তাই আবার অন্ধ কুকুরটার কথা মনে পড়ে সোমেনের। মনে পড়ে, আসাহি পেন্ট্যাক্স ক্যামেরার একটিমাত্র চোখ। সে ঘরে আর একটু বসে থাকতে পারত সোমেন, হাতে কোনও কাজ ছিল না, রিখিয়াদের বাড়ির কেউ কিছু মনে করত না, তেমন রাতও হয়ে যায়নি। তবু সোমেনের মনে হতে লাগল, সে বড় বেশিক্ষণ আছে এদের বাড়িতে। দৃষ্টিকটু হচ্ছে কিশোরী রিখিয়ার সঙ্গে এতক্ষণ বসে থাকা। এবার তার চলে যাওয়া উচিত। সে এমনও ভাবল— এরা বড়লোক, এদের বাড়িতে থাকা ভাল নয় বেশিক্ষণ।
শুকনো সন্দেশ জল দিয়ে গিলে ফেলে সোমেন, সন্দেশের তেমন কোনও স্বাদ পায় না সে। দামি চায়ে চুমুক দিয়ে তার মনে হল, ভারী বিস্বাদ। খাবার খাওয়ার শাস্তিটুকু ভোগ করে সে খুব ব্যস্ততার ভাব দেখিয়ে উঠে গেল। যেন খুব তাড়া আছে এমনভাবে বলে—চলি।
রিখিয়া নতমুখে চেয়ে একখানা আদরের হাত রেখেছে কুকুরটার মাথায়। অন্য হাতে মাথার একগুচ্ছি চুল টেনে এনে আঙুলে ঘুরলি পাকাচ্ছে। ভঙ্গিতে একটা আভিজাত্য ফুটে আছে। একটু অহংকারও। সোমেনের গলা শুনে চোখ তুলল।
সেই তাকানোতে কী ছিল কে জানে! কিন্তু সোমেন কত কী ভেবে নিল। ভাবল, বুঝি রিখিয়ার চোখে বিতৃষ্ণা, বিরক্তি। রিখিয়া তাকে বুঝি পছন্দ করে না।
রিখিয়া তার কিশোরীসুলভ উঁচু স্বরে বলল—সবাই জেনে গেছে, না?
—কী?
—বিয়ের কথা?
—জানবে না কেন? ভাল খবর।
রিখিয়া আবার মাথা নত করে রইল। আর সোমেনের মনে হল, রিখিয়ার ভঙ্গিতে অবহেলা। উপেক্ষা। একটু দূরের মানুষ হয়ে যাওয়া।
সোমেন আবার বলল—চলি।
রিখিয়া মাথা নেড়ে বলে—আচ্ছা।
বলল না আবার আসবেন। একটু হতাশ হল সোমেন। ওটুকু অন্তত না বললে সোমেন। আসে কী করে! যদি রিখিয়া ডাকত, তবে আসত কোনওদিন। না ডাকলে কি বড়লোকদের বাড়িতে আসা যায় ঘন ঘন?
ব্যস্ততার ভান করে নেমে এল সোমেন। আলোছায়াময় রাস্তায় পা দিয়ে দেখে, গ্রীষ্মের বিকেলে কলকাতার সুন্দর হাওয়াটি বয়ে যাচ্ছে। কী নিবিড় ঝিরঝির স্রোতস্বিনীর মতো শব্দ উঠেছে গাছে গাছে। অবিরল বয়ে চলেছে সেই ঘুমপাড়ানি শব্দ। দূর থেকে রিখিয়ার কুকুরটা একবার ডাকল। পিয়ানোর মতো হর্নের শব্দ করে বিশাল এক গাড়ি সোমেনকে সতর্ক করে দিয়ে পাশ ঘেঁষে চলে যায়। চলন্ত গাড়ি থেকে রেডিয়োর গানের শব্দ এল। গাড়ির আলোয় দেয়ালের লিখনটি স্পষ্ট হল একবার। তারপর মিলিয়ে গেল। প্রতিশোধ, প্রতিরোধ, প্রতিবাদ কমরেড, গড়ে তোলো, গড়ে তোলো, গড়ে তোলো ব্যারিকেড।
রাস্তায় এসে সে মেনের যেন আর সময় কাটে না। রাস্তা ফুরোয় না। রিখিয়ার কাছ থেকে বিদায় নিলে যেন আর কোথায় যাওয়ার থাকে না।
বহুদিন বাদে অণিমাকে আবার দেখল সোমেন, নাটকের দিন, মুক্ত অঙ্গনে। অবশ্য দূর থেকে দেখা। একটা দৃশ্যে অল্পক্ষণের জন্য মঞ্চে এল অণিমা। বয়স্কা প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকায় তার অল্পক্ষণের অভিনয়। এই দৃশ্যে বিভ্রম সৃষ্টি করার জন্য মঞ্চে খুব মৃদু আলো। ঘোর সবুজ সেই ম্লান আলোয় অণিমাকে চেনাই যাচ্ছিল না। শুধু দেখা গেল সে এক সাদা-খোলের শাড়ি পরেছে আর ডানদিকের মাথার চুলে একগুছি পাকা চুল। যে লোকটা চাঁদ গিলে ফেলেছিল তার কাছে কৈফিয়ত চাইছেন প্রধানমন্ত্রী, বিধিভঙ্গের দায়ে দায়ী করছেন।
মঞ্চে সেই আবছায়া মূর্তির দিকে চেয়ে নিথর হয়ে থাকে সোমেন। বুকের মধ্যে একটা কেমন কষ্ট হয়। প্রধানমন্ত্রীর মঞ্চে আবির্ভাবমাত্র দর্শকরা হাততালি দিচ্ছিল। যদিও প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং নন, তাঁর ভূমিকায় অন্যজন। তবু জনগণ খুশি, এটা বোঝা গেল। সোমেন প্রধানমন্ত্রীকে দেখছিল না। দেখছিল অণিমাকে।
পাশে বসে ম্যাক্স দাঁত দিয়ে নখ খুঁটছিল। হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে পরিষ্কার বাংলায় বলে— সোমেন, কোনও দেশেই প্রধানমন্ত্রীরা এত ইম্পর্ট্যান্ট নন।
সোমেন ঘাড়টা নাড়ল কেবল।
ম্যাক্স ভারী হতাশ গলায় মৃদুস্বরে স্বগতোক্তির মতো বলে—নিউজপেপার খুলেই হেডিং দেখি, প্রধানমন্ত্রী এই কথা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী এই কথা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী এরকম উপদেশ দিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়েছেন বা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। রেডিয়ো খুলেই নিউজ-এ শুনি, কি প্রাইমমিনিস্টার হ্যাজ স্টেটেড দ্যাট…। তোমরা এত প্রধানমন্ত্রীর ভক্ত কেন?
সোমেন কী উত্তর দেবে? একবার আবছায়ায় ম্যাক্সের মুখটা দেখল। মুখে একটু কৌতুক। সোমেন বলল—আমরা ওইরকম।
ম্যাক্স মাথা নেড়ে বলল—আইডোল্যাট্রি! আমি তোমাদের দুর্গাপুজো, কালীপুজো, গণেশপুজো সব দেখেছি। কিন্তু তোমাদের গ্রেটেস্ট গড হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী। অল অ্যালং তোমরা তোমাদের সব প্রধানমন্ত্রীকে সবচেয়ে বেশি পুজো করে এসেছ। বাচ্চারা যেমন মা-বাবা ছাড়া কিছু বোঝে না, তোমরা সেরকম প্রধানমন্ত্রী বোঝো। হোয়াই?
পিছন থেকে কে যেন বলল—আস্তে।
ম্যাক্স চুপ করে আবার নখ খুঁটতে থাকে দাঁতে। তার মুখে ভ্রূকুটি চোখে নীলচে ফসফরাস জ্বলছে।
সোমেনের ডানপাশে কয়েকজন অচেনা লোক, তার ওপাশে পূর্বা বসেছিল আর দুটি মেয়ের সঙ্গে। সারাক্ষণ নিচু স্বরে বক বক করছিল আর হাসছিল। ওদের আশপাশের লোক বিরক্ত। নাটকের মাঝামাঝি হঠাৎ উঠে এসে সোমেনের পাশের লোকটাকে কী বলল। লোকটা উঠে গেল পূর্বার জায়গায়। পূর্বা সোমেনের পাশে বসেই হাসতে থাকে—বুঝতে পারছিস?
