সোমেন শ্বাস ছাড়ে। বলে—পেয়ে বসলি যে!
অন্ধদের নিয়ে তোলা একটা ডকুমেন্টারি ছবিতে সে দেখেছিল, অন্ধ মানুষকে রাস্তা চিনিয়ে নিয়ে চলেছে পোষা কুকুর। ট্রাফিকের আলো দেখে থামছে, গাড়িঘোড়ার ব্যস্ত রাস্তা পার করে দিচ্ছে সাবধানে। আর এ কুকুরটা নিজেই অন্ধ।
হঠাৎ সোমেন নিচু হয়ে ওর গলার বকলশটা ধরল। তারপর চোখ বুজে থেকে ঠোঁট টিপে হেসে বলল—দেখি কেমন পারিস! চল।
কুকুরটা কী বুঝল কে জানে! কিন্তু হঠাৎ শরীর ঝাড়া দিয়ে উঠল। লেজ নাড়ছে, প্রবল কুঁই কুঁই শব্দ করছে। কিন্তু আস্তে আস্তে টেনে নিতে লাগল সোমেনকে। সোমেন চোখ খুলল না, কুঁজো হয়ে কুকুরটার টানে টানে হাঁটতে লাগল। যে ঘরে সোমেন বসেছিল সে ঘরে নয়, করিডোর দিয়ে অন্য কোনও ঘরে নিয়ে যাচ্ছে তাকে। কোথায়! রিখিয়ার ঘরে?
অচেনা বাড়ি। খেলাটা বিপজ্জনক। তবু চোখ খোলে না সোমেন। দেখা যাক না!
—ও কী! বলে চেঁচিয়ে উঠল রিখিয়া। আর সেই মুহূর্তেই ঝলসে উঠল ফ্ল্যাশগান-এর আলো।
চমকে সোমেন চোখ খোলে। রিখিয়ার ঘরের দরজায় সে দাঁড়িয়ে। অপ্রস্তুত অবস্থা। ভিতরে রিখিয়া, ঘরের ঠিক মাঝখানে। অবাক চোখ, হাতে ক্যামেরা।
সোমেন বলে—কুকুরটার কাছে ট্রেনিং নিচ্ছিলাম।
রিখিয়া ভ্রূ কুঁচকে বলে—কেন? ড্যাবা ড্যাবা দুটো চোখ তো রয়েছে।
—এমনি।
—এমনি না। মাথায় ছিট। যা চমকে গিয়েছিলাম না! বলে রিখিয়া হাসে। স্নিগ্ধ এক রকমের রাগহীন হাসি। বলে—কম্পোজিশনটা কিন্তু দারুণ হয়েছিল। প্রিন্ট করি, দেখবেন।
—ছবি তুললে?
—হুঁ। দাঁড়ান, আর একটা তুলি।
—এ ঘরে?
—হুঁ। বলে অন্যমনস্ক রিখিয়া তার ক্যামেরায় মুখ নিচু করে কী সব কলকব্জা নাড়াচাড়া করে।
তখন সোমেন মনে মনে বলে—তোমার শোওয়ার ঘরে আমার ছবি উঠবে? তা কি ভাল হয় রিখিয়া? ছবি তো দলিল হয়ে থাকবে। চিরকালের জন্য। সে ভাল নয়। আমি তো আসিনি তোমার ঘরে, কুকুরটা নিয়ে এসেছে। কেন, কে জানে!
ক্যামেরা ঠিক করতে করতে রিখিয়া বলে—বোকা লোকেরা ক্যামেরা দেখলেই কেমন ক্যাবলা হয়ে যায়। অমন চোরের মতো দাঁড়িয়ে আছেন কেন দরজায়? ওই বুককেশটার উপর হাতের ভর রেখে দাঁড়ান। পিছনে পরদা, পাশে ফুলদানি, ফ্রেমটা দারুণ হবে।
সম্পূর্ণ ক্যামেরামগ্ন চোখে চেয়ে রিখিয়া কপালের ওপর থেকে চুলের ঘুরলি সরিয়ে ভিউফাইন্ডারে চোখ রাখে।
—আমার ছবি দিয়ে কি হবে? সোমেন তখন বলে। মনে মনে বলে—আমার ছবি রাখবে কেন? আমি কে?
—কী আবার হবে! ছবি ভেজে খাব। রিখিয়া ঝাঁঝ দিয়ে বলে। আদুরে মেয়েদের এরকম রাগী স্বভাব হয় বটে। পরক্ষণেই রিখিয়া হেসে ফেলে বলে—আমি ভীষণ ছবি তুলি, সব জিনিসের। দাঁড়ান না!
ছেলেমানুষি একরকমের অভিমান বুকে মেঘলা ঘনিয়ে তুলল সোমেনের। সে মাথা! নেড়ে বলে—না। ছবি নয়।
—কেন?
—আমার ছবি ভাল ওঠে না।
—আচ্ছা দেখবেন, আমি কীরকম ভাল তুলে দিই!
সোমেন মাথা নাড়ল। আমি কি শুধু ক্যামেরার চোখ দিয়ে দেখবার! আমি কি কেবলই ছবি! শুধু পটে লিখা। আর কিছু নই! রিখিয়া! সোমেন মুখ ফিরিয়ে নিল।
সেই মুখ-ফেরানো অভিমানী মুখের ভঙ্গিমা দেখে রিখিয়ার ক্যামেরাটা আর একবার চমকায়। একটু হাসে রিখিয়া। বলে—রাগী বোকা মুখ তুলে রাখলাম।
সোমেন রাগে মুখ ফিরিয়ে বলে—তুমি বড় পাকা মেয়ে।
রিখিয়া রাগে না। ক্যামেরাটা তার বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে দেয়। অবশ্য ক্যামেরাটা চোট পায় না। ফোম রবারের গদির বিছানায় নিঃশব্দে লাফিয়ে উঠে কাত হয়ে থাকে। মস্ত একটা নিথর চোখ চেয়ে থাকে সোমেনের দিকে।
রিখিয়া মৃদু হেসে বলে—পাকাই তো। সবাই বলে।
সোমেন কী করবে বুঝতে পারে না।
রিখিয়া তখন বলে—বসুন। চা আসছে।
—এ ঘরে?
রিখিয়া অবাক হয়ে বলে—বারবার এ-ঘরে এ-ঘরে করছেন কেন? এ ঘরটা আমার, অন্য কারও নয়। বসুন। বিছানাতেই বসুন।
এটা রিখিয়ার শোওয়ার ঘর। এ কথাটা কিছুতেই ভুলতে পারে না সোমেন।
—শোওয়ার ঘরে কেউ বাইরের উটকো লোককে বসতে বলে! আপনজন হলে অন্য কথা। সোমেন মুখ ফেরানো অবস্থাতেই বলে। বুকে অকারণ অভিমান।
রিখিয়া অধৈর্যের গলায় বলে—বাব্বাঃ, আমার অত শুচিবাই নেই।
—থাকা ভাল। সোমেন জ্যাঠামশাইয়ের মতো মাতব্বরী গলায় বলে—বিয়ে হচ্ছে, এখন বালিকাবুদ্ধি থাকা ভাল নয়।
—কার বিয়ে হচ্ছে? বলে রিখিয়া ভ্ৰূ কোঁচকায়।
করিডোর দিয়ে বসার ঘরের দিকে হাঁটতে থাকে সোমেন। তার পায়ের শব্দ শুনে আসে কুকুরটা, পিছনে রিখিয়া।
সোমেন মুখ না ফিরিয়ে বলে—সব শুনেছি।
—কী? রিখিয়ার প্রশ্ন আসে।
—বিয়ে ঠিক হওয়ার কথা।
—ও! বলে রিখিয়া চুপ করে যায়।
সোমেন ফিরে তাকিয়ে বলে—খুব ভাল খবর।
রিখিয়ার মুখটা ছুটে পড়ছে। কিছু রাগে, কিছু বুঝি অপমানে।
বসবার ঘরে এসে বলল—বসুন। চা আসছে। ক্যামেরাটা কুড়িয়ে এনেছে। রাগ দেখানোর জন্যই শব্দ করে বুককেসের ওপর রাখল।
মুখোমুখি বসল। গলায় হারের লকেটটা তুলে দুই ঠোঁট চেপে ধরল। অন্যমনস্ক।
কিছু বলার নেই। সোমেন ভাবল, বিয়ের কথা শুনে খুশি হয়নি রিখিয়া। কথাটা ঘোরানোর জন্য সোমেন বলে—আমার ছবি সত্যিই ভাল ওঠে না, বুঝলে রিখিয়া!
—ওঠে না-ই তো।
রাগের কথা। সোমেন হাসল। কিছু বলার নেই, তাই বলল—ভাল ক্যামেরায় ছবি তোলা খুব শক্ত। তুমি তোলো কী করে?
