—তাই তো বলছিলেন।
সোমেন মাথা নেড়ে বলে—বাজে লোক বলেনি। শৈলীমাসি।
রিখিয়া কথা বলল না।
ফরসা কাপড়পরা চাকর ট্রে রেখে যায়। অনেক খাবার। ভারী ভাল চায়ের গন্ধ। খেতে ইচ্ছে করছিল না সোমেনের। তার ভিতর অনেক রকম ভাবনা চিন্তার চোরাস্রোত। ক্ষিদে মরে গেছে।
সোমেন চায়ের কাপটা তুলে নিয়ে বলে—তোমার বিয়ের দিন এসে খাবার খাব। আজ নয়।
রিখিয়া একরকম ধমক-চোখে তাকায়। পরমুহূর্তে চোখ সরিয়ে নিয়ে বলে—খুব খারাপ হচ্ছে কিন্তু।
হঠাৎ কি একটা আশা আকাঙক্ষা মায়া ভালবাসা অন্ধের মতো নড়ে ওঠে সোমেনের মধ্যে। আবহাওয়ার বার্তায় যেমন বলে, বঙ্গোপসাগরে গভীর নিম্নচাপ, ঝড় উঠবে।
সোমেনের চা চলকে যায়, একটুখানি, নামিয়ে রাখে কাপ।
বলে—আচ্ছা খাচ্ছি।
॥ তেত্রিশ ॥
কেমন এক অভিমানী মুখ নিয়ে বসেছিল রিখিয়া। পায়ের কাছে কুকুর, আর বুক-কেসের ওপর সেই ঝকঝকে আসাহি পেন্ট্যাক্স ক্যামেরা, কখন আবার কুড়িয়ে এনে রেখেছে। দৃশ্যটা ছবি হয়ে আছে। ওই অভিমানী ভঙ্গিতে এক ভিন্ন রকমের সৌন্দর্য ছিল। যেন ওই নতমুখ তুলে জলভারে আক্রান্ত তীব্র চোখে সোমেনকে দায়ী করে বলবে—কে বলল অন্য কোথাও আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে! তা কি হয়! তুমি বলো!
তা অবশ্য বলেনি রিখিয়া। কেন বলবে? সোমেনের ছেলেমানুষি মন কত কী ভেবে নেয়। এমনকী সোমেন বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারেনি ওই অভিমানী সুন্দর ভঙ্গির দিকে। মেয়েদের দিকে সোজাসুজি তাকাতে তার ভয় করে। সেই অবশ্যম্ভাবী ভিটামিনের অভাব তার মধ্যে আজও। রাস্তায়-ঘাটে অনেক পুরুষকে দেখেছে সোমেন, যারা মেয়েছেলে দেখলেই আত্মহারা হয়ে যায়। চোখের পলক না ফেলে, চারদিককে ভুলে গিয়ে হাঁ করে দেখে। দেখতে দেখতে আত্মজ্ঞান, চক্ষুলজ্জা, লোকভয় লুপ্ত হয়। তখন চিমটি কাটলেও টের পাবে না, অপমান করলেও গায়ে মাখবে না। মেয়েটা কী ভাবছে তাও ভেবে দেখে না। সোমেনের বন্ধু হেমন্তর সেবার চোখ খারাপ হল, তো অ্যাট্রোফিন চোখে দিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে যাওয়ার সময়ে সোমেনকে সঙ্গে নিয়েছিল, পাছে আবছাচোখে কোনও দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু দুর্ঘটনা একটা ছোট রকমের ঘটল ডাক্তারের চেম্বারেই। একটি অবাঙালি বিবাহিতা সুন্দরী তেজি মহিলা বসেছিলেন সেখানে। হেমন্তর কাণ্ডজ্ঞান লোপ পেল। অ্যাট্রোফিন দেওয়া চোখে এমন ডেলা পাকিয়ে চেয়ে রইল যে মহিলার ভারী অস্বস্তি। বাঙালি মেয়েরা সাধারণত এমন অবস্থায় ভ্রূ কোঁচকায়, বিরক্তির ভাব করে। কিন্তু সরাসরি কিছু করে না। কিন্তু এ মহিলার ধাত অন্যরকম। কিছুক্ষণ হেমন্তর তাকানোটা লক্ষ্য করে হঠাৎ উঠে তেড়ে এল—আপনি ওভাবে তাকাচ্ছেন কেন? লজ্জা নেই, বেশরম? ঘর ভরতি লোকের সামনে কী যে বে-ইজ্জতী তা বলার নয়, হেমন্ত অবশ্য খুব বিনয়ের সঙ্গে বলল—আমার চোখে অ্যাট্রোফিন, কিছু দেখছি না। এ কথা শুনে দু-চারজন হাসতে থাকে, মহিলাও একটু থমকে যান। সেই ফাঁকে দুঃসাহসী হেমন্ত গলা একটু নিচু করে জোরাল শ্বাসধ্বনির শব্দে বলল—আপনি ভীষণ সুন্দর।
এ সবই হচ্ছে ভিটামিনের কাজ। মেয়েদের দিকে তাকানো, চালাক, চতুর কথাবার্তা, সংকোচহীন মেলামেশা। সেখানে সোমেনের কিছু খাঁকতি আছে। নইলে কিশোরী রিখিয়ার দিকে আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকা যেত, প্রশ্ন করা যেত—তোমার বিয়ে কি সত্যিই ঠিক হয়ে নেই?
সে প্রশ্ন করা হল না। রহস্য রয়ে গেল। বিয়ের কথায় কেন রেগে গিয়েছিল রিখিয়া? কেন ওই অভিমান? হয়তো তা টের পেয়েছিল অন্ধ কুকুরটা, দু-পায়ে কোলের ওপর শরীর তুলে মুখটা বাড়িয়ে শুনছিল রিখিয়ার কম্পিত শ্বাসের শব্দ। অস্পষ্ট সান্ত্বনার আওয়াজ করেছিল। অবোলা জীব, হয়তো বলতে চেয়েছিল—দুঃখ কোরো না রিখিয়ার মনের মতো বর আসবে। বুক-কেসের ওপর থেকে করুণ একটি চোখ মেলে ক্যামেরাটা দেখেছিল রিখিয়াকে। বলেছিল—কেঁদো না রিখিয়া, সব ছবি আমার তোলা রয়েছে। কোথায় পালাবে তোমার প্রেমিক। তাকে বন্দি করে এনে দেব তোমার কাছে।
