—যতক্ষণ বাড়িতে থাকে ততক্ষণ ওই কুকুরটাকে নিয়ে থাকে।
সোমেন বুঝতে না পেরে বলে—কে? বলেই বুঝতে পারে, রিখিয়া তার বাবার কথা বলছে। মুখটা কিছু ভারাক্রান্ত রিখিয়ার।
সোমেন টপ করে বলে—তুমি কী নিয়ে থাকো সারাদিন? ক্যামেরা?
রিখিয়া বিষণ্ণতা থেকে নিজেকে তুলে আনে। একটু হেসে বলে—হ্যাঁ। খুব ছবি তুলি।
—পারো?
—ও মা! পারব না কেন?
—ও সব ক্যামেরায় তো অনেক গ্যাজেট থাকে।
—খুব সোজা। বলে রিখিয়া লাফিয়ে উঠে বলে—দাঁড়ান, আপনার একটা তুলে রাখি। ফ্ল্যাশটা চার্জ করতে দিয়েছি প্লাগে। আনছি।
রিখিয়া চলে যেতে ফাঁকা ঘরে এতক্ষণে যেন একটু হাঁফ ছাড়ে সোমেন। বুকটা কাঁফছিল ভীষণ। শ্বাস টানতেই একটা সুগন্ধ পেল। রিখিয়া ফেলে গেছে তার গায়ের ঘ্রাণ। এই গন্ধটুকু কি চিরকাল থেকে যাবে সোমেনের জীবনে, যেমন থেকে যাবে অণিমার সেই চুম্বনের স্মৃতি?
॥ বত্রিশ ॥
একা ঘরে সোমেন বসে আছে। এ ঘরে এয়ারকুলার নেই, মাথার ওপর পাখা ঘুরছে। বাতাসে শিস টানার শব্দ। ওই শব্দটুকু ছাড়া সারা বাড়িটা নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। কেবল ঘুরে যাচ্ছে পাখা। অক্লান্ত যান্ত্রিক।
শৈলীমাসির ঘরের দরজাটা আটকানো। দরজা খোলা থাকলে ঠান্ডাভাব বেরিয়ে যাবে বলে দরজায় যন্ত্র লাগানো আছে। আপনিই বন্ধ হয়ে যায়। ওই ঠান্ডা ঘরে শুয়ে আছে শৈলীমাসি, পাশে বশংবদ স্বামী। এই সময়টায় লোকটা একটু নেশা করে নিশ্চয়ই, মুখে কেমন ভ্যাবলা ভাব, রিখিয়ার বাবা বা শৈলীমাসির স্বামী বলে মোটেই মনে হয় না। এদের চেয়ে অনেক ভোঁতা চেহারা। লোকটার কথা কিছুতেই ভুলতে পারছে না সোমেন। এত টাকার ওপরে বসে আছে, তবু কেমন লক্ষ্মীছাড়া চেহারা। শোকাতাপা, সংসারে যেন কেউ নেই। অভিমানী কী! তার বাবা ব্রজোগোপালও অভিমানী।
বন্ধ দরজাটায় নখের আঁচড় আর কুঁই কুঁই একটা শব্দ আসছে। পাল্লাটা খুব হালকা নয়। সোমেন তাকিয়ে থাকে। দরজাটা দুলছে অল্প। নখে আঁচড়াচ্ছে কুকুরটা। দরজাটা ঠেল আসবার চেষ্টা করছে। দরজাটা খুলে কুকুরটাকে আসতে দেবে কিনা ভাবছিল সোমেন। তার দরকার হল না। কয়েকবার ধাক্কা দিয়ে দরজাটার দুলুনি বাড়িয়ে পাল্লার একটু ফাঁক দিয়ে ঘষটে কুকুরটা এ ঘরে এল। একটু ধীর গতি, সাবধানী। ঘরে ঢুকে দাঁড়িয়ে আছে। কান দুটো খাড়া হয়ে আছে, ঘ্রাণ সজাগ, মুখ ওপর দিকে তুলে কিছু বুঝবার চেষ্টা করছে। কী যেন টের পেয়েছে! চেনা ঘরে অচেনা মানুষের গন্ধ। সোমেন একটু ভয় খায়। কামড়াবে না তো! অন্ধ মানুষেরা বড় ভাল লোক হয়। আজ পর্যন্ত কোনও অন্ধ মানুষকে খারাপ লোক হতে দেখেনি সোমেন। যত অন্ধকে সে দেখেছে তারা সবাই ভদ্র, বিনয়ী, নরম ও সহনশীল মানুষ। চোখ থাকলে তারা কে কীরকম হত, বলা শক্ত। কিন্তু অন্ধ হলে মানুষের মধ্যে ওই গুণগুলো জন্ম নেয় বোধ হয়। এই অন্ধ কুকুরটার মধ্যে সেই নিয়ম অনুসারেই হয়তো হিংস্রতা নেই।
জীবনে আর কোনও অন্ধ কুকুর দেখেনি সোমেন। দুটি চোখে গভীর ক্ষতচিহ্ন। চোখে জল গড়িয়ে পড়বার দাগ। যখন ছোট ছিল তখন কোনও নিষ্ঠুর ছেলে ওর চোখ দুটো গেলে দিয়েছে বোধ হয়। তাই হবে, নইলে কুকুর কখনও অন্ধ হয় না তো!
সোমেন সাবধানে ডাকে—আ—তু—
বনগাঁর ক্যাম্পে তারা কিছুকাল ছিল। বাবা তখনও চাকরি পাননি। সে সময়ে সংসারে নির্মম অভাব ছিল, কিন্তু ছেলেবেলাটা এমন যে কিছুই গায়ে লাগে না। নতুন পৃথিবীর শব্দ গন্ধ বর্ণ সব দুঃখ ভুলিয়ে রাখে। কষ্টে ভাত জুটত তখন। তবু সেই ভাতের শেষ গ্রাসটা কখনও খায়নি সোমেন। মুঠ করে নিয়ে দৌড়ে ঘাটলার দিকে যেতে যেতে হাঁক পাড়ত —আ—তু—। কোথাও কিছু নেই, সেই ডাকের জাদুতে ঠিক আঁদাড়-পাঁদাড় ভেঙে কচুবন মাড়িয়ে ভাঙা বেড়ার ফোকর দিয়ে দুটো দিশি কুকুর ছুটে আসত। খাড়া কান, ল্যাজ নড়ছে, চোখে নিবিড় লোভ।
এ কুকুরটা তেমন নয়। লোভ নেই। কিন্তু ডাক শুনে ল্যাজ নাড়ল প্রবলভাবে। এক-পা দু-পা করে কাছে আসতে থাকে। আসে ঠিক, ভুল দিকে যায় না। মাটি শুঁকে শুঁকে এসে মুখ তোলে কোলের কাছে। খুব আদরখেকো কুকুর। তেজ-টেজ নেই। সোমেন ওর মাথায় হাত রাখতেই ‘কুঁ কুঁ’ একটা শব্দ গলায় তুলে আদুরে ভাবে ভেজা নাকটা সোমেনের হাতে ঘষে দেয়, পায়ের কাছে বসে মুখটা তুলে রাখে ওপরে। সোমেন আর একবার মাথায় হাত দিতেই কুকুরটা চিত হয়ে শুয়ে পিছনের ঠ্যাং ছড়িয়ে দেয়, সামনের পা দুটো বুকের ওপর নুলো করে রেখে ঘাড় কাত করে শরীর ছেড়ে দেয়। এই হল ওর আদর খাওয়ার ভঙ্গি। সবই ঠিক আছে, কেবল চোখ দুটো নেই। তবু সবই বুঝি টের পায়। সোমেন নিচু হয়ে ওর গলার কোমল কম্বলে আঙুল দিয়ে খানিক আদর করল, তারপর বলল—যাঃ।
কুকুরটা গেল না। পায়ের ওপরে মাথা ঘষছে। বিরক্তি। সোমেন উঠে অন্য চেয়ারে গিয়ে বসে। কুকুরটা টের পায় ঠিক। গন্ধে গন্ধে কাছে আসে ফের। আদুরে শব্দ করে ভিখিরির মতো মুখ তুলে থাকে। সোমেন বিরক্ত হয়ে বলে—জানিস না তো, আমি এ বাড়ির কেউ নই, হতে পারতাম—
আচমকা কথা ফাঁকা ঘরে বলে ফেলেই চারদিকে চায় সোমেন। কেউ নেই। সোমেন কুকুরটার কাছ থেকে সরে বসে। ফের কাছে আসে কুকুরটা। জ্বালাতন।
বাইরের দিকে একটা ঝুলবারান্দা, অন্ধকার মতো। সোমেন সেখানে এসে দাঁড়ায়। হাতের নাগালে একটা নিবিড় আমগাছ। বৌলে ছেয়ে আছে। মাতলা গন্ধ। গাছ থেকে আধোঘুমে পাখিপক্ষীর ডানার শব্দ আসে। বাতাস বয়ে যাচ্ছে সাপের মতো হিলহিল করে। তার পায়ে নাক ঠেকিয়ে প্রণাম করে কুকুরটা ঊর্ধ্বমুখে প্রত্যাশায় লেজ নাড়ে।
